এড়িয়ে চলুন গর্ভবতী মায়ের ৫টি জটিলতা

পৃথিবীতে অনেক অনেক বিস্ময়কর ঘটনার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে একজন মায়ের সন্তান জন্মদান। সন্তান ধারণ করার সময় থেকে সন্তান জন্মদানের পরবর্তী সময় পর্যন্ত একজন নারীকে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হয় । অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে আমাদের দেশে গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতায় প্রতিদিন গড়ে ৩২ জন নারী মারা যান । এটার অন্যতম কারণ হিসেবে আমাদের সচেতনতা এবং অজানাকে জানার কৌতূহলের অভাবকেই দায়ী করতে পারি। গর্ভাবস্থায় উচ্চরক্তচাপ, রক্তক্ষরণ , রক্তস্বল্পতা, অতিরিক্ত বমি, গর্ভস্থ শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া ইত্যাদি জটিলতাগুলো সম্পর্কে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য নিচে আলোচনা করা হলঃ

• গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ: গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ । বিশেষজ্ঞগণ উল্লেখ করেছেন গর্ভাবস্থায় শতকরা ৫ থেকে ১০ ভাগ মহিলা উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হন । গর্ভকালীন প্রাথমিক অবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হলে এবং যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া গেলে একদিকে মা ও সন্তানের জীবনের ঝুকি যেমন কমানো যায় তেমনি পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন রোগ যেমন-কিডনি , হৃদরোগ সমস্যা খানিকটা হলেও রোধ করা যায় ।
o গর্ভাবস্থায় প্রতিবার চিকিৎসকের কাছে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চেকআপের জন্য গেলে অবশ্যই নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করা জরুরি ।
o ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া, হাতে পায়ে পানি আসা, মাথা ও ঘাড়ে ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা ইত্যাদি উপসগ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন ও রক্তচাপ মাপুন ।
o খাবারে অতিরিক্ত লবণ ও পাতে কাঁচা লবণ এড়িয়ে চলুন ।
o গর্ভাবস্থায় সব ধরনের ওষুধ খাওয়া যায় না, তাই উচ্চরক্তচাপের ওষুধ খেতে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামশ নিন।

• রক্তক্ষরণ: গর্ভাবস্থায় সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে রক্তক্ষরণ সবচেয়ে মারাত্মক একটি সমস্যা । সন্তান ধারণের পর রক্তক্ষরণ গর্ভপাতের অন্যতম বড় লক্ষণ । গর্ভাবস্থায় দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তপাত, প্রস্রাবে রক্তপাত হতে পারে যা অনেকসময় আমরা খেয়াল করিনা। কিন্তু যখনি এ ধরনের কোন লক্ষণ আপনি দেখতে পাবেন বিন্দুমাত্র দেরি না করে চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন । সামান্য অবহেলায় গর্ভপাত তো বটেই সাথে আপনি হয়তো নিজেকেও মৃত্যুর দিকে দিচ্ছেন।

• রক্তসল্পতা: গর্ভাবস্থায় রক্তসল্পতা আরও একটি বড় জটিলতা। যদি গর্ভাবস্থায় রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ১০০ মিলিলিটারে ১০ গ্রাম এর থেকে কম থাকে অর্থাৎ রক্তে লোহিত রক্তকণিকার পরিমাণ কম থাকে, তবে একে গর্ভাবস্থায় রক্তসল্পতা বলে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের মহিলাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। অর্থাৎ দরিদ্র পরিবার থেকে সচ্ছল সব পরিবারের গর্ভবতী মায়েরাই এই ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
এর লক্ষণসমূহ:
 অল্পতেই হাপিয়ে ওঠার সঙ্গে দ্রুতগতির হৃদস্পন্দন এবং রক্তচাপ কমে যাওয়া,
 চেহারা নীলাভ হয়ে যাওয়া । বিশেষত নখ নীল বা সাদাটে হয়ে যাওয়া ।
 কথা বলার সময় এক নি:শ্বাসে কথা শেষ করতে না পারা ।
এই সমস্যা মোকাবেলায় গর্ভ ধারণের শুরু থেকে যথেষ্ট পরিমাণে লৌহসমৃদ্ধ খাবার খান, যেমন : কচুশাক, কাচাকলা, পেয়ারা, শিম, মটরডাল, বাধাকপি ইত্যাদি। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনে আয়রন ট্যাবলেট গ্রহণ করতে হবে। রক্তাল্পতার কারণে শিশুর রোগগ্রস্থতা এবং মৃত্যুর হার বেশি হতে পারে। তাই এই জটিলতা এড়িয়ে চলতে লক্ষণ বুঝে সচেতন হন ।

• অতিরিক্ত বমি হওয়া: গর্ভাবস্থায় হবু মায়ের বমি বমি ভার বা বমি হওয়া খুব সাধারণ একটি ঘটনা । কিন্ত অতিরিক্ত বমি হওয়া মোটেও সাধারণ কোন ব্যাপার নয় । বমির কারণে বা বমি ভাবের কারণে আপনি কিছু খেতে বা পান করতে পারছেন না তখন আপনার মধ্যে পানিশূন্যতা তৈরি হবে যেটা আপনার বাচ্চার জন্য ভীষণ ক্ষতিকারক । এই সমস্যা দেখা দিলেই আপনার চিকিৎসকের শরনাপন্ন হন । এছাড়া একজন দক্ষ পুষ্টিবিদের সাথে আলোচনা করে আপনার খাদ্যতালিকায় স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনুন।

• শিশুর নড়াচড়া কমে বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া: গর্ভে সন্তান ধারণকারী প্রত্যেক মা-ই পেটে সন্তানের নড়াচড়া অনুভব করেন । যদি হঠাৎ অনুভব করেন যে আপনার বাচ্চার নড়াচড়া টের পাচ্ছেন না -তাহলে এটা সত্যি আপনার গর্ভাবস্থার বড় ধরনের জটিলতা। আপনি ভাল ভাবে মনোযোগ দিয়ে যদি আপনার বাচ্চার নড়াচড়া খেয়াল করে থাকেন তাহলে বাচ্চার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেলে খুব সহজেই সেটা বুঝতে পারবেন । এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে এক মুহূত দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন ।
উপরোক্ত জটিলতা গুলোকে সাধারণ মনে হলেও এগুলো এক মুহূর্তে আপনার স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করতে পারে। তাই পরিবারের সবাই গর্ভবতী মায়ের যত্নে শুধু খাওয়া আর বিশ্রামই নয় , তার মানসিক যেকোনো পরিবর্তনকেও বিশেষ ভাবে লক্ষ্য রাখুন।

লেখক
তারিন রহমান টুম্পা
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ।

4,793 total views, 4 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *