গর্ভাবস্থায় কি ব্যায়াম করা যায়?


‘মা’
কত আদর আর স্নেহের ডালি ভরা এক শব্দ। মা হওয়া যেন প্রতিটি মেয়ের জন্য পরম আরাধ্য। কিন্তু মা হওয়ার রাস্তা খুব বেশি সহজ নয়। মা হবার প্রকিয়ায় শারীরিক যে পরিবর্তন হয় পরবর্তীতে অনেকসময় এটাই মা এর বিষণ্ণতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবাই অনেক বেশি ফিটনেস সচেতন। আজকের আধুনিক যুগে ব্যায়াম যেন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। তাই কর্মব্যস্ত ও ফিগার সচেতন নারী মাত্রই গর্ভবতী হলে ভাবতে থাকেন যে, এখন কি ব্যায়াম ছেড়ে দেব?

আগের দিনের পরিবারগুলোর গর্ভবতী মায়ের শারীরিক পরিশ্রম নিয়ে তেমন মাথাব্যাথা ছিলনা । গৃহস্থালির দৈনন্দিনের হালকা কাজ থেকে শুরু করে কাপড় ধোয়ার মতো রীতিমতো ভারী সব কাজই  বাড়ির বউকে করতে হত । বর্তমান যুগে কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গীর আমূল পরিবর্তন এসেছে -বিশেষত শহরে। গর্ভাবস্থায় ক্ষতি হতে পারে ভেবে হালকা-ভারী কোন ধরনের কাজ ই মাকে করতে দেয়া হয়না ।  গর্ভবতী মা নিজেও বুঝতে পারেন না ব্যাপারটা আসলে কতোটা ঠিক বা আদৌ ঠিক কিনা!

এখন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে যে গর্ভাবস্থায় অবস্থায় মায়ের ভারী কাজ করা যেমন অনুচিত, তেমনি শুয়ে বসে দিন কাটালে তা মায়ের ও গর্ভস্থ শিশু ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। তাই সবচেয়ে ভাল হল মায়ের পক্ষে স্বাভাবিক এমন কাজগুলো করা ছেড়ে না দেয়া।এ কাজগুলো ছেড়ে দেয়া হলে যা হতে পারেঃ
১. স্বাভাবিক/অসুস্থ যে কোন অবস্থায় ই -‘শুয়ে বসে দিন কাটানো’- ব্যাপারটা আমাদের হাড়ের ক্যালসিয়াম রিটেনশন কমিয়ে হাড়ক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায় আমাদের। তাই যারা এমনিই অলস দিন কাটাচ্ছেন বা যারা শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ পাচ্ছেন না তারা সতর্ক থাকুন বয়স বাড়লে অস্টিওপোরোসিস বা অস্টিওম্যালেশিয়া জাতীয় অসুস্থতা গুলোর আক্রমণের ব্যাপারে।গর্ভবতী মা কে তাই আরো সচেতন হতে হবে।কারণ এ রোগের শিকার হওয়ার প্রবণতা নারীদের সবচেয়ে বেশী।

২. বর্তমান যুগে গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস বা Gestational diabetes খুবই মারাত্মক বলে প্রমাণিত হয়েছে।এতে গর্ভাবস্থায় মায়ের ওজন যেমন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে,তেমনি প্রসবের পর শিশুর ওজনও বেশি হয়। এধরনের শিশুকে ICU (intensive care) এ রেখেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাঁচানো সম্ভব হয়না।

৩. প্রসবকালীন নানা জটিলতায় মা আক্রান্ত হতে পারেন।এক্ষেত্রে মায়ের পেশীর সবলতা কমে যেতে পারে যা প্রসবে সমস্যা তৈরি করে।নানা ধরনের ব্যথা সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে-বিশেষত পিঠের ব্যথা।

৪. আমাদের দেহের যে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে তার কাজ শিথিল হয়ে পড়ে। ফলে সহজেই ইমিউন সিস্টেম থেকে এন্টিবডি তৈরি হয়না বা কাজ করেনা।ফলে সহজেই জীবাণু আক্রমণ করে ও গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি হয়।

৫.গর্ভকালীন উচ্চরক্তচাপ এর আশংকা বাড়ে।প্রসব পরবর্তী অবসাদ বেড়ে যায়।শারীরিক সক্ষমতা কমে যায় ফলে স্বল্প পরিশ্রমেই ক্লান্তি চলে আসে।

তবে শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামেরও রয়েছে কিছু সীমারেখা।
জেনে নিন কখন কখন ব্যায়াম করবেন নাঃ

অবশ্যই প্রথমে চিকিৎসকের অনুমতি নিন।কারণ নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ব্যায়াম না করা ভাল যেমন-পূর্বের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ যা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছেনা, তীব্র ব্যথা, হৃদরোগ, placenta previa বা গর্ভফুলের সমস্যা(প্রসব পূর্ববর্তী বা পরবর্তী অতিরিক্ত  রক্তক্ষরণ এর জন্য দায়ী) ইত্যাদি। যদিও ব্যায়াম মা ও শিশু উভয়ের জন্যই ভাল তাও এ বিষয়গুলো মাথায় রাখা দরকার।

তাছাড়া অনেকেই গর্ভাবস্থা নিয়ে অযথাই দুশ্চিন্তা করেন যার ফলে কিছুতেই তার উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়না।এক্ষেত্রে সাইকোলজিকাল কাউন্সেলিং প্রয়োজন। আবার অনেকেই গর্ভাবস্থার কথা ভেবে ইচ্ছেমত খাওয়া শুরু করে দেন যা ডায়াবেটিস কে অনিয়ন্ত্রিত করে তোলে।এক্ষেত্রে তাকে প্রতি ট্রাইমিস্টারে যে ডায়েট প্লান দেয়া হবে তা মেনে চলতে হবে।

কতটা সময় ধরে করবেনঃ

ব্যায়াম আপনার ফুসফুসের শক্তি বাড়ায় যা গর্ভকালিন সময়ে বাচ্চাকে এবং বাচ্চা ডেলিভেরির সময় আপনাকে সাহায্য করে।

যদি আগে থেকেই ব্যায়ামে অভ্যস্থ হন তাহলে তা তেমনিভাবেই চালিয়ে যান,যতক্ষণ না কোন অসুবিধা বোধ করছেন বা চিকিৎসক বারণ করছেন।

যদি নতুন করে ব্যায়ামের উপকারিতার কথা ভেবে এটি করা শুরু করেন তাহলে নিচের নিয়মগুলো কাজে আসতে পারে:

১. সবসময় দিনেই ব্যায়ামের অভ্যাসের চেষ্টা রাখুন।টানা ব্যায়ামে কষ্ট হলে সময় ভাগ করে করুন।তবে ভর দুপুর এড়িয়ে চলুন।

শুয়ে বাতাসে ধীরেধীরে সাইকেল চালানো, পায়ের মাসলে রক্ত চলাচল বাড়বে

২. ৩০মিনিট সময় ই যথেষ্ট সারা দিনের ব্যায়ামে।এর কম সময় হলেও চলবে।তবে প্রথম দিন শুরুটা হতে পারে কেবল ৫মিনিট থেকে।ধীরে ধীরে আরো ৫মিনিট করে সময় বাড়াতে পারেন প্রতিদিন।প্রতিদিন ই করতে হবে এমনটি নয়-যেদিন মন/শরীর সায় দেবেনা সেদিন ছেড়ে দিন।

শক্তিশালী পেলভিক নরমাল ডেলিভেরি হওয়াতে সাহায্য করে।

যোগব্যায়াম আপনার ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখে, শরীরে বাড়তি মেদ জমতে দেয়না, বাচ্চা জন্মের পর ফিটনেস ফিরে পেতে সাহায্য করে।

৩. যে কোন ধরনের ব্যায়াম ই করা যেতে পারে।তবে হাঁটা ই হতে পারে সর্বোত্তম। অন্যান্য ব্যায়াম এর মধ্যে সাঁতার,সাইক্লিং,ভারোত্তোলন অব্দি করা যাবে।তবে সাবধান থাকতে হবে সব দিক থেকে।যেকোন ধরনের সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ  নিতে হবে।

পায়ের মাঝে জিম বল ধরে থাকলে, এবং ধীরে ধীরে উঠা নািরেকরলে পা ও কোমরের পেশি শক্তিশালী হয়।

৪. মধ্যমমানের ব্যায়াম পরিমিত সময়ের জন্য করাটাই পছন্দনীয়।নিজের শরীর ও মনের ভাষা টা বোঝাটা জরুরি এখানে সবার আগে।হাঁটলে রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ে।গিঁটের ব্যথা দূর হয়ে শারীরিক সবলতা বাড়ে।এতে খুব বেশি আয়োজনেরও প্রয়োজন পড়েনা।তাই হাঁটাকেই বেশি পছন্দ করা হয় এ অবস্থায়।ব্যায়ামের পর যা যা করবেনঃ

১. লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ুন। রিল্যাক্স হয়ে শ্বাস নিন।
২.প্রচুর পানি ও তরল জাতীয় খাবার খান।
৩. সতর্ক থাকুন দেহের তাপমাত্রা যেন বেশি বেড়ে না যায় এবং পানিশূন্যতা দেখা না দেয়।
৪. চরম পরিশ্রান্ত হয়ে যান-এমন ব্যায়াম করবেন না।

কোন ধরনের ব্যায়াম করবেন না এ সময়ঃ

পিঠের ওপর চাপ পড়ে এমন ব্যায়াম করবেন না। পিঠের ওপর বেশিক্ষণ ভর দিয়ে শুতে হয় এমন ব্যায়াম করবেননা বিশেষত গর্ভের মাঝামাঝি সময়ে।এছাড়া ভারী ব্যায়াম যেমন-স্কিইং,ডাইভিং, স্কেটিং  ইত্যাদি করবেননা।আর এ সকল বিষয়ে অভিজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ উত্তম।

অন্যান্য করণীয়ঃ

১. একজন সঙ্গী নিন।এতে ফুরফুরে ভাব বাড়বে ব্যায়ামের সময়।সম্ভব হলে গোটা পরিবার নিয়ে ব্যায়াম করতে পারেন।
২.গান শুনতে শুনতে ব্যায়াম করতে পারেন।এতে আরো উপভোগ্য হয়ে উঠবে এটি।মন ভাল করা গান শুনুন।
৩. খুব বেশি আয়োজন করে ব্যায়ামের দরকার নেই যেমন-ট্র্যাকস্যুট,জিম,জিম এক্সেসরিজ।খালি হাতে আর জায়গায় করুন।
৪. উপযুক্ত অফার গ্রহণ করতে পারেন জিমে।যদিও গর্ভাবস্থায় নারীদের সুযোগ দেয়া জিমের সংখ্যা কম আমাদের দেশে।
৫. সৃজনশীল কিছু করুন।একই বৃত্তে বন্দী থাকবেন না।দরকার হলে গানের সাথে নাচতে পারেন।
৬.নামায পড়া টা পারে আপনাকে শারীরিক ও মানসিক দুই ভাবেই চাঙা রাখতে।
৭.গর্ভাবস্থায় যত দিন যায় শরীর তত বিশ্রাম চায়।তাই চাহিদামত ধীরে ধীরে কমিয়ে দিন ব্যায়ামের পরিমাণ।

কখন বন্ধ করবেনঃ
বিপদসংকেত গুলো চিনে নিন। এগুলো দেখলে ব্যায়াম বন্ধ করুন–

১.মাথাব্যথা
২.মাথা ঘোরা
৩.পেটে ও পিঠে ব্যথা
৪.বুক ধড়ফড় করা
৫.শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
৬.যোনীপথে রক্তপাত ইত্যাদি।

ব্যায়াম বন্ধের পরেও যদি লক্ষণ গুলো দূর না হয় শীঘ্রই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
পরিবারের সবার আন্তরিক চেষ্টাই পারে প্রতিটি মা ও শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে।

লেখক-
তামান্না তাহসিন আহমেদ
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ।

5,180 total views, 6 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *