প্যাকেট জাত খাবারের সব উপাদান সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানেন তো?

আমাদের প্রতিদিনের খাবারে কম বেশি প্যাকেটজাত খাবার খাওয়া হয়। অনেক সময় আমাদের বিভিন্ন খাবারে এলার্জি থাকে, তাই আমরা অনেকেই কেনার সময় আগ্রহ নিয়ে দেখি খাদ্যটি তৈরিতে কোন ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে।

বিভিন্ন কনফেকশনারী পন্য যেমন- পাউরুটি, পাস্তা, সস, কেক, আচার,বিস্কিট,  মায়োনিজ ইত্যাদি  খাবারসহ মোটামুটি সব পন্যেই এমন কিছু উপাদান থাকে। যেমন- ই১০০,ই২০১,ই১৬৩ডি ইত্যাদি।  এগুলো আমরা দেখি কিন্তু মানে বুঝিনা, তাই এগুলো আমাদের জন্য আদৌ উপকারী নাকি ক্ষতিকর আমরা জানিনা।

ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন বিস্কিট , সস ইত্যাদিতে ব্যবহৃত- কোড।

প্রান টমেটো সস এর ই-কোড

প্যাকেটের তৈরীকৃত খাবার গুলোতে উপাদান অংশতে ভালো করে দেখলে বোঝা যায় প্রতিটা খাবারে কিছু “ই” কোড বা নাম্বার আছে।

উন্নতদেশে প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবারে এই “ই’ কোড ব্যাবহার করা শুরু হয়। “ই” কোড বা নাম্বার হল কোন পদার্থ বা খাদ্য উপাদান( রাসায়নিক বা প্রাকৃতিক খাদ্যের অংশ, রং, স্বাদ, বা রুচি বাড়ানোর উপাদান) যা নির্দিষ্ট কোড বা নাম্বার দিয়ে আলাদা করা হয়েছে এবং খাদ্যে ব্যাবহার করার অনুমতি দেয়া আছে এমন উপাদানকে বোঝানো হয়।

অলিম্পিক বিস্কিট এ ব্যবহার করা ই-কোড

এই ‘ই’ কোড গুলো ‘ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন’ দ্বারা স্বীকৃত হতে হয়, যা সাধারণত আমাদের প্যাকেটজাত খাদ্যের ‘ফুড লেবেল’ এ পাওয়া যা স্বাস্থ্যের প্রতি ক্ষতিকর হয়না বলে গ্রহণযোগ্য।

কিছু ই-কোড এর অর্থ (meaning)

ভিন্ন ভিন্ন ই-কোড এর ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য হয়। কোনটা রঙ,  কোনটা প্রিজারভেটিভ, কোনটা ফ্লেবার এর জন্য হয়। নিচের ছবিতে কিছু ই-কোড এর অর্থ দেয়া হল—-

‘ই’ কোড খাবারে ব্যবহারের কারনঃ

• খাদ্যে সহজে ব্যবহার করা যায়;
• সংরক্ষন করা যায় সহজেই;
• খাদ্যের স্বাদ বৃদ্ধি করা যায়;
• খাদ্যের রঙ আর্কষনীয় করা যায়;
• খাদ্যের ঘনত্ব বৃদ্ধি করা যায়;
• খাদ্যের ভঙ্গুরতা বা ভেঙ্গে যাওয়ার ক্ষমতা কমানো যায়;
‘ই’ কোডের মধ্যে শুধুমাত্র রাসায়নিক পদাথ ব্যাবহার করা হয় এমন নয়, এর মধ্যে কিছু প্রাকৃতিক উপাদানও রাসায়নিক উপায়ে বের করে বিভিন্ন খাদ্যে ব্যাবহার করা হয়। এখন ‘ই’ কোড আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী না ক্ষতিকর তা যাচাই করার জন্য ‘ই’ কোড গুলো ভালো ভাবে জানতে হবে।

‘ই’কোড বা নাম্বার- আমাদের জন্য উপকারী না ক্ষতিকর তার আগে জেনে নেই ই- কোড কত প্রকার।

‘ই’ কোডের শ্রেণীবিভাগঃ
 প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত ;
প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন উপাদান গুলো, রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পৃথক করা হয়,যা পরবর্তীতে উপাদান গুলোর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী খাবারে ব্যাবহার করা হয়।

 রাসায়নিক উপায়ে প্রস্তুতকৃতঃ
প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত ‘ই’ কোড গুলো অনেক সময় ব্যয়বহুল হওয়ায় পরবর্তীতে কিছু রাসায়নিক উপাদানকে ‘ই’ কোডে যুক্ত করা এবং বর্তমানে বিশ্বের অনেক খাবারে ব্যাবহার করা হচ্ছে।

‘ই’ কোড বা নাম্বার –এর তালিকাঃ
‘ই’ কোড বা নাম্বারের তালিকা নিম্নে দেওয়া হল;
১।ই১০০-ই১৯৯(রঙ)
২।ই২০০-২৯৯(খাদ্য সংরক্ষক দ্রব্য)
৩।ই৩০০-৩৯৯(অ্যান্টি- অক্রিডেন্ট, অ্যাসিডিটি রেগুলেটর)
৪।ই৪০০-ই৪৯৯(ঘনত্ব বৃদ্ধিকারক, স্ট্যাবিলাইজার, ইমালসিফায়ার)
৫।ই৫০০-ই৫৯৯(অ্যাসিডিটি রেগুলেটর, অ্যান্টি- কেকিং এজেন্টস)
৬।ই৬০০-ই৬৯৯(ফ্লেভার এনহেন্সার)
৭।ই৭০০-ই৭৯৯(এন্টিবায়োটিক্স)
৮।ই৯০০-ই৯৯৯(গ্ল্যাজিং এজেন্ট, গ্যাস এবং মিষ্টি স্বাদ বৃদ্ধিকারক দ্রব্য)
৯।ই১০০০-ই১৫৯৯(অতিরিক্ত অ্যাডিটিভস)

নেসলে কফি ম্যাট এ ব্যবহার হয়েছে ই- কোড

জেনে নিন কোন  ‘কোড গুলো উপকারীঃ 
মূলত যেসব ‘ই’ কোড প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া যায়, সেগুলোর শরীরের কোন ক্ষতিকারক প্রভাব দেখা যায় না, আমাদের শরীরের জন্যও উপকারী হিসাবে স্বীকৃত।নিম্নে উপকারী ‘ই’ কোড এবং তাদের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারীতা আলোচনা করা হল;

১) ই৩০০( ভিটামিন ‘সি’) 
ই৩০০ খাদ্যে স্বাদ বর্ধক হিসাবে কাজ করে, যা পাউরুটির ময়দার স্বাদ বাড়ায়। ই৩০০ অ্যান্টি অক্রিডেন্ট ক্ষমতা রয়েছে।প্রক্রিয়াজাতকৃত মাংস,হিমায়িত মাছ,সকালের নাস্তায় যে শস্যগুলো খাওয়া হয়,সেখানে ই৩০০ ব্যাবহার করা হয়।
সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারীতাঃ
1. আমাদের ব্যায়াম করার সময় অতিরিক্ত ফ্যাটগুলোকে ঝরিয়ে ফেলে
2. সংযোগকারী কলাগুলোর শক্তি ও সুস্থ্যতা বৃদ্ধি করে
3. রক্তনালীতে রক্ত সঞ্চচালঙ্কে দৃঢ়তা প্রদান ও শক্তিশালী করে
4. শরীর ফ্রী-রেডিকেল ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে
5. শরীরে হিস্টামিন নিঃসরন কমায়
6. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

২) ই১০১(ভিটামিন ‘বি২’)
ই১০১(ভিটামিন ‘বি২ বা রিবোফ্ল্যাভিন) ব্যবহার করা হয় রঙ হিসাবে।
সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারীতাঃ
মাইগ্রেনের তীব্রতা এবং পুনরাবৃত্তি প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাভাবিক সুস্থ্যতা এবং বিপাকীয় কাজের জন্য প্রয়োজনীয় চুলের সুস্থ্যতা বজায় রাখে।সিবাম বা তেল নিঃসরণের মাধ্যমে চুলের ধূসর হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়।
দেহের প্রতিরক্ষা কোষকে অক্রিজেনের সংস্পর্শে ধবংস হয়ে যাওয়া থেকে সাহায্য করে।

৩) ই১০০(কারকিউমিন)
এই পদার্থটি পাওয়া যায় হলুদের মূল থেকে, যা হলুদ বর্ণের জন্য দায়ী এবং প্রাকৃতিক রঙ হিসাবে ব্যাবহার করা হয়।
সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারীতাঃ
এটি প্রদাহজনিত সমস্যা কমাতে সহযোগিতা করে।তাই এটি Psoriasis এবং Eczema –র প্রদাহজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে ব্যাবহার করা হয়। এটি ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। কোলন পলিপ্স-এর সংখ্যা কমাতে ভালোভাবে কাজ করে।

৪) ই১৬৩ (অ্যান্থোসায়ানিন)
এটি প্রাকৃতিক রঙ হিসাবে ব্যাবহার করা হয়।এটি কিছু দিগ্ধজাত খাবার, জেলী, মিষ্টি, তরকারির স্যুপ, আচার, কোমল পানীয়তে ব্যাবহৃত হয়। ই১৬৩ সাধারণত আঙ্গুরের খোসা বা লাল রঙের বাধাকপি থেকে সংগ্রহ করা হয়।
সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারীতাঃ
বয়ঃসন্ধি কালে হাড়ের সন্ধিস্থলের চামড়ায় যে ফেটে যাওয়ার ভাব দেখা যায় এবং চেহারাতে যে বলিরেখা দেখা যায় তা প্রতিরোধে কোলাজেন ম্যাট্রিক্রের –এর সুস্থ্যতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াকে উন্নত করে সুস্থ্যতা বাড়ায়।
এটির অ্যান্টি- ইনফ্যামেটরী এবং অ্যান্টি-অক্রিডেন্ট বৈশিষ্টের জন্য Rhematoid Arthritis এর প্রতিরোধে সাহায্য করে।

৫) ই১৪০(ক্লোরোফিল);
এটি সবুজ রঙ্গের হয়ে থাকে যা বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্যে ব্যাবহার করা হয় যেমন; পাস্তা এবং অ্যাবসিন্থ
সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারীতাঃ
এটি শরীরের নাইট্রোসোঅ্যামিন তৈরীতে বাধা প্রদান করে, নাইট্রোসোঅ্যামিন শরীরে ক্যান্সার, Anti-Atherogenic (Atherogenic হলও খারাপ বা ঋনাত্নক বিপাকীয় ক্রিয়া) কাযক্রম ঘটায়
হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রন করে,
আমাদের শরীরে প্রতিদিন যে পরিমাণ দূষিত উপাদান প্রবেশ করে তার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেহকে প্রতিরোধ করে।

৬) ই১৬৩ডি (লাইকোপেন)
ই১৬৩ডি- এর উজ্জল লাল রঙের জন্য, এটি প্রচলিত খাদ্যের রঙ। যা বানিজ্যিকভাবে লাইকোপেন, টমেটোর নির্‍্যাস থেকে সংগ্রহ করা হয়।

সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারীতাঃ
—শরীরের চামড়াকে সূর্যের অতি বেগুণী রশ্মির থেকে রক্ষা করে।
—যেসব ব্যায়ামে Asthma ঘটতে পারে সেগুলো নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করে।
—এটি ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।

৭) ই১৬১বি( লুটেন)
এটি মূলত খাদ্যের রঙ হিসাবে ব্যবহার হয়। বানিজ্যিকভাবে এটি গাঁদা ফুলের পাপড়ির নির্যাস থেকে সংগ্রহ করা হয়।

সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারীতাঃ
—চোখকে Oxidative Stress থেকে সুস্থ্যতা দান করে এবং বয়স্ক অবস্থায় চোখের ছানী পরার ঝুঁকি কমায়।
—ত্ব্কের সস্থ্যতা বজায় রাখে।
—ত্বকের পানির সমতা, নমনীয়তা এবং লিপিডের মাত্রা বজায়ের মাধ্যমে ত্বকের বলিরেখার প্রভাব থেকে        রক্ষা করে।
—হৃদযন্ত্রের ক্রিয়ার উন্নতি ঘটায়।

মায়োনিজে ব্যবহৃত ই- কোড

জেনে নিতে পারেন “ই” কোড বা নাম্বার এর ইতিহাসঃ
‘ই’ কোড বা নাম্বার খাদ্যের স্বাদ বধক হিসাবে সর্বপ্রথম ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন এবং সুইজারল্যান্ড ব্যবহার হয়।যা এখন আমদের দেশীয় উৎপাদিত পণ্যের ‘ফুড লেবেল’ এ দেখা যায়। European Food Safety Authority মূলত খাদ্যের ব্যাবহারের নিরাপত্তা এবং অনুমোদনের ক্ষেত্রে গুরুতবপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নর্থ আমেরিকাতে এই কোড প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যাবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।বিশেষ করে কানাডা থেকে যেসব দ্রব্য আমেরিকাতে রপ্তানী করা হচ্ছে।অস্ট্রেলিয়াতে এবং নিউজিল্যান্ডে এই কোড ব্যাবহার করা হয় কিন্তু তাদের ‘ফুড লেবেল’ এ শধু নাম্বার থাকে, ‘ই’ অক্ষর টি লিখা থাকে না।

‘ই’ কোড বলার কারন হল ইউরিপীয়ান ইউনিয়ন থেকে এই সকল রাসায়নিক দ্রব্য ব্যাবহার করা শুরু করা হয় তাই ‘ই’ শব্দটি ‘ইউরিপীয়ান’ এই শব্দটি থেকে নেওয়া হয়েছে.১৯৬২ সালে যখন কোন ‘ই’ কোডের তালিকা ছিলো না তখন শুধু ফুড অ্যাডিটিভস হিসাবে খাদ্যের রঙ ব্যাবহার করা হত.১৯৬৪ সালে খাদ্য সংরক্ষক রাসায়নিক দ্রব্যদি,’ই’ কোড এর যুক্ত হয়.১৯৭০ সালে অ্যান্টি-অক্রিডেন্ট এবং ১৯৭৪ সালে খাবারের ঘনত্ব বৃদ্ধিকারী উপাদান,ইমালসিফায়ার এবং জেলী এজেন্ট ‘ই’ কোডে যোগ করা হয়।
[উৎসঃhttps://www.healwithfood.org/articles/can-e-numbers-be-good.php http://www.foodcolor.com/enumbers ]

তবে সব ই-কোড  স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। খাবারের প্যাকেটের গায়ের ই- কোড নাম্বার দিয়ে গুগলে সার্চ দিলেই জেনে যাবেন এটা আপনার জন্য ভালো না খারাপ। এছাড়া কোন গুলো ক্ষতিকর ই-কোড জানতে পরবর্তী পোস্টটি পড়ুন।
সঠিক তথ্য জানুন, সুস্থ থাকুন।

লেখক-
শাহরুখ নাজ রহমান
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান

5,486 total views, 6 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *