প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতার লক্ষণ এবং প্রতিকারে কি করবেন?

সন্তান জন্মের মধ্য দিয়ে একজন মায়েরও জন্ম হয়। এটি একটি মেয়ের জীবনে অনেক বড় একটি পরিবর্তন নিয়ে আসে, যার সাথে রাতারাতি অভ্যস্ত হওয়া সহজ নয়। সন্তান জন্মদানের পর মন খারাপ ও বিষণ্ণতার সৃষ্টি হওয়া প্রসূতিদের জন্য একটি সাধারণ বিষয়। Postpartum Depression বা প্রসবোত্তর বিষণ্ণতার উপসর্গগুলি বুঝতে পারা এবং সহায়তা করা পরিবার, বন্ধু ও চিকিৎসকের দায়িত্ব। কারণ এই সময়ের চিন্তা-চেতনাগুলো প্রসূতির জন্য নতুন এবং অনিশ্চয়তায় ভরা। বেশিরভাগ মহিলাই তাদের অনুভূতি কাউকে জানাতে চায় না। অথচ এই সময়টায় তাদের হাসিখুশি থাকা কতটা জরুরি অনেকেই বুঝতে চান না। নবজাতকের দিকে লক্ষ্য রাখতে গিয়ে নব্য মায়ের যত্নের কথা আমরা অনেকেই ভুলে যাই, যা কিছুদিনের মধ্যেই প্রসব পরবর্তী জটিলতায় রুপ নেয়।

প্রসব পরবর্তী মানসিক সমস্যা কিঃ   

এই সমস্যাটি বাচ্চা জন্মের আগে, বা পরের ১২ মাসের যেকোন সময় শুরু হতে পারে। এর ফলে একজন প্রসূতি অকারণে মন খারাপ করে; উদ্বিগ্ন, খামখেয়ালী, ছিঁচকাঁদুনে, নিরুৎসুক ও একাকীত্বে ভোগে।

কোনো কাজে মনোযোগী হতে পারেনা। ক্ষুধামন্দা হয় ও খাওয়ার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। নিজেকে একজন ভালো মা ভাবতে পারেনা; তখন বাচ্চার প্রতি আগ্রহ কমে যায়, নাহয় বাচ্চাকে নিয়ে অতি উদ্বিগ্নতার সৃষ্টি হয়। অকারণে আশাহত হয় এবং ইতিবাচক চিন্তা করতে পারে না।।

সমস্যার প্রকারঃ মানসিক অসঙ্গতি তিন ধরণের হতে পারে।

মৃদু বা mild অসঙ্গতিতে ৫০% প্রসূতির ক্ষেত্রে বিষণ্নতা, নিদ্রাহীনতা, নবজাতকের প্রতি অনুভূতিহীনতা জন্মে। এটি সাধারণত কয়েকদিন স্হায়ী থাকে।

মধ্যম বা moderate অসঙ্গতি ৪-৬ মাসের মধ্যে ১০-২০% মায়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এতে বিষণ্নতায় আক্রান্ত মা নিদ্রাহীনতা, একাকীত্ব, বিক্ষপ্ত মেজাজ, শক্তিহীনতা, খাওয়ার অরুচি ইত্যাদি সমস্যায় ভোগে।

গুরুতর বা severe অসঙ্গতিতে মায়ের মধ্যে ভয়, অলীক কল্পনা, নিদ্রাহীনতা, আত্মহত্যা বা নবজাতককে হত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। এক্ষেত্রে সাধারণত প্রসূতি মায়ের  সাইকোসিস বা সিজোফ্রেনিয়া নামক মানসিক অসুস্হতার পূর্ব ইতিহাস থাকে।

কেন এমন হয়?

সাধারণত গর্ভধারণ ও প্রসবের কারণে হরমোনের যে পরিবর্তন হয়, তার ফলবশত এ মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়। গর্ভাবস্হায় ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের যে মাত্রা বৃদ্ধি পায়, প্রসবের পরে তা হঠাৎ কমে যায়। একারণে মনে বিরূপ প্রভাব পরে। এ হরমোনগুলো পূর্বের অবস্হায় ফিরে আসতে সপ্তাহখানেক বা আরো বেশিও লাগতে পারে।

পরিবারের কী করণীয়?
—প্রসবোত্তর বিষণ্নতায় চিকিৎসার শর্ত হলো তাদের প্রতি মনোযোগ দেয়া। স্বামী, পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা নবজাতকের যত্নের সাথে সাথে প্রসূতির দিকেও লক্ষ্য রাখুন।

—পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার ও পারিবারিক সমর্থন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রায়শই প্রসূতিরা এ ব্যাপারে কারো সাহায্য নিতে চায়না বা তাদের উপসর্গগুলো বুঝতে পারেনা। তাই অভিজ্ঞদের উচিত এ বিষয়টি সম্পর্কে প্রসূতি মাকে পরামর্শ দেয়া।

—প্রসূতিকে মানসিকভাবে সুস্হ রাখার জন্য নবজাতকের বাবা এবং পরিবারের সদস্যদের সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে।

—প্রসূতির পর্যাপ্ত ঘুমের ব্যবস্হা করে দিতে হবে এবং এ সময়টুকু পরিবারের অন্য কোনো সদস্যকে শিশুর দেখভাল করতে হবে।

—কঠিন ও পরিশ্রম হয়, এমন কাজের দায়িত্ব প্রসূতিকে দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে, এতে সে মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকবে।

—নিয়মিত কিছু ব্যায়াম ও ঔষধ সেবনের কথা স্মরণ করিয়ে দিন; নতুন রুটিনে অভ্যস্ত হতে উৎসাহ দিন।

—মা ও শিশুকে নিরিবিলি কোথাও ঘুরতে নিয়ে যান এবং কিছু ভালো বই পড়তে উৎসাহ দিন, বিষণ্নতা কমে যাবে।

—তার ছোট ছোট ইচ্ছাগুলোকে প্রাধান্য দিন, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। এতে সে মানসিক সুখ লাভ করবে।

—তার প্রতি ধৈর্য্যশীল ও নরম হোন।

—তাকে বিশ্বাস করুন এবং তার ভালো কাজগুলোর প্রশংসা করুন।

—শিশুর যত্ন নিতে তাকে সাহায্য করুন।

—বাড়ির পরিবেশের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে মায়ের ও শিশুর স্বাস্হ্যের উন্নতি হয়। উদাহরণস্বরূপ- তাদের জন্য পর্যাপ্ত আলো, বাতাস ও স্বাস্হ্যসম্মত পরিবেশের ব্যবস্হা করা।

—মা যাতে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারে, এজন্য পরিবারের সদস্যদের এগিয়ে আসতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, ডাক্তারের পরামর্শ নেয়ারও প্রয়োজন হয়।

পরিবারের সদস্যদের যা করা উচিত নয়ঃ

—পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই অধিক সচেতনতা ও সাহায্য করতে যেয়ে প্রসূতির বিরক্তির কারণ হয়। তাদের এই অতি আগ্রহ প্রসূতিকে উদ্ধত ও অসংবেদী করে তুলতে পারে।

—প্রসূতি মাকে কখনো বলা যাবেনা যে, ‘তোমার আরো ব্যায়াম করা দরকার ছিল বা তোমার তো ডায়েট প্ল্যান ঠিক নেই।’ তাকে কখনোই মানসিকভাবে আঘাত করা যাবেনা এবং কোনো ব্যাপারে দায়ী করা যাবেনা।

—সন্তান জন্মদানের পর প্রসূতির দৈহিক গঠন ও ব্যবহার সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এটা কখনোই ভালো ফলাফল দেয় না, বরং মায়ের বিষণ্নতা আরো বাড়িয়ে দেয়।

প্রসব একটি কষ্টকর প্রক্রিয়া এবং প্রসূতি এতে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়তে পারে। পারিবারিক সমর্থন এবং প্রসবোত্তর বিষণ্নতা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। ব্যক্তিভেদে প্রসূতি মায়ের সমস্যা বিভিন্নভাবে হতে পারে। তাই পরিবারের সদস্যদের সতর্ক থাকতে হবে এবং যতটা সম্ভব তাকে সহায়তা করতে হবে। প্রসূতি মায়েরা ছোট- বড় সমস্যা যাই আপনাকে ডিস্টার্ব করছে তাকে ঝেড়ে ফেলুন, নিজে না পারলে নিঃসংকোচে সাহায্য নিন। আপনি এরই মধ্যে পৃথিবীর কঠিনতম কাজটি করেছেন-আপনি মা হয়েছেন, নিজেকে নিয়ে কিছুটা অহংকার আপনাকেই সাজে। মাতৃত্ব হোক নিরাপদ এবং আনন্দের।

লেখক—
সাদিয়া হাসান
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান।

37,206 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *