কেন হয় সবসময় ক্লান্তি এবং বিষণ্ণতা?

লৌহ বা আয়রন:
আমাদের শরীরে রক্ত গঠনে লৌহ বা আয়রন এর প্রয়োজন। আয়রনের সাহায্যে রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় যা শরীরের অক্সিজেন পরিবহনে কাজ করে। আয়রন এর অভাবে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। ক্লান্তি বোধ, মাথা ঘোরা, মাথা ব্যাথা, শীত শীত অনুভূতি ইত্যাদি আয়রন এর অভাবে হতে পারে। 

আমরা দৈনিক নানান ধরনের খাদ্য গ্রহন করি। কিন্তু আমরা কি জানি যে আমাদের গ্রহনকৃত খাদ্যে ঠিক কোন পুষ্টি উপাদানগুলো কি পরিমানে আছে ?  অনেকেই শুধু খাওয়ার জন্য খাই, খেয়াল রাখি না যে এই খাদ্যগুলো আমরা দেহের চাহিদা অনুযায়ী সঠিক পরিমানে গ্রহন করছি কি না।

লৌহের চাহিদা :
একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দেহে লৌহের পরিমান ৩-৫ গ্রাম। এই পরিমানটিকে নিতান্ত কম মনে হলেও এইটুক লৌহ আমাদের সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। মানবদেহের প্রায় ৬৫% লৌহ রক্তের হিমোগ্লোবিনে থাকে, ৫% থাকে পেশীর মায়োগ্লোবিনে। হিমোগ্লোবিন সংশ্লেষনের জন্য এবং জীবিত প্রাণিদেহে শ্বসনের জন্য লৌহ অপরিহার্য।

বিভিন্ন বয়সে নারী-পুরুষ ভেদে এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় লৌহের চাহিদার তারতম্য ঘটে।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন বয়সে ও অবস্থায় দৈনিক লৌহের বরাদ্দ পরিমান নিম্নরূপ :

       বয়স (বছর)  লৌহের পরিমান (মি.গ্রা)
        ০ – ১  ০.১ (প্রতি কে.জি দৈহিক ওজনের জন্য)
        ১ – ৩           ৮
       ৩ – ১২          ১০
  পুরুষ   মহিলা
       ১৩ – ১৫     ১৮      ২৪
      ১৬ – ১৯       ৯      ২৪
      ২০ – ৩৯       ৯      ২৮
      ৪০ – ৪৯       ৯      ২৮
      ৪৯ – ৭৯       ৯        ৯

গর্ভাবস্থায় এবং স্তন্যদানকালে মায়ের খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত ৫ মি.গ্রা লৌহ সংযোজন করতে হবে। কেননা, গর্ভাবস্থায় অমরার বৃদ্ধি ও ভ্রূণের পুষ্টি ও বর্ধনের জন্য অতিরিক্ত লৌহের প্রয়োজন হয়। এ প্রয়োজন পূরনের জন্য দৈনিক প্রায় ২ মি.গ্রা লৌহ বিশোষিত হয়। আবার স্তন্যদানকালে মায়ের দেহ হতে দৈনিক প্রায় ১৫ মি.গ্রা লৌহ মাতৃদুগ্ধের সাথে ক্ষরিত হয়। এছাড়াও সন্তান-ধারন ক্ষমতা বজায় থাকাকালীন সময়ে নারীদেহে লৌহের চাহিদা বেশী থাকে। কারন, এসময়ে ঋতুস্রাবের সাথে প্রায় ১৫-৩০ মি.গ্রা লৌহ দেহ থেকে নির্গত হয়।

লৌহ বা আয়রন এর অভাব এর কারন
আমাদের দেহে লৌহ খুব কম পরিমানে থাকলেও এর অভাবে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। অজ্ঞতা বা অসচেতনতার কারনে আমরা বুঝতেই পারি না যে আমাদের দেহে লৌহের অভাব আছে। তাই আসুন জেনে নেই কি কি কারনে দেহে লৌহের অভাব পরিলক্ষিত হতে পারে।

  • দীর্ঘদিন যাবত পর্যাপ্ত লৌহ সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহন না করা।
  • গর্ভাবস্থায় এবং স্তন্যদানকালে অতিরিক্ত যতটুকু দরকার ততটুকু পরিমান লৌহ সমৃদ্ধ খাবার গ্রহন না করা। এতে করে মা এবং নবজাতক উভয়ের দেহে লৌহের অভাবজনিত সমস্যা পরিলক্ষিত হয়।
  • বাড়ন্ত বয়সে বিশেষ করে মাসিকের সময় যে লৌহ অপচয় হয় তা পূরন না হওয়া।
  • কোন আঘাতজনিত কারনে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়া।
  • কোন কারনে দেহে লৌহের শোষন হ্রাস পাওয়া।
  • ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া অর্থাৎ রক্তস্বল্পতা পরিলক্ষিত হওয়া।

আয়রনের অভাবের লক্ষণসমুহঃ

  • সবসময় ক্লান্তি অনুভুত হয়।
  • দুর্বলতা থাকে।
  • বিষন্নতা বোধ হয়।
  • চামড়া ফ্যাকাশে দেখায়।
  • নিঃশ্বাসের সল্পতা হয়।
  • প্রায়ই মাথা ঘোরা অনুভূত হয়।
  • পায়ে একটি ঝিঁঝিঁ বা ক্রল অনুভূতি হয়।
  • জিহ্বা ফুলে যাওয়া বা ব্যথা হয়।
  • প্রায়ই হাত ও পা ঠান্ডা হয়ে যায়।
  • দ্রুত বা অনিয়মিত হার্টবিট হয়।
  • নখ ভঙ্গুর হয়ে থাকে।
  • ঝিম ঝিম মাথাব্যাথা হয়।
  • কাজে মনোযোগ কমে যায়।

লৌহের দৈনন্দিন চাহিদা কত, অভাব কেন হয় এবং অভাবের লক্ষণ তো জেনে গেলাম। কিন্তু আমরা কি জানি – কোন কোন খাদ্যে লৌহ আছে? অর্থাৎ লৌহের উৎসগুলো কি কি ?
এক্ষেত্রে অনেকেই একবাক্যে বলে উঠবে -“কচু শাকে প্রচুর পরিমানে লৌহ আছে। ”
হ্যাঁ, কচুশাক বিশেষ করে কালো কচুশাক লৌহের একটি উৎকৃষ্ট উৎস। তবে শুধু কচুশাক-ই নয়, লৌহের আরও অনেক উৎস আছে যা আমরা অনেকেই জানি না। তবে চলুন জেনে নেই লৌহের উৎস কোন খাবারগুলো।

লৌহের উৎস :
বিভিন্ন ধরনের খাদ্যে, যেমন প্রাণীজ খাদ্য তথা মাংস,যকৃত,বৃক্ক; শাক-সবজি, নানা ধরনের ফল, শস্য, বাদাম- বীচি জাতীয় ইত্যাদিতে কম বেশী লৌহ বিদ্যমান। এ খাদ্যগুলোতে ঠিক কি পরিমান লৌহ উপস্থিত তা নানান গবেষণার মাধ্যমে জানা গিয়েছে। তার ই একাংশ নিম্নরূপ :

  • প্রাণীজ উৎস :
   খাদ্য (প্রতি ১০০ গ্রামে)  লৌহের পরিমান (মি.গ্রা)
            মাংস            ৩.৮
          শিং মাছ            ২.৩
          কৈ মাছ            ১.৪
       পাবদা মাছ            ১.৩
        রুই মাছ            ১.০
           চিংড়ি            ৫.৩
         ভেটকী            ৩.১
        বেলে মাছ            ১.০
       গরুর মাংস            ০.৮
          যকৃত            ৮.৮
            দুধ            ০.২
          পনির            ২.১
      ডিমের কুসুম            ২.৩
  • শাকসবজি ও ফল :
  খাদ্য (প্রতি ১০০ গ্রামে)  লৌহের পরিমান (মি.গ্রা)
          ডাটাশাক           ২৫.৫
         সরিষাশাক           ১৬.৩
        খেসারি-শাক           ৭.৩
          পুঁইশাক           ১০.০
          মেথিশাক            ১৬.৫
          মূলাশাক            ৩.৬
         পালংশাক            ১০.৯
     কালো কচুশাক            ৩৮.০
        কচুশাক              ১০.০
        পানপাতা              ৭.০
        বরবটি              ৫.৯
          সজিনা              ৫.৩
          করলা              ১.৮
          টমেটো              ১.৮
         ফুলকপি              ১.৭
           সিম              ১.৭
         ঢেড়স              ১.৫
          পটল              ১.৭
        কাঁচামরিচ              ১.৫
        মটরশুঁটি              ১.৭
        বাঁধাকপি              ০.৮
          বেগুন              ০.৯
        কাঁচকলা              ০.৯
 পাকা তেঁতুল (বীচি ছাড়া)              ১০.৯
           পেয়ারা              ১.৪
        পাকা আম              ১.৩
        পাকা কলা              ০.৯
         ডালিম              ০.৩
         বীট              ০.৮
  • খাদ্যশস্য :

 খাদ্য (প্রতি ১০০ গ্রামে)  লৌহের পরিমান (মি.গ্রা)
          ছোলা             ১০.২
           মুগ              ৮.৫
          মসুর              ৬.৩
          মটর              ৫.১
           চাল              ২.৮
          আটা              ৪.৯
          সুজি              ২.৩
  • মসলা :
   খাদ্য (প্রতি ১০০ গ্রামে)   লৌহের পরিমান (মি.গ্রা)
           জিরা            ৩১.৩
           মেথি             ১৪.১
           ধনে             ১৭.৯
       গোলমরিচ             ১৬.০
          হলুদ             ১৪.৮
         মরিচ             ২৩.০
  • সামুদ্রিক খাবার :
       খাদ্য  খাদ্যের পরিমান  লৌহের পরিমান (মি.গ্রা)
 সার্ডিন মাছ   ১/৪ কাপ         ১.৮
 স্যালমন মাছ    ১০০ গ্রাম         ১.৭
  শামুক    ১০০ গ্রাম         ২৮
 সামুদ্রিক চিংড়ি    ১০০ গ্রাম          
 ট্রাউট মাছ      ৭৫ গ্রাম         ১.৫
 টুনা মাছ      ৭৫ মাছ         ১.২
  • বাদাম ও বীচি জাতীয় :
      খাদ্য  খাদ্যের পরিমান  লৌহের পরিমান (মি.গ্রা)
    সয়াবীজ     ১ কাপ        ৮.৮
 পেস্তা বাদাম    ১ আউন্স        ১.১
  কুমড়া বীচি    ২৮ গ্রাম        ৪.২
      টফু    ১২৬ গ্রাম        ৩.৬
 কাজু বাদাম   ১ আউন্স        ৭.৮

তাই আসুন, আমরা সচেতন হই। আমাদের সচেতনতাই পারে দৈনিক লৌহের চাহিদা পূরণ করে সুস্থতা বজায় রাখতে।

লেখক-
জিনাতুল জাহরা ঐশী
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান।

7,549 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *