ডায়রিয়ার পর শিশুর ওজন কমে গেলে কিভাবে স্বাভাবিক হবে?

কিছুদিন আগে এক আত্মীয়া তার ৬ মাস বয়সী ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে যান। অধিক পানিশূন্যতায় ভুগছিল শিশুটি যার কারণে তাকে স্যালাইন দিতে হয়। কিন্ত স্যালাইন দিতে গিয়ে দেখা যায় তার শরীর এতোটাই পানিশূন্য বা ডিহাইড্রেটেড হয়েছিল যে-ছোট শিশুটির হাতে স্যালাইন পুশ করার মতো রগ বা ভেইনই পাওয়া যাচ্ছিল না। ডায়রিয়ায় ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা এমনই এক মারাত্মক অবস্থা তৈরি করে। শিশু অনেক দূর্বল হয়ে পড়ে, কিছুই খেতে চায় না, ফলে শিশু ক্রমে আরও বেশি অসুস্থ হতে থাকে।

ডায়রিয়ার কারণে শিশুর ওজন অনেক কমে যায়, শিশুর দেহে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব দেখা দেয় যার কারণে রোগাক্রান্ত শিশুটির রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়। বিশেষ করে ১ বছরের কম বয়সী ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুদের দেখা যায় ডায়রিয়া সেরে গেলেও পরবর্তীতে সঠিক পরিমানে খাদ্য এবং উপযুক্ত পুষ্টির অভাবে আবারো অসুস্থ হয়ে যায়। ঘন ঘন ডায়রিয়ায় বা অন্য কোন রোগে আক্রান্ত হলে  আক্রান্ত হলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

ডায়রিয়া হলে শিশুদের অনেক বেশি ওজন কমে যায়। বিভিন্ন কারণে এই ওজন কমতে পারে। যেমন  –

* ডায়রিয়া জনিত পানিশূন্যতা।
* খাওয়ার রুচি কমে যাওয়া।
* ডায়রিয়ার কারণে শরীরে পুষ্টি উপাদান শোষণ হ্রাস পাওয়া।
* সঠিক খাদ্য না দেওয়া।

ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুর ওজন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আনতে হলে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

খাদ্যব্যবস্থা জানা হলেও অনেক সময় বাচ্চাদের ঠিক মত খাওয়ানো সম্ভব হয়না কারণ তারা রুচিহীনতায় খেতে চায় না। তাদের জোর করে খাওয়ানোও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তাদের এইসময় আরো বেশি পুষ্টি প্রয়োজন হয় দেহে। তবে কিছু উপায়ে এদের সঠিক পুষ্টি দিয়ে স্বাভাবিক ওজনে ফিরিয়ে আনা যায়।

০-৬ মাস বয়সী ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুদের যেসব দিকে খেয়াল রাখতে হবে :

১. ডায়রিয়া চলাকালীন ও পরবর্তী অবস্থায় এই বয়সী শিশুদের মায়ের দুধ পান করানো বাড়িয়ে দিতে হবে। এতে হঠাৎ করে বেশি ওজন কমে যাওয়া রোধ করা যাবে এবং আগের ওজনে ফিরে আসতে সহায়ক হবে।

২. মায়ের দুধ ছাড়া আর অন্য কোন ধরনের পানীয় দেওয়া যাবে না শিশুকে। শুধুমাত্র ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর দেওয়া ঔষধ খাওয়াতে হবে। 

৩. শিশুর ওজন খুব ভালো করে লক্ষ্য করতে হবে ডায়রিয়া চলাকালীন ও পরবর্তী অবস্থায়। এসময় যদি খুব বেশি ওজনহানি হয় বা ডায়রিয়ার পরেও ওজন বৃদ্ধি না পায় তবে অতিসত্বর এ বিষয়ে একজন ডায়েটিশিয়ান বা কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

৬-১২ মাস বয়সী ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুদের যেসব দিকে খেয়াল রাখতে হবে :

১. অসুস্থতাকালীন অবস্থায় মায়ের দুধ খাওয়ানোর পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে, সাথে বয়স অনুযায়ী অন্যান্য স্বাস্থ্যকর রান্না করা খাবার দিতে হবে যাতে ওজন কমানো রোধ করা যায়।

২. ডায়রিয়া পরবর্তী দুই সপ্তাহে প্রতিদিনের সাধারণ খাবারের পরিমান একটু একটু করে বাড়িয়ে দিতে হবে। শিশুকে মায়ের দুধের সাথে সাথে স্বাভাবিক দানাদার খাবারে ভালো করে অভ্যস্ত করাতে হবে।

৩. শিশুকে ফুটানো বা পরিশোধিত পানি পান করাতে হবে।

৪. শিশুর ডায়রিয়া শুরু হলে প্রথম এক ঘন্টা পানি দিতে হবে এবং তারপর পানির সাথে সাথে ওরস্যালাইন দিতে হবে। শিশুর শরীরে পানিশূন্যতা না কমা পর্যন্ত ওরস্যালাইন খাওয়াতে হবে। যতবার পায়খানা করে ততবার ওরস্যালাইন দিতে হবে। এছাড়া শিশুর দূর্বলতা কাটাতে জিংক ট্যাবলেট দিতে হবে।

এখন জেনে নিই ডায়রিয়া আক্রান্ত ও পরবর্তীকালে শিশুদের যেসব উপায়ে খাদ্য দেওয়া হলে ওজন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সহজ হবে :

১. দিনে অল্প অল্প করে বারবার খাবার দিতে হবে শিশুকে, তরল খাবার বেশি দিতে হবে। এমন ধরনের খাবার তৈরি করে বাচ্চাকে দিতে হবে যা সুস্বাদু এবং পেটের জন্য উপাদেয় হয়। অল্প অল্প করে খাবার বাটিতে নিয়ে শিশুকে খেতে দিতে হবে যাতে সে খাবারে আগ্রহী হয়।

২. মশলাযুক্ত ও চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে। এধরনের খাবারে ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুর পেটে যন্ত্রণা দেখা দেয়। এসব খাবার সহজে হজম হয়না, শিশুর পেটে জ্বালাপোড়া করে এবং ডায়রিয়া আরো প্রকট হয়। তেলে ভাজা খাবার পরিহার করতে হবে। এসব খাবারে অসুস্থ শিশুর অসুস্থতা আরো বাড়ে।

হালকা মসলার রান্না

৩. শিশু কি ধরনের খাবার পছন্দ করে সেসব খাবার খেতে দিতে হবে। সেইসাথে রান্নার পদ্ধতির দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। যেমন- চিকেন ফ্রাই এর চেয়ে মুরগীর স্যুপ সুপাচ্য। কারণ ডিপ ফ্রাই বা ডুবো তেলে ভাজা খাবার ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্য ক্ষতিকর। মুরগীর স্যুপ সুপাচ্য যা তৈরি করে খাওয়ালে শিশু আগ্রহ নিয়ে খাবে এবং দেহে পুষ্টির শোষণ সহজ হবে।

৪. শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমানে পানি ও তরল খাবার দিতে হবে। এতে করে তার দেহে ডায়রিয়ার ফলে যে পানিশূন্যতা হয়েছে তা কাটিয়ে উঠা সহজ হবে। শিশুকে সোডিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সম্পন্ন তরল খাদ্য খাওয়াতে হবে যেমন ওরস্যালাইন, স্যুপ, ডাবের পানি, ভাতের মাড় ইত্যাদি। তবে শিশুকে বিভিন্ন ফলের জুস যেমন আপেল জুস, বিভিন্ন কার্বোনেটেড ড্রিংক্স যেমন পেপসি, সেভেন আপ, কোকাকোলা দেওয়া যাবেনা। যেসকল শিশু এখনো মায়ের দুধ খায় তাদেরকে মায়ের দুধ ছাড়া বাইরের গরুর দুধ বা অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবার দেওয়া উচিত নয়-ডায়রিয়া চলাকালীন ও তার পরবর্তীকালে ১মাস।

৫. শিশুকে ব্লেন্ড করা খাদ্য দেওয়া যেতে পারে, বিশেষ করে শস্য জাতীয় খাবার। খাদ্য সিদ্ধ বা বেকিং করে তৈরি করলে তাতে খাবারের কড়া গন্ধ বা ফ্লেভার হবেনা। খাবারের কড়া গন্ধ ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুকে খাবারে অনাগ্রহী করে তোলে। এক্ষেত্রে শিশুকে বেশ কিছু খাবার দেওয়া যায় যেমন –

* সিদ্ধ ডিম, সিদ্ধ আলু, কলা।
* টোস্ট বা সাদা পাউরুটি স্লাইস করা।
* সিদ্ধ পাস্তা, কম তেল মশলা দেওয়া।
* বিভিন্ন সিরিয়ালস যেমন খই, কর্নফ্লেকস, ওটমিল।
* সাদা ময়দা দিয়ে তৈরি প্যানকেক।
* সিদ্ধ ও কম তেলে রান্না করা বিভিন্ন সবজি। যেমন – গাজর, মাশরুম ইত্যাদি।

৬. ডায়রিয়ার সময় বা তারপরে সাধারণত শিশুকে মায়ের দুধ ছাড়া অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবার দেওয়া উচিত নয়, তবে কম চর্বিযুক্ত ঘরে বানানো দই খেতে দেওয়া যায়, এটি তার পাকস্থালীর জন্য উপকারী। এটি তার পরিপাকনালীতে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বাড়ায়। এছাড়া দই এর সাথে অন্যান্য ফল যেমন আম, কলা,স্ট্রবেরি ইত্যাদি দিয়ে পানি মিশিয়ে ব্লেন্ড করে ঠাণ্ডা করে স্মুদি বানিয়ে দিলে শিশু খাবারে আরো বেশি আগ্রহী হবে, তার খাবারে রুচি ফিরে আসবে। এতে তার দেহের পানিশূন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারবে।

৭. শিশুর ডায়রিয়া সেরে গেলে তাকে স্বাভাবিক খাবারে ফিরিয়ে নিতে কিছুদিন সময় নেয়া উচিত। শিশুকে শুধুমাত্র তিনবেলা আহারের জায়গায় না খাইয়ে খাবারকে ছোট ছোট ভাগ করে একটু পর পর খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা উচিত। শিশুর ডায়রিয়া ঠিক হওয়ার সাথে সাথেই তাকে সাধারণ খাবারে জোর করা উচিত নয়। কারণ তার পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক খাবারে আবারো অভ্যস্ত হতে বেশ কিছু সময় প্রয়োজন হয়। যদি জোর করে শিশুকে স্বাভাবিক খাবার খাওয়ানো হয় তবে তার ডায়রিয়া আবার ফিরে আসতে পারে।

এভাবে সঠিক খাবার প্রস্তুত করে দিলে ছোট শিশুর ডায়রিয়াজনিত খাবারে অরুচি এবং পুষ্টিহীনতা কমিয়ে ওজন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এছাড়া ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুর খাদ্যব্যবস্থা কি ধরণের হবে জানতে পড়ুন  “শিশুদের ডায়রিয়ায় খাদ্য ব্যবস্থায় কি করবেন” লেখাটি।

লেখক—
আনিকা জাহিন ত্রনি
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান
। 

5,025 total views, 10 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *