ফরমালিন এ ভয় -আর নয় আর নয়

খাদ্যে ফরমালিন 

পত্র-পত্রিকা বা সংবাদ মাধ্যমের বদৌলতে আজকাল একটি বিষয় খুবই পরিচিত- তা হল খাদ্যে ফরমালিন। খাদ্য-দ্রব্য অনেকদিন পর্যন্ত সতেজ রাখার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ফরমালিন। শাক-সব্জি, ফল-মূল, মাছ-মাংস কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে না এ ফরমালিন। কিন্তু ফরমালিন খাদ্যে ব্যবহারোপযোগী কোন উপাদান নয়, বরং এটি মূলত ব্যবহার করা হয় রঙ, প্লাস্টিক, বস্ত্রশিল্প, মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ সহ নানা শিল্পক্ষেত্রে।

ফরমালিন হিসেবে আমরা যা জানি তা ফরম্যালডিহাইড এর দ্রবণীয় রূপ। এ ফরম্যালডিহাইড প্রকৃতিতে একটি সাধারণ যৌগ রূপে সামান্য পরিমানে অবস্থান করে এবং এটি প্রাকৃতিকভাবেই কিছু শাক-সব্জি, ফলে পাওয়া যায়। তাই খাদ্যে প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত ফরমালিন বা ফরম্যালডিহাইড আমাদের জন্য ক্ষতিকর নয়। কারন, এর পরিমান খুবই কম এবং আমাদের দেহে এটির বিপাক ঘটে যা মুত্রের মাধ্যমে শরীর হতে নির্গত হয়।

এখন, যখন ফরমালিন বাইরে থেকে কেমিক্যাল প্রিজারভেটিভ হিসেবে খাদ্যে প্রয়োগ করা হয় তখনই তা আমাদের জন্য বিপদ ডেকে আনে। এ রাসায়নিকটির ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে আমরা কম-বেশি সবাই জানি। শুধু খাদ্যের মাধ্যমেই নয়, এটি শ্বাস-প্রশ্বাস এর মাধ্যমেও আমাদের দেহে প্রবেশ করে ক্ষতিসাধন করতে পারে। ফরমালিন এর প্রভাবে আমাদের চোখ, নাক, ত্বক, কিডনি, লিভার ইত্যাদি অঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অনেকক্ষেত্রে এর পরিণাম মৃত্যুও হতে পারে।
তবে সম্প্রতি এ বিষয়ে Bangladesh Food Safety Authority(BSFA) এর একটি গবেষণায় উঠে এসেছে কিছু চমকপ্রদ তথ্য। ২০১৭ সালে National Workshop on Food Crop, Food Security and Sustainability নামক একটি workshop এর আয়োজন করা হয়েছিল। এই ওয়ার্কসপে বর্তমানে বাংলাদেশের খাদ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং এ সংক্রান্ত কিছু গবেষণার ফলাফলের ব্যাপারে জানানো হয়।

BSFA এর গবেষণা মতে শাক-সব্জি ও ফলে ফরমালিন এর ব্যবহার বেশি মনে হলেও আসলে তা খুব একটা বিপদজনক নয়। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ফল ও সবজিতে ব্যবহৃত ফরমালিন ফল ও সবজির ভিতরে ঢুকতে পারে না এদের খোসার সেলুলজিক গঠন এর জন্য। ফল ও সব্জির গাঠনিক উপাদান সেলুলোজ। আর এ উপাদানটি ফল ও সব্জির প্রতিরক্ষক হিসেবে কাজ করে ফরমালিন এর বিপরীতে। অর্থাৎ, ফল ও সব্জিতে ব্যবহৃত ফরমালিন এদের ত্বকে থাকে, ত্বক ভেদ করে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত অংশে প্রবেশ করতে পারে না। ত্বকে উপস্থিত ফরমালিন প্রচুর পরিমান পানি দ্বারা ধৌত করার ফলে অপসারিত হয়।ফরমালিন প্রচুর পরিমান পানি দ্বারা ধৌত করার ফলে অপসারিত হয়

অন্যদিকে আপেল, মাল্টাসহ বিদেশ থেকে আমদানিকৃত আরও অনেক ফলে ফরমালিন এর ব্যবহার হয়ে থাকে বলে একটি কথা প্রচলিত আছে। কেননা এই ফলগুলো অনেকদিন পর্যন্ত তাজা থাকে। এর কারন ফরমালিন এর ব্যবহার নয়, অনেক দূর থেকে আমদানি করা হয় বলে এ ফলগুলো প্যারাফিন জাতীয় মোমের আস্তরন দ্বারা আবৃত থাকে। আর এ মোমের আস্তরন ক্ষতিকারক নয়, এটি গ্রহণে দেহের কোন ক্ষতি হয় না। তাছাড়া এ আস্তরন পানি দিয়ে ভালভাবে ধোয়া হলে আর থাকে না। এ প্যারাফিন আস্তরনের কারনে ফলের জলীয় অংশ বের হয়ে যায় না যার জন্য অনেকদিন পর্যন্ত ফল অপচনশীল অবস্থায় থাকে।

এখন একটি কথা মনে হতেই পারে যে, ফরমালিন যদি ফল ও সবজিতে প্রবেশ করতে না-ই পারে তবে বিভিন্ন সময়ে করা ফল ও সব্জিতে ফরমালিন আছে কি না সে পরীক্ষার ফলাফল কিভাবে আসে। ফরমালিন পরীক্ষা করার যন্ত্র তাহলে কিভাবে ফরমালিন শনাক্ত করে? FAO এর একটি গবেষণায় এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়। সেই গবেষণা মতে, আমাদের দেশে ফরমালিন শনাক্তকরনের জন্য যে যন্ত্র ব্যবহৃত হয় তা আসলে ফল বা সব্জির অভ্যন্তরের ফরমালিন শনাক্ত করে না। বরং তা ফলমূল হতে সৃষ্ট ফরমালিনকে যা ঐ মুহূর্তে ফল-মূলের চারপাশের বায়ুমন্ডলে উপস্থিত থাকে তাকে শনাক্ত করে। এজন্যই ফরমালিন শনাক্তকরন যন্ত্রে দেখায় যে, ফল ও সব্জিতে ফরমালিন এর ব্যবহার হয়েছে।

পর্যাপ্ত পানি দিয়ে অনেকবার করে ধোয়া এবং রান্নার সময় সিদ্ধ করার ফলে ফরমালিন অপসারিত হয়

আবার মাছ, মাংস, দুধেও ফরমালিন ব্যবহৃত হয়। ফল ও সব্জিতে প্রয়োগকৃত ফরমালিন না হয় তাদের ত্বকের গঠনের জন্য ভেদ করে না কিন্তু মাংস বা মাছে তো কোন সেলুলোজিক গঠন নেই। এই ফরমালিন যুক্ত মাংস বা মাছ গ্রহনের ফলে তা আমাদের দেহেও প্রবেশ করতে পারে। তবে কি ফরমালিন থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য আমরা মাছ, মাংস, দুধ খাওয়া ছেড়ে দিব?

দুধে ব্যবহৃত ফরমালিন রান্নার ফলে (তাপমাত্রা ৯৬ডিগ্রি সেলসিয়াস) অনেকটাই বাষ্প হয়ে যায় এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়

অবশ্যই নয়। এর জবাব দিয়েছেন FAO Food Safety Programme এর Technical adviser John Ryder. তার ভাষ্যমতে খাদ্য রান্নার পূর্বে পর্যাপ্ত পানি দিয়ে অনেকবার করে ধোয়া এবং রান্নার সময় সিদ্ধ করার ফলে ফরমালিন অপসারিত হয়। খাদ্যে ব্যবহৃত ফরমালিন রান্নার ফলে (তাপমাত্রা ৯৬ডিগ্রি সেলসিয়াস) অনেকটাই বাষ্প হয়ে যায় এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। দুধে ব্যবহৃত ফরমালিন থেকেও এভাবেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
খাদ্যে প্রাকৃতিকভাবে ফরম্যালডিহাইড বিদ্যমান তা তো আমরা জেনেছি। এ ফরম্যালডিহাইড এর পরিমান প্রতি কে.জি তে কতটুকু তা Centre for Food Safety নামক প্রতিষ্ঠান তাদের একটি গবেষণাপত্রে প্রকাশ করেছে। এই পরিমাণ নিম্নরূপ –

১। শাক-সব্জি ও ফলঃ

                      খাদ্যের নাম   ফরম্যালডিহাইড এর পরিমাণ    (mg/kg)
                      আপেল                       ৬.৩-২২.৩
                       কলা                           ১৬.৩
                      আঙ্গুর                            ২২.৪
                     নাশপাতি                        ৩৮.৭-৬০
                       তাল                           ১১.২
                     তরমুজ                            ৯.২
                     বাঁধাকপি                             ৫.৩
                       ফুলকপি                           ২৬.৯
                         গাজর                        ৬.৭-১০
                          শশা                       ২.৩-৩.৭
                        পিঁয়াজ                           ১১
                     মূলা (সাদা)                       ৩.৭-৪.৪
                         আলু                         ১৯.৫
                        টমেটো                      ৫.৭-১৩.৩
                      পালং শাক                      ৩.৩-৭.৩
                            বিট                           ৩৫

২। মাংসঃ

                      খাদ্যের নাম   ফরম্যালডিহাইড এর পরিমাণ    (mg/kg)
                        গরুর মাংস                                ৪.৬
                           ভেড়া                                  ৪
                          মুরগি                           ২.৫-৫.৭

৩। দুধ ও দুগ্ধজাতীয়ঃ

                      খাদ্যের নাম   ফরম্যালডিহাইড এর পরিমাণ    (mg/kg)
                     গরুর দুধ                          <৩.৩
                    ছাগলের দুধ                                ১
                       পনির                             <৩.৩

ফরমালিন এর ভয়ে শাক-সব্জি, ফল, মাছ-মাংস, দুধ ইত্যাদি খাওয়া বাদ দেওয়া একেবারেই অনুচিৎ। কেননা সঠিক সাবধানতা গ্রহণ করলে ফরমালিন আমদের দেহে খুব কম পরিমানে যাচ্ছে আর যেটুকু যাচ্ছে তা আদতে দেহে ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম নয়।  তবে দেশে খাদ্যে রাসায়নিকের ব্যবহার রোধে অবশ্যই আইনের কঠোর প্রয়োগ  কাম্য।

লেখক-
জিনাতুল জাহরা ঐশী
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ এই লেখাটিতে ব্যবহৃত তথ্য সমূহের রেফারেন্স
১। https://www.thedailystar.net/country/no-formalin-vegetable-fruits-bangladesh-food-safety-authority-adulteration-artificial-eggs-1450948
২। http://article.sciencepublishinggroup.com/
৩। www.cfs.gov.hk/english/programme/programme_rafs/programme_rafs_fa_02_09.html
৪। http://www.fao.org/in-action/food-safety-bangladesh/resources/did-you-know/detail/en/c/380816/

21,049 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *