দুধ- খাবো নাকি খাবো না !

ছোটবেলা থেকে আমরা স্কুলে, মায়ের মুখে শুনে আসছি দুধ খেলে হাড় শক্ত হয়,স্বাস্থ্য ভালো থাকে, চেহারা সুন্দর হয়, পড়ায় মন বসে, পড়া মনে থাকে ভালো, ঘুম হয় দারুন! মোটকথা দুধের গুণের যেন কোন কমতি নেই। বিনা বাক্য ব্যয়ে চুপচাপ দুধটুকু সাবাড় করলেই শান্তি!

সন্দেহ নেই দুধ সর্বোত্তম আদর্শ খাদ্য। কথার মর্মাথ বুঝতে পারি আর না পারি, দুধ পান করার প্রথম অভিজ্ঞতা বোধ করি আমাদের অধিকাংশেরই খারাপ। জোর জবরদস্তির কারণে দুধ পানের অভ্যাস আমাদের গড়ে উঠলেও মায়েদের সেই অভ্যাস অনেক আগেই হারিয়ে যায়। মায়েরা ভুলেই যায় দুধ শুধু শিশুদের নয়, জন্ম হতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সকলের পান করা উচিত। শুধু মা কেন, একটু মনযোগ দিয়ে কোন পরিবারের খাদ্য তালিকা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে পরিবার এর বেশির ভাগ সদস্য এর খাদ্য তালিকাতে দুধ অনুপস্থিত। যদিও আমরা সকলেই দুধ এর অপরিহার্যতা সম্পর্কে জ্ঞাত। কিন্তু আমরা আসলে দুধ এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কতটুকু জানি?চলুন দুধের গুণগুলো দেখে নিই এক ঝলকে-

ওজন কমাতে সাহায্য করেঃ 
মেয়েদের জন্য সুখবর! প্রতিদিন দুধ পান করার ফলেমেয়েদের শরীর গঠন সুঠাম এবং সুদৃঢ় হয়। যদিও প্রতিদিন দুধ পান করার সাথে ব্যায়ামও চালিয়ে যেতে হবে নিয়মিত।  স্পোর্টস ডায়েটিশিয়ানদের মতে, যে সকল মহিলারা ওজন কমাতে ইচ্ছুক তারা প্রতিদিন দুধ কে প্রোটিন এর উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। রিসার্চে দেখা গিয়েছে যে, যারা প্রতিদিন দুধ পান করে তারা, তাদের তুলনায় অধিক ওজন হ্রাস করছে যারা কিনা দুধ পান করেন না নিয়মিত।  যদিও অনেকের ক্ষেত্রে দুধ খাওয়ার কারনে বদহযম হয়ে থাকে, তবে তা উপেক্ষাযোগ্য। এর কারণ হিসেবে দায়ী করা যেতে পারে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতাকে।

প্রোটিন এর উত্তম উৎসঃ   
দুধে সকল অ্যামিনো এসিড সঠিক পরিমানে থাকায় দুধ কে প্রোটিন এর আদর্শ উৎস হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে যারা পেশির উন্নয়ন করতে চায় তাদের জন্য দুধ, শরীরে প্রোটিন এর চাহিদা পূরণ করে। উল্লেখ্য, আজকাল অনেকে প্রোটিন পাউডার গ্রহন করে থাকে, যা তারা দুধ এর বিকল্প হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিক উৎস হতে প্রাপ্ত খাদ্য কে, কখনও “কৃত্রিম” খাদ্যের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।এতে নানা ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সহ শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষাও ভেংগে পড়তে পারে।

দুধের প্রোটিন অধিক সময় ধরে পাকস্থলি পূর্ণ রাখে এবং অধিক খাদ্য গ্রহণের প্রবণতাকে হ্রাস করে। গরুর দুধ ব্যাতীত  আজকাল “সয়ামিল্ক” এর প্রচলন দেখা যায়, যা নিরামিশভোজিদের পছন্দের তালিকায় আছে।যদিও এটি একটি ফার্মেন্টেড খাদ্য হওয়ায় খুব বেশি পরিমানে এর উপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো যাবেনা। কারণ সত্যিকার অর্থে  প্রাকৃতিক খাবারের বিকল্প আসলেই কোন প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবার হতে পারেনা।

এখন দেখে নেওয়া যাক সয়া মিল্ক ও সাধারণ দুধের মধ্যে পার্থক্য,

সয়া দুধ বনাম সাধারণ দুধ

পুষ্টিউপাদান সয়াদুধ(২৫০মিলি) দুধ(২৫০মিলি)
স্বাভাবিক ফরটিফাইড(অধিক ক্যালসিয়াম

চিনি বর্জিত)

ফুল ক্রিম উচ্চ ক্যালসিয়াম, ফ্যাট বর্জিত
শক্তি(ক্যালরি) ১৩৮ ১৪৩ ১৫০ ১১০
প্রোটিন(গ্রাম) ১০ ৮.৮
ফ্যাট(গ্রাম) ৩.৮ ৮.১ ২.৫
 স্যাচুরেটেড ফ্যাট (গ্রাম) ^ ০.৭ ^ ১ ^ ৪.৭ ^ ১
কোলেস্টেরল (মিলি.) ২৫ ৬.৩
ক্যালশিয়াম (মিলি.) ২৫ ৪৫০ ২৮২ ৩৭৫

সয়া হতে পাওয়া যায় কম ফ্যাট , ভালো পরিমাণে উদ্ভিদ জাতীয় প্রোটিন, এটি কোলেস্টেরল মুক্ত, স্যাচুরেটেড ফ্যাট গরুর দুধ হতে কম এবং শরীরের এল ডি এল –এর পরিমাণ কমায়। অপরদিকে গরুর দুধ-এ সয়ামিল্ক অপেক্ষা অধিক ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।গরুর দুধে থাকে অধিক পরিমাণ ভিটামিন বি ১২ এবং ভিটামিন ডি। যদিও আজকাল সয়া দুধে কৃত্রিম উপায়ে ভিটামিন যোগ করা হয়। যার কারণে অনেকক্ষেত্রে লো-ফ্যাট দুধের তুলনায় ফরটিফাইড সয়া দুধ অধিক পুষ্টিকর।

অধিক পুষ্টি, কম ক্যালরিঃ
(৮ আউন্স তথা ২৪০মিলি/১ কাপ দুধে থাকে ক্যালরি। অপরদিকে ২ টুকরো মুরগির মাংশ বা ১ এবং অর্ধেক ডিম বা ১টি মাঝারি সাইজের আলু তে থাকে ১০০ ক্যালরি।

ফলে পরিমানে বেশি এবং পুষ্টি যুক্ত উপাদান গ্রহণ করে শরীরের ক্যালরি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব, দুধ গ্রহণের মাধ্যমে।)

দেখে নেওয়া যাক, ১০০ ক্যালরির মধ্য প্রোটিন জাতীয় খাদ্যর পরিমাণ,

    প্রোটিন জাতীয় খাদ্য           পরিমাণ    ক্যালোরি
     দুধ     ৮ আউন্স/২৪০মিলি/১কাপ      ১০৩
   মুরগীর মাংস        ১ টুকরা      ১০০
     মাছ        ১/২ কাপ      ১০৩
     ডিম          ১ টি      ৭৮

উপরিউক্ত তালিকা হতে বোঝা যাচ্ছে, অন্যান্য খাদ্যের তুলানায় দুধ কম পরিমাণ গ্রহণ করে অধিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। ফলে ওজন বৃদ্ধির হার হ্রাস পাবে।

পেশি শক্তির বৃদ্ধিঃ
যারা শরীর চর্চা করে নিজের পেশি বৃদ্ধি করার চিন্তা করছেন, দুধ কে আপনি বেছে নিতে পারেন আপনার প্রোটিনের উৎস হিসেবে। দুধের শাখান্বিত অ্যামিনো এসিড চেইন,পরিশ্রমের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ কোষ মেরামতে সাহায্য করে।

প্রানি উৎস হতে প্রাপ্ত প্রোটিন শরীরে অধিক দ্রুত শোষিত হয়। যা দীর্ঘমেয়াদি “লীন মাসেল মাস” তৈরিতে সাহায্য করে। দুধ মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতেও রাখে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।

বয়স বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করেঃ
বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে হাড়ক্ষয় হতে শুরু করে। যার কারণে হতে দেখা যায় “অস্টিওপোরোসিস”। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি এর পর্যাপ্ত পরিমান গ্রহণের ফলে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পায়।

দুধে প্রাপ্ত ভিটামিন ডি, আমাদের হাড়ের শক্তি ও পেশি ভরের ভারসাম্য রক্ষা করে । শুধু এ জন্যই “৩০ বছর” পর্যন্ত আমাদের প্রতিদিন, নিয়মি্‌ত সঠিক পরিমান দুধ পান করা জরুরী। যা পরবর্তী সময়ে অস্টিওপোরোসিস হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস করবে।

অবশ্য ৩০ এর পর দুধ খাওয়া ছেড়ে দিলেও হবে ব্যাপারটা এমন নয়।কথা হল,বয়স ৩০ পর্যন্ত শরীরে ক্যালসিয়াম এর  শোষণ খুব ভালো হয়।এই সময়ের পর দুধ খেলেও শরীরে খুব বেশি শোষিত হয় না ক্যালসিয়াম। যদিও অল্প শোষণ  হয় কিন্তু এটাও  অনেক উপকারী।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিঃ
বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে প্রমানিত হয়েছে যে, ফ্যাট জাতীয় খাদ্যে বিদ্যমান ভিটামিন-এ, কে-২, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, ডায়বেটিস, ক্যান্সার, হৃদরোগের সম্ভাবনা হ্রাস করে।

ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল এর গবেষণা অনুসারে, যে সকল অংশগ্রহণকারীরা প্রতিদিন দুধ জাতীয়

খাদ্য গ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে মৃত্যুহার ও হাড়ক্ষয় কম দেখা গিয়েছে। 

শুধু ক্যালসিয়ামই নয়,আরও অনেক কিছুঃ
ক্যালসিয়াম এর চাহিদা পূরণ এ দুধের বিকল্প নাই তা আমরা সকলেই জানি। তবে শুধু ক্যালসিয়ামই (১২৩ মিগ্রা/১০০মিলি) নয়, দুধে আছে,

          উপাদান            পরিমাণ
ফসফরাস        ১২৩ মিগ্রা/১০০মিলি
ম্যাগনেশিয়াম         ১২মিগ্রা/১০০মিলি
পটাশিয়াম         ১৪৪মিগ্রা/১০০মিলি
সোডিয়াম         ৫৮ মিগ্রা/১০০মিলি
ক্লোরিন         ১১৯মিগ্রা/১০০মিলি
সালফার         ৩০মিগ্রা/১০০মিলি
সাইট্রিক এসিড         ১৬০মিগ্রা/১০০মিলি

যদিও ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে শুধু দুধ কে উল্লেখ করা উচিত নয় কেননা আমরা পুঁইশাক হতেও ভালো পরিমান ক্যালসিয়াম পেয়ে থাকি।

১০ কাপ পরিমান পুঁইশাকের ক্যালসিয়াম  = ১ কাপ দুধ এর ক্যালসিয়াম ।

ফলে বোঝা যাচ্ছে যে, ১ কাপ দুধ হতে অন্যান্য উদ্ভিদ উৎসের তুলনায় অধিক পরিমাণ ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।

অতিরিক্ত কোন কিছুই ভালো নয়ঃ
দুধ প্রতিদিন যেমন পান করা দরকার, তবে অতিরিক্ত দুধ পানের (দিনে ৩ গ্লাসের অধিক)কারণে ৪৪% নারীদের ক্যানসারের সম্ভাবনা , ৬০% হিপ ফ্রাকচার, ১৬% এর হাড্ডি ক্ষয় হতে দেখা গিয়েছে।

দুধ সম্পর্কে অনেক কিছু জানা হল, এবার জানি কার জন্য কত টুকু দুধ প্রয়োজন।

কার জন্য কত টুকু দুধ প্রয়োজনঃ
দুধ শরীর এ ক্যালসিয়াম এর চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। জন্মের পর মায়ের দুধ শিশুর জন্য আবশ্যক।

এক বছর বয়সের পর থেকে শিশুদের গরুর দুধ দেয়া যেতে পারে। প্রথমে এক কাপ তারপর দুই কাপ। বাড়ন্ত বয়সের শিশুরা ৩-৪ কাপ দুধ পান করতে পারে/ তবে বয়স বৃদ্ধি পাওয়ের সাথে সাথে দুধ খাওয়ার পরিমান কমিয়ে দিতে হবে।

শেষ কথা, প্রতিদিন দুধ খেতে হবে। দুধ খাওয়ার অনভ্যাসের কারণে ইদানীং যাদের পূর্বে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা ছিলোনা তাদেরও এই সমস্যাটি  দেখা দিচ্ছে। যাদেরএই সমস্যাটি পুরনো অর্থাৎ  দুধ খেলে সমস্যা হয় তাদের দুধ জাতীয় খাদ্য খেতে হবে। প্রতিদিন এর একটু একটু চেষ্টা আপনার আগামী দিন সফল ও সাফল্য মণ্ডিত করবে, ব্যাথামুক্ত নিরোগ দেহ লাভের মাধ্যমে।

 

লেখক-
নানজীবা ইবনাত
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান।

 

 

 

সম্পাদনা –
তামান্না তাহসিন আহমেদ
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ।

5,049 total views, 4 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *