স্বাগতম মাতৃত্বের ভুবনে(পর্ব ৩-নতুন মায়ের যত্ন)

গতপর্বে আপনাদের জানিয়েছলাম নতুন মায়ের খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কিছু তথ্য। আজ চলুন দেখে নেয়া যাক নতুন মা কে কী করে নিজের প্রতি  যত্নবান হতে হয়,কী করে অন্যদের  তার পাশে যত্নশীল হয়ে থাকতে হয়।

♥ মায়ের বিশ্রাম, ঘুম,চলাফেরাঃ প্রসবের পরবর্তী ৮-১০ ঘন্টা মাকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দিতে হবে।আর এভাবেই ১-২ সপ্তাহ হওয়া দরকার।প্রসবের পরদিন থেকেই স্বাভাবিক চলাফেরা শুরু করা দরকার।এতে জরায়ুর ভেতরে জমে থাকা রক্ত বের হয়ে গিয়ে রক্ত জমাটের সমস্যা বা রোগ গুলো হয়না,মল মুত্র ত্যাগের ক্ষেত্রে কোন জটিলতা হয়না,মা মানসিক ও শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকেন।তবে স্বাভাবিক চলাফেরার মানে এটা নয় যে,সাংসারিক কাজ কর্ম কিংবা কর্মস্থলে যোগদান করবে।

♥ প্রস্রাবের সমস্যাঃ প্রস্রাবের সময় জ্বালা হওয়া,সংক্রমণ,পরিপূর্ণভাবে প্রস্রাব না হওয়া ইত্যাদি।এসকল সমস্যা এড়াতে প্রচুর পানি খেতে হবে,প্রস্রাব অনুভূত হলেই বারবার করা-চেপে না রাখা,পরিচিত সঠিক স্থানে সঠিক ভাবে প্রস্রাব করা।

♥ সেলাইয়ের স্থানের যত্নঃ অনেক সময় দেখা যায় স্বাভাবিক ডেলিভারির ক্ষেত্রেও পেরিনিয়াম কাটতে হয়। এক্ষেত্রে বারবার প্রস্রাব বা রক্তস্রাবজনিত কারনে স্থান টি দ্রুত শুকিয়ে উঠতে পারেনা।তখন ভাল মানের স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে হয় ও বারবার বদলে নিতে হয় যেন বেশিক্ষণ জায়গাটি ভেজা না থাকে।

♥ স্তনের যত্নঃ প্রসবের পর মায়ের বুকে দুধ আসায় নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে স্তনে।তাই প্রতিবার বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর আগে এবং গোসলের সময় স্তন ও এর বোঁটা ভালভাবে পরিষ্কার করতে হবে।এতে দুধ বের হওয়া ছিদ্রগুলো বন্ধ হবেনা।স্তনে মাঝেমাঝে ব্যথা হতে পারে।এক্ষেত্রে গরম সেঁক দেয়া যায়।

♥ দুগ্ধদানঃ মায়ের উচিত যত দ্রুত সম্ভব বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো। কারন এতে অক্সিটোসিন নামক হরমন নিঃসৃত হয়ে মায়ের জরায়ুর ও রক্তনালীর সংকোচনে সাহায্য করে।ফলে মায়ের প্রসব পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তপাত বন্ধ হয়।এছাড়াও মায়ের জরায়ু ও স্তন ক্যান্সারজনিত আশংকা কমে।স্তনে উৎপাদিত শালদুধ বাচ্চার জন্য খুব উপকারী কিন্তু এটি সর্বোচ্চ ৪৮ঘন্টার ভেতরেই শেষ হয়ে যায়।তাই যত দ্রুত সম্ভব বাচ্চাকে এটি অবশ্যি খাওয়াতে হবে।

♥ মায়ের স্বাচ্ছন্দ্যবোধঃ মা কেই বাচ্চার যত্ন নিতে দেয়া উচিত।এতে মাও শিশু দুইয়ের মানসিক স্বাস্থ্য ভাল থাকে।মা যেভাবে বাচ্চার যত্ন নিতে চান,খাওয়াতে চান এবং বাচ্চার চাহিদামত সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে যে তা ঠিক আছে কিনা,মা আরাম পাচ্ছে কিনা।এতে মা ও বাচ্চা দুইজন ই নানা ধরনের রোগ থেকে মুক্ত থাকেন।কমপক্ষে ৬ মাস পর্যন্ত এভাবে চালাতে হবে।মা ও বাচ্চা একই বিছানায় থাকবে।

♥ মায়ের প্রয়োজনীয় টিকাসমূহঃ  

♦ইঞ্জেকশান অ্যান্টি-ডিঃ যেসকল মায়ের রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ এবং বাচ্চার রক্তের গ্রুপ পজিটিভ তাদের সর্বোচ্চ ৭২ ঘন্টার ভেতর এ টিকা নিতে হবে।

♦এস.এম.আর ভ্যাকসিনঃ এই টিকা রুবেলা ভাইরাস প্রতিরোধক হিসেবে দেয়া হয়।এটি হাম হওয়াকে প্রতিরোধ করে।এই টিকা প্রসবের ১৪ দিনের মধ্যেই নিতে হয়।তবে সকল মায়ের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়।

♦টিটি টিকাঃ ধনুষ্টংকার প্রতিরোধে এই টিকা নিতে হয়।কোন কোন মায়ের ক্ষেত্রে এটি গ্রহনের তারিখ দেয়া থাকে।সেই তারিখেই এই টিকার ডোজ নিতে হয়।

♥ জন্মনিয়ন্ত্রণ এর ব্যবস্থাঃ
প্রসবের পর মায়ের শরীর ঠিক হতে কমপক্ষে ২ বছর লাগে। তাই এর মধ্যে আর বাচ্চা না নেয়া উত্তম।

♥ ব্যায়ামঃ মায়ের কিছু হাল্কা ব্যায়াম করা দরকার স্বাভাবিক প্রসবের পর। এতে তার শরীরের গঠন পুর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। অতিরিক্ত ওজন বা দ্রুত যেন ওজন না বাড়ে-লক্ষ রাখতে হবে।

♥ স্ট্রেচমার্কঃ গর্ভাবস্থায় খুব দ্রুত ওজন বাড়লে,অতিরিক্ত ওজন বাড়লে,যমজ বাচ্চা হলে কিংবা শরীরে অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের পরিমাণ বেড়ে গেলে সহজেই স্ট্রেচমার্ক দেখা দেয়। মায়েদের ক্ষেত্রে  ভ্রূণ এর বৃদ্ধির সাথে সাথে এই দাগ হওয়া স্বাভাবিক কেননা ত্বকীয় কোলাজেন এ চাপ নিতে পারেনা। ফলে ফাটা দাগ দেখা দেয়।  এটি প্রতিরোধের কোন সঠিক উপায় নেই তবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

♦♦♦যেসব জায়গায় দাগ হয়েছে সেখানে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করে ম্যাসাজ করলে উপকার পেতে পারেন তবে বিজ্ঞাপন দেখে বিভ্রান্ত হয়ে কোন মলম কিনতে যাবেননা।অযথা টাকা নষ্ট করে কারন আসলে এসব ক্ষেত্রে মলম কাজ করেনা।

♦♦♦ভিটামিন এ,ই এবং সি গ্রহন করা দরকার।কারন ভিটামিন এ ত্বকীয় কোষ মেরামত করে,সি কোলাজেন তৈরি করে,ই নতুন কোষ সৃষ্টি করে।

♦♦♦প্রচুর পানি খান। এতে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হবে এবং স্ট্রেচের চাপ মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে।শরীর বিষমুক্ত থাকবে।

♦♦♦অলিভ অয়েল ব্যবহার করা উচিত কারন এটিতে সঠিক পরিমানে ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা কোষকে ভেতর থেকে নরম করে। ক্যাস্টরওয়েল ম্যাসাজ করে পাতলা কাপড় দিয়ে ত্বক ঢেকে রাখুন।এরপর ৩০ মিনিট ধরে একটি হট ওয়াটার ব্যাগ দিয়ে রাখুন এটির উপর।১ মাস করলেই ভালো ফল পাবেন।এই তেল টি যেকোনো সুপার শপে পাবেন।

♦♦♦অ্যালোভেরা বাংলায় যাকে বলে ঘৃতকুমারী এককথায় দারুন কাজের জিনিস।এর জেল ২০ মিনিট লাগিয়ে রেখে গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে পারেন। একই ভাবে মধুও লাগাতে পারেন।তুলা ব্যবহার করে মালিশ করতে পারেন।

♦প্রতিদিন গোসলের আগে আমন্ড অয়েলএর সাথে পাতিলেবুর রস ও চিনি মিশিয়ে লাগিয়ে নিতে পারেন।

♦ মানসিক ভাবে শক্ত থাকুন এ দাগ নিয়ে।অযথা দুশ্চিন্তা করবেননা।কারন ৬-১২ মাসের মধ্যেই এ দাগ মিলিয়ে যাওয়া শুরু করে।

♥সিজারিয়ান মায়ের ক্ষেত্রেঃ সার্জারির ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বমিভাব ও অস্থির লাগতে পারে।এরপর ঠিক হয়ে যাবে।ভয় পাবেন না।অ্যানেস্থেসিয়া দেয়া হলে সারা গায়ে চুলকানি হতে পারে। ঘাবড়াবেন না। হাঁচি,কাশি দেয়ার সময় পেটে বালিশের সাপোর্ট নিবেন। নইলে সেলাইয়ে  চিঁড় ধরতে পারে।

—- পাকস্থলী ধীরে কাজ করায় এ সময় গ্যাসের সমস্যা হতে পারে। কিছুদিন পর ঠিক হয়ে যায়। নিজেই হেঁটে বাথরুমে যাওয়ার চেষ্টা করুন। কিন্তু নার্সের সাহায্য নিন। এটি আপনাকে সেরে উঠতে সাহায্য করবে।  সিজারের কাটা ৪-৬” হয়।৬ সপ্তাহ লাগে এটি ঠিক হতে।শুকানোর সময় কিছুটা চুলকাতে পারে।ভয় পাবেননা।

—- কাটা স্থানে ইনফেকশন হচ্ছে কিনা খেয়াল রাখুন।নিয়মিতভাবে হালকা গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন জায়গাটি।এরপর শুকিয়ে নিন ভালভাবে।কাটা স্থানে কাপড়ের ঘষা লাগলে গজ/ব্যান্ডেজ লাগিয়ে নিন।ঢিলা,আরামদায়ক কাপড় পরুন।

—- বাসায় ফিরেই কাজে লেগে যাবেন না।কমপক্ষে ৬ সপ্তাহ বিরত থাকুন ভারী কাজ থেকে।বাচ্চাকেও একাই কোলে নিতে যাবেন না।সাহয্য নিন।

—- ক্ষতস্থান স্পর্শ করবেননা বারবার। ৬ সপ্তাহ শারীরিক মিলন থেকে দূরে থাকুন।  বাচ্চা জন্মের পর ৪-৫ দিনের মধ্যে ইমোশনাল ব্রেকডাউন হয়। এ সময় মা কে অবশ্যি পরিবারের সাপোর্ট দেয়া দরকার। এছাড়াও পরবর্তী সময়েও হরমোনাল চেঞ্জ হয় বলে  একটুতেই কান্না পেতে পারে। যুক্তিবাদিতা হারিয়ে যেতে পারে। সময় দিন নিজেকে।ঘাবড়াবেননা।এই পরিস্থিতির নাম baby’s blues. ২ মাসের মধ্যেই আপনি ঠিক হয়ে যাবেন।

♦বাইরে বেড়ান, বাচ্চাকে সাথে নিন; স্বতঃস্ফূর্ত হন। সিজারিয়ান এর কারনে নিজেকে অযোগ্য ভাবার কোন কারন নেই।

♦সমস্যা চেপে রাখবেন না।শেয়ার করুন।পরিবারকেও সাহায্য করতে হবে মাকে।মায়ের প্রশংসা করুন।উৎসাহিত করুন তাকে।মায়ের ভুলগুলো ভুলে যান।হাসিমুখে থাকুন।

♦প্রসব পরবর্তী বিষয়গুলো নিয়ে পড়ুন,জানুন।অন্যদের অভিজ্ঞতা জানুন,নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন।নেগেটিভ চিন্তা করা এবং শোনা বাদ দিন।

সুস্থ মা ই দিতে পারে শিশুর একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ। এদিকে খেয়াল রেখে পরিবারের সদস্যদের উচিৎ মায়ের সঠিক শারীরিক ও মানসিক পরিচর্যা করা।

মাতৃত্ব হোক আনন্দের।♥♥

প্রথম দুটি আর্টিকেলগুলো পড়ুন নিচের লিংক থেকে।

স্বাগতম মাতৃত্বের ভুবনে ( পর্ব  ১-নতুন মায়ের খাবার)
স্বাগতম মাতৃত্বের ভুবনে ( পর্ব  ২-নতুন মায়ের নতুন মায়ের ওজন নিয়ন্ত্রণ) 

 

লেখক : তামান্না তাহসিন আহমেদ
খাদ্য ওপুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ।

 

 

2,193 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *