সজিনা পাতার যত উপকারিতা

সজিনা বা সজনে – খুব পরিচিত একটি নাম। সজনে ডাঁটার পাশাপাশি সজিনা পাতাও আমরা কম বেশি অনেকেই খাই। কিন্তু সজিনার পাতা যে  একটি ঔষধি গুনসম্পন্ন খাবার তা আমরা কয়জন জানি বলুন?  ফিলিপাইনের খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণা ইন্সটিটিউটের এর একজন গবেষক এই সজিনা পাতা নিয়ে গবেষণা করে জানিয়েছেন যে বিশ্বের অন্যতম প্রসিদ্ধ একটি উদ্ভিদ হচ্ছে এই সজিনা পাতা। এর নানাবিধ গুণের জন্য অনেক অঞ্চলে এটি ‘Miracle tree’ বা  ‘the tree of life’ বলে পরিচিত।  সজিনা পাতার পুষ্টি উপাদান সম্পর্কে জানলেই বুঝাতে পারবেন যে চিরচেনা এই পাতা নিয়ে কেন এত মাতামতি।

কাঁচা বা শুকনো উভয় অবস্থায়ই সজিনা পাতা যেন পুষ্টির একটি সমৃদ্ধ ভান্ডার। শুকনো সজিনা পাতা পুষ্টি উপাদানসমূহের প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে কাজ করে যা কৃত্রিম সম্পূরক খাদ্য (synthetic supplements) গ্রহণের চেয়ে আমাদের দেহে অধিক তাড়াতাড়িই শোষিত হতে পারে। Optima of Africa, Ltd এর  তথ্যানুসারে, ২৫ গ্রাম সজিনা পাতা গুড়ো একজন বাচ্চার দৈনিক পুষ্টি চাহিদার নিম্নোক্ত অংশ পূরণ করেঃ

  • প্রোটিন – ৪২%
  • ক্যালসিয়াম – ১২৫%
  • ম্যাগনেসিয়াম – ১৬%
  • পটাসিয়াম – ৪১%
  • আয়রন – ৭১%
  • ভিটামিন এ – ২৭২%
  • ভিটামিন সি – ২২%,

এ থেকে খুব সহজেই বুঝা যাচ্ছে যে বাচ্চাদের দৈনিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে সজিনা পাতা কত বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম। শুধু বাচ্চাদের জন্যই নয়, সজিনা পাতা সকল বয়সী ব্যক্তিদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে। কিভাবে সজিনা পাতা এ ভূমিকা পালন করে তা জানার জন্য এর পুষ্টি উপাদান সম্পর্কে জানতে হবে।  চলুন একটু দেখে নিই এর ভিতরে কি কি পুষ্টি উপাদান থাকতে পারে-

 

পুষ্টি উপাদান কাঁচা পাতা (প্রতি ১০০ গ্রামে) শুকনো পাতা (প্রতি ২৪ গ্রামে)
ক্যালরি ৯২ ক্যালরি ৪৯ ক্যালরি
প্রোটিন ৬, ৭০ গ্রাম ৬,৫ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট ১২,৫ গ্রাম ৯,২ গ্রাম
ক্যারোটিন (ভিটামিন এ) ৬,৭৮ মি,গ্রা ৪,৫৪ মি,গ্রা
থায়ামিন (ভিটামিন বি১) ০,০৬ মি,গা ০,৬৩
রিবোফ্লেভিন (ভিটামিন বি২) ০,০৫ মি,গ্রা ৪,২৯ মি,গ্রা
নায়াসিন (ভিটামিন বি৩) ০,৮ মি,গ্রা ১।৯৭ মি,গ্রা
ভিটামিন সি ২২০ মি,গ্রা ৪,১৫ মি,গ্রা
ক্যালসিয়াম ৪৪০ মি,গ্রা ৪৮০,৭২ মি,গ্রা
কপার ০,০৭ মি,গ্রা ০,১৪ মি,গ্রা
আঁশ বা ফাইবার ০,০৯ গ্রাম ৪,৬১ গ্রাম
ম্যাগনেসিয়াম ৪২ মি,গ্রা ৮৮,৩২ মি,গ্রা
পটাসিয়াম ২৫৯ মি,গ্রা ৩২৯ মি,গ্রা
ফসফরাস ৭০ মি,গ্রা ৪৮,৯৬ মি,গ্রা
জিংক ০,১৬ মি,গ্রা ০,৭৯ মি,গ্রা

 

এগুলো ছাড়াও শুকনো সজিনা পাতায় আছে এ্যামাইনো এসিড যা দেহের গঠন ও সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদন রাখে। দেহে যদি কোন কারণে এ্যমাইনো এসিড এর ঘাটতি দেখা দেয় তবে তা বয়ে আনতে পারে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনির সমস্যাসহ আরও নানান গুরুতর রোগ। সজিনা পাতা গ্রহণ করে দেহে এ্যামাইনো এসিড এর চাহিদা পূরণ এবং এসব রোগ থেকে দেহকে সুস্থতা দান সম্ভব। শুধুমাত্র এ্যামাইনো এসিড এর ঘাটতি পূরণ নয়, সজিনা পাতার আরও অনেক উপকারিতা রয়েছে। চলুন একনজরে সেগুলো দেখে নেওয়া যাক।

উপকারিতাঃ

১।ক্লান্তি ও অবসাদ হ্রাসকরণ

মার্কিন যুক্ত্ররাষ্ট্রের Royal College of Psychiatrists অনুসারে বলা যায় যে, যেকোনো সময় ৫ জন ব্যক্তির মধ্যে একজন অস্বাভাবিকভাবে ক্লান্তি অনুভব করে; আবার দশজনের মধ্যে একজন অবসাদগ্রস্ত অনুভব করে। এই অবস্থা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সজিনা হতে পারে আদর্শ। শুকনো সজিনা পাতার গুঁড়া(১০ গ্রাম বা ২/৩ চা-চামচ)থেকে পাওয়া যায়ঃ

  • আয়রনঃ ৩২%
  • ভিটামিন এঃ ১৯%

আয়রন দেহের জন্য খুবই দরকার কারণ দেহের ক্লান্তি ও অবসাদ কমাতে ভূমিকা পালন করে। আবার ভিটামিন এ আয়রনের বিপাকে সহায়তা করে। তাই অবসাদ ও ক্লান্তিতে দারুন ভূমিকা রাখে সজিনা পাতা।

২। ত্বক

আমরা আগেই দেখেছি যে সজিনা পাতায় ভিটামিন এ এবং ভিটামিন ই রয়েছে।ভিটামিন এ আমাদের ত্বক, স্বাস্থ্যের জন্য দরকারী , ভিটামিন ই বয়সের ছাপ দূর করতে সাহায্য করে। এন্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত কোষের সুরক্ষা, পুনর্গঠনে সাহায্য করে। তাছাড়া সজিনা পুষ্টিতে পরিপূর্ণ থাকায় কোষগুলো সতেজ থাকে এবং ত্বক দেখায় প্রাণবন্ত।

৩। প্রতিরক্ষা

সজিনা পাতার সবচেয়ে ভালো উপকারীতা হলো প্রতিরক্ষাকারী ক্ষমতা। ভিটামিন এ এবং আয়রন,উভয়ই প্রতিরক্ষা পদ্ধতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।কিছু গবেষণায় দেখা যায় যে, ক্যান্সার এবং টিউমার প্রতিরোধক হিসেবেও সজিনা পাতা ভূমিকা পালন করে।

৪। পেশী বৃদ্ধি

পেশির গঠন ও বৃদ্ধিতে প্রোটিন কার্যকরী ভূমিকায় উপনীত হয়। আর সজিনা পাতা প্রোটিনের উৎসও বটে। এই পাতায় ২৫% প্রোটিন রয়েছে যা আমাদের পেশীর ভর নিয়ন্ত্রণ ও বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। নিরামিষাশীদের জন্যও উপকারী, তারা এই পাতা থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন পেতে পারে।

৫।পরিপাক

এই পাতায় প্রায় ২৫% ক্যালসিয়াম রয়েছে যা পরিপাকীয় এনজাইমের কাজ ক্রিয়াশীল করতে অবদান রাখে। এছাড়াও ২৪% ফাইবার রয়েছে যা পরিপাক পদ্ধতি ও আন্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

৬।শক্তি বৃদ্ধিঃ

সজিনা পাতায় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান প্রচুর পরিমাণে উপস্থিত থাকায় এটি দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে। এর ফলে দেহ সঠিকভাবে কাজ করার শক্তি পায় এবং ঘুম পরিপূর্ণ হয় । আর এজন্য দেহ সুস্থ থাকে।

৭। দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি

ভিটামিন এ দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। যেহেতু এই পাতায় প্রায় ১৯% ভিটামিন এ রয়েছে সেহেতু এটি দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে।

৮। এন্টি-ডায়াবেটিক

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় যে সজিনা পাতা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমায়। উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ডায়াবেটিস টাইপ ২ এর ঝুঁকি কমায়। সজিনা পাতায় ২৫% প্রোটিন রয়েছে যা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমিয়ে এন্টি-ডায়াবেটিক হিসেবে কাজ করতে পারে।

৯। হাড়ের সুরক্ষায়

এই পাতা ভিটামিন কে, প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে কাজ করে। যারা নিরামিষাশী তাদের অনেক ক্ষেত্রেই ক্যালসিয়াম এর অভাবে হাড় ক্ষয়জনিত সমস্যা দেখা যায়। এছাড়াও বৃদ্ধদের এবং যাদের দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার হজমে সমস্যা হয় তাদের ক্ষেত্রেও হাড়ে ব্যাথা, হাড় ক্ষয় বা গঠনজনিত সমস্যা দেখা যায়।  সজিনাতে হাড় গঠন ও মজবুতকরণের উপাদান প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত থাকায় এটি হাড় এর সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে।

১০। এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে

এন্টিঅক্সিডেন্টসমূহ ফ্রি রেডিকেলের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। মুক্ত রেডিকেলের উচ্চমাত্রা ক্রোনিক ডিজিজ (হার্ট ডিজিজ, ডায়াবেটিস টাইপ ২) ঘটাতে পারে। কতিপয় এন্টিঅক্সিডেন্ট সজিনা পাতায় পাওয়া যায়। এছাড়াও ভিটামিন সি এবং বিটা-ক্যারোটিনও এর অন্তর্ভুক্ত। এর এন্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান ক্যান্সার ও টিউমারকে প্রতিহত করে। এছাড়া এতে থাকা-

*কুয়ারসেটিন-নিম্ন রক্তচাপে সাহায্য করতে পারে

*ক্লোরোজেনিক এসিড-রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে

১১। প্রদাহ হ্রাসকরণ

বিভিন্ন ধরণের ফল-মূল, শাকসবজি, ওষধি গাছ ও মশলায় এন্টি-ইনফ্লামেটোরি ধর্ম রয়েছে। অর্থাৎ এটি জ্বালা পোড়ায় কার্যকরী হবে।বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে আইসোথায়োসায়ানেটস প্রধান এন্টি-ইনফ্লামেটোরি উপাদান যা সজিনা পাতা, শুঁটি এবং বীজে পাওয়া যায়।

১২। নিম্ন কোলেস্টেরল

সজিনা পাতা কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।  এছাড়াও আর্সেনিক টক্সিসিটি-এর বিরুদ্ধে কাজ করে।

১৩। রক্তস্বল্পতার বিরুদ্ধে কাজ করেঃ

ভারতে নানান সময়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে শুকনো সজিনা পাতা বা সিদ্ধ সজিনা পাতা এতে বিদ্যমান আয়রনের শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং এনিমিয়া বা রক্তস্বল্পতার বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করে। অনেক শাক-সব্জিতে আয়রন থাকলেও তা দেহে পর্যাপ্ত পরিয়ানে শোষিত হতে পারে না। অথচ সজিনা পাতার ক্ষেত্রে এরূপ না হওয়ায় এতে বিদ্যমান আয়রন দেহে শোষিত হয় এবং দেহে আয়রনের অভাব পূরণে ভূমিকা রাখে।

১৪। মায়ের দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধি করেঃ

ভারত ও আফ্রিকায় করা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসে যে, দুগ্ধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি উপাদান Galactagogue , যা সজিনা পাতায় প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত থাকে। ফলে মায়ের বুকের দুগ্ধক্ষরণ প্রভাবিত হয় সজিনা পাতা খাওয়ার ফলে। অনেক সময় দেখা যায় যে নবজাতক শিশু পর্যাপ্ত পরিমানে মায়ের বুকের দুধ পায় না। সেক্ষেত্রে মা সজিনা পাতা গ্রহণ করলে অনেকটাই উপকৃত হবেন।

১৫ এন্টি-বায়োটিক রূপে কাজ করেঃ

সজিনাতে রয়েছে বেনজল আইসোথায়ানেট জাতীয় উপাদান যা ব্যাক্টেরিয়া ও ফানজাই গোত্রের বিরুদ্ধে কাজ করে দেহকে সুরক্ষা প্রদান করে।

আশা করি এখন থেকে সকলেই সজনে পাতার কদর বুঝবেন।সবচেয়ে দুঃখজনক কী জানেন তো! বাইরের দেশগুলোতে এর খুব কদর রয়েছে, এবং তারা খুব বেশী গবেষণাও করছে কী করে তাদের দেশে এর ফলন বাড়ানো যায়।তাদের অঞ্চলে এর খুব বেশি ফলন নেই। অথচ আমাদের দেশে এই উপকারী সবজিটি তো অনেক অবহেলায় ই পড়ে থাকে।

তবে বর্তমানে আশার আলো হল এ নিয়ে আমাদের দেশেও কাজ হচ্ছে,ধীরগতি হলেও।এই লেখাটি সজিনা পাতার পরিচিতিমূলক কিছু তথ্য দিয়ে সাজানো হল।

পুষ্টিবার্তা পরবর্তীতে সজিনার আরো কিছু উপকারী ভূমিকা,খাওয়ার উপায় ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্য নিয়ে হাজির হবে সকলের সামনে ইনশাআল্লাহ। আমাদের সাথেই থাকুন।

লেখক-
আছিয়া খাতুন মিম

খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ

সম্পাদনায়

   -তামান্না তাহসিন আহমেদ

-জিনাতুল জাহরা ঐশী

খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ

 

4,970 total views, 10 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *