কোন তেলে হবে রান্না? রাইস ব্রান তেল নাকি সয়াবিন তেল?

বাসায় এসে রাইসা তুমুল শোরগোল ফেলে দিল! ঘটনা কী মা বুঝতেই পারলেননা। রাইসা আজ খাবেইনা বলে দিল মাকে।

মা-হয়েছে কী বলবিতো?

রাইসা -মা, তোমাকে আমি বলেছি কতবার বলতো? আমি এই তেলে রান্না করা খাবার খাবোনা! তুমি কেন বুঝ না আমি মোটা হয়ে যাচ্ছি দিন দিন এই তেলের জন্য। পাশের বাসার অন্তি কী সুন্দর স্লিম দেখ, মা! ওরা এই তেল খায়না!

মা- তাই বুঝি এত রাগ? বল তাহলে কোন তেল খাবি?

রাইসা-কেন মা? রাইস ব্রান তেল! ওটাই সবাই খাচ্ছে।

মা- আমাদের অবস্থা কী এত ভালো মা! ওসব তেল কেনার সামর্থ কি আছে আমাদের? একটু বুঝতে চেষ্টা কর মা!

রাইসা-মা তুমি তো জানোইনা! সামান্থাও ওই তেলের রান্না খাবার খেয়েই নাকি এত স্লিম হয়েছে। আগে দেখতেনা, কেমন ধুমসি মোটা ছিল!

হ্যাঁ, আমাদের আশে পাশেও এমন অনেক কথাই হয়ে থাকে। সবার ভেতরই ওজন কমানোর এক তুমুল প্রতিযোগিতা! এর জন্য #ডায়েট চার্ট  যোগাড়  (হ্যাশট্যাগ দিয়েই লিখলাম, অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে, তাই দেখে) থেকে শুরু করে নিজের “অবুঝ মন আর শরীরের” উপর চালানো হাতুড়ে বিদ্যা প্রয়োগ পর্যন্ত সবই করছে সকলে।

নিজের উপকার করার চিন্তায় কোন ক্ষতি করার আগে জেনে নেয়ার চেষ্টা করুন আসলেই কী ঠিক কাজটিই করছেন?

রাইস ব্রান তেলঃ

ধানের তুষ তুলে ফেললে যে চাল পাওয়া যায় তার ওপর একটি লালচে খোসা থাকে। ওই খোসাই কুঁড়া বা রাইস ব্রান। ধান থেকে চাল তৈরি করলে ৭ থেকে ৮ শতাংশ কুঁড়া পাওয়া যায়। কুঁড়ার তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, কুঁড়ায় ২০ থেকে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল পাওয়া যায়। সেটাকে পরিশোধনের পর বোতলজাত করে বিপণন করা হয়। এই তেল দেখতে সরিষার তেল এর মত, এতে অনেক vitamin রয়েছে। সয়াবিন তেল থাকে রাইস ব্রান তেল স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ায় ধানের কুঁড়া থেকে তৈরি ভোজ্য তেলের   (রাইস ব্রান অয়েল) চাহিদা দেশে ক্রমেই বাড়ছে। সয়াবিন তেলের পাশাপাশি মানুষ এখন এই তেলের দিকে ঝুঁকছেন। সেকারণেই কুঁড়ার তেল উৎপাদনকারীরা তাঁদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছেন।

রাইস ব্রান তেলের সুবিধাঃ  

১ )রাইস ব্রান অয়েল প্রাকৃতিক ভিটামিন ও খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ এবং শতভাগ কোলেস্টেরলমুক্ত।

২) এতে ভিটামিন ই, কে ও ওমেগা-৩ আছে , যা রক্তের LDL (খারাপ কোলেস্টেরল) এর মাত্রা কমিয়ে এবং HDL ভালো কোলেস্টেরল এর মাত্রা বাড়িয়ে হূদেরাগের ঝুঁকি প্রতিরোধে ভূমিকা পালন করে।

৩) উৎপাদিত  তেলের  রঙ উজ্জ্বল করার জন্য বা তেলের ন্যাচারাল ফ্লেভার রক্ষার জন্য রাসায়নিক কোনো কিছু ব্যবহার হয় না।

৪) এই তেলের রান্না খাবার অত্যন্ত সুস্বাদু এবং অল্প তেলে তুলনা মূলক বেশী রান্না করা যায়।

৫) অন্য যেকোনো তেল থেকে হালকা, (ননস্টিকি)  তেল চিটচিটে নয়।

৬) এক লিটার সয়াবিন তেলে যে খাবার রান্না করা যায় ,তা পৌনে এক লিটার কুঁড়ার তেলেই করা সম্ভব।

৭) এই তেলের মাত্র ২০ শতাংশ খাবারে শোষিত হয়। ফলে এই  তেলে তৈরি খাবার গ্রহন করলে কম পরিমান তেল দেহে প্রবেশ করবে আর তা ওজন নিয়িন্ত্রনে রাখতে ভূমিকা রাখবে।

রাইস ব্রান তেলের অসুবিধাঃ

এই তেলের তেমন কোনো অসুবিধা নেই

১)অন্যান্য তেল যেমন সয়াবিন তেলের তুলনায় এই তেলের বাজার মুল্য তুলনামুলক একটু বেশী। কিন্তু বাজারে এটি ভেজালমুক্ত ভাবে পাওয়া যায়।

তাছাড়া কুঁড়ার তেলের খাদ্য গুণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণাসংস্থার (বিসিএসআইআর)  সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান এ আই মোস্তফা বলেন, খাবার তেলে যেসব খাদ্য গুণ থাকা উচিত তার সবদিক বিবেচনায় অলিভ অয়েলের  (জলপাই থেকে তৈরি তেল) এরপর সবচেয়ে ভালো ধানের কুঁড়ার তেল। আর সয়াবিন তেলের চেয়ে এ তেল অনেক ভালো ও স্বাস্থ্যসম্মত।

অন্যদিকে,

সয়াবিন তেলঃ

সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের খোলা ও বোতলজাত সয়াবিনের ২৮ টি নমুনা পরীক্ষায় ২১টি তেই ধরা পড়ে মাত্রাতিরিক্ত ফ্যাটি এ্যাসিড।  সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক তো আছেই। তেলের রং স্বচ্ছ বা গাঢ় করার রাসায়নিক উপাদানও ধরা পড়ে পরীক্ষকের চোখে। তাছাড়া শোধনের নামে যেসব রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় সেগুলোও অনুমোদনহীন।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির কর্মকর্তা ড. মতিউর রহমান বলেন, ‘ভোজ্য তেলের অবস্থা আসলেই খারাপ। মুনাফার জন্য একটা তেল আরেকটার সঙ্গে মেশানো হচ্ছে। এতে তেলের অভ্যন্তরীণ কার্বন চেইনগুলো পরিবর্তন হয়ে যায়। যখন কার্বন বন্ডিং পরিবর্তন হয় ,তখন পুরো তেলের বৈশিষ্ট্যই পরিবর্তন হয়ে যায়। এভাবে ভোজ্য তেলের মান পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এটা আমাদের স্বাস্থ্যগত অনেক সমস্যা সৃষ্টি করে।’

সয়াবিন তেল এর সুবিধাঃ

* ভিটামিন ই অ্যান্টি –অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।

* কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে।

* হাড়, চোখ এবং ত্বকের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় কাজ করে।

সয়াবিন তেল এর অসুবিধাঃ

* ক্ষেত্রবিশেষে অ্যান্টি-নিউট্রিয়েন্টস হিসেবে কাজ করে।

* তাছাড়া বাজারে ভেজাল তেলের আধিক্য থাকায় সতর্কতা অবলম্বন জরুরী।

কী! সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন তো! এখন থেকে রাইস ব্রান তেলেই রান্নায় ব্যবহার করবেন ! এখনো যে , ”  শেষ হইয়াও হইলোনা শেষ!”

আসল কথা হল, রাইস ব্রান আর সয়াবিন তেল এর মধ্যে কে যে বেশি ভালো তা বোঝা মুশকিল! কেননা, দুটি তেলেরই অনেক পুষ্টিগুণ রয়েছে। অপকারী ভূমিকা নেই বললেই চলে। কারণ দুটি তেলেরই রয়েছে উচ্চ স্মোকিং পয়েন্ট যা তেল দুটির স্বাস্থ্যকর হওয়া নির্দেশ করে।

তাহলে অপকারী হচ্ছে কখন ? যখন এতে আমরা ভেজাল যোগ করছি। অর্থাৎ অন্য কোন তেল বা রাসায়নিক যা ক্ষতিকর তা ব্যবহার করছি। জেনে অবাকও হয়তো হবেন যে, পাম তেল-যা কিনা আমরা সবসময় খারাপ বলেই জানি, সেটার প্রকৃতরূপী তেলটিও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। মালয়েশিয়ায় পাম তেলই ব্যবহৃত হয় খাওয়ায়। যখন এতে ভেজাল দেয়া হচ্ছে তখনই এটির গুনগত মান-এ অবনমন ঘটছে।

তাই তেল যখন খাবেনই তখন ভেজালমুক্ত তেল খাওয়ার চেষ্টা করুন, অবশ্যই পরিমিত পরিমাণের সাথে। তেলটি সয়াবিন হলেই যে অস্পৃশ্য তা কিন্তু মোটেই নয়।

লেখক-

স্বর্না আখতার

খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ।

সম্পাদনায়-

তামান্না তাহসিন আহমেদ

খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ।

 

4,583 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *