আপেল সাইডার ভিনেগার কি কেবল ওজন কমায়?

আজ একটি অন্যরকম পানীয়ের সাথে পরিচিত হওয়া যাক-

অনেকেই ভিনেগার বা সিরকা নামটার সাথে পরিচিত রান্নায় বা সালাদে ব্যবহারের জন্য।সাদা ও কালো এই দুই ধরনের ভিনেগার ব্যবহার করলেও আরেক ধরনের ভিনেগার পাওয়া যায় যা আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ হয়তো জানেনও না কী কী কাজে এটি ব্যবহৃত হয়। আর এই ভিনেগারটির নাম হলো Apple Cider Vinegar।

প্রাচীন কাল থেকেই আপেল সাইডার ভিনেগার বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত কারণে  ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গৃহস্থলির বিভিন্ন কাজে এবং রান্নার কাজেও এটি সমাদৃত। হরেক রকম প্রাকৃতিক গুনের জন্য আপেল সাইডার ভিনেগার জনপ্রিয় একটি ডিটক্স পানীয়।

এটি ফল থেকে উৎপাদিত সিরকা বা ভিনেগার যা মূলত আপেলের রস থেকে তৈরি। আপেলের রসের সাথে ঈস্ট মিশিয়ে আপেলের শর্করাকে অ্যালকোহলে পরিণত করা হয়। এরপর ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে সেই অ্যালকোহলকে  এসিটিক এসিডে রূপান্তর করা হয়।  এভাবেই তৈরি হয় আপেল সাইডার ভিনেগার। আসুন জেনে নেয়া যাক এর উপাদান গুলো সম্পর্কে –

আপেল সাইডার ভিনেগার এর উপাদান  :
আপেল সাইডার ভিনেগারে এসিটিক এসিডের পরিমাণ ৫-৬%, পানি ৯৩.৮%।  অন্যান্য উপাদানের মধ্যে রয়েছে লৌহ, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন সি ইত্যাদি।  ১০০ গ্রাম আপেল সিডার ভিনেগার থেকে ২২ কিলো ক্যালরি পাওয়া যায়।

আপেল সাইডার ভিনেগার এর উপকারিতা:

স্বাস্থ্যগত :

  • ওজন কমাতে : আপেল সাইডার  ভিনেগার পাকস্থলীতে উপস্থিত পরিপাকরত খাদ্যে্র গতি  হ্রাস করে। ফলে পাকস্থলী অপেক্ষাকৃত দীর্ঘসময় ভরপুর থাকে ও ক্ষুধা কম লাগে। মূলত টাইপ ১ ডায়বেটিসের ইন্সুলিন হরমোন নিঃসরণ কম থাকায় খাবার দ্রুত পরিপাকের ফলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমান বৃদ্ধি পায় এবং ঘন ঘন ক্ষুধা লাগে।পাকস্থলীতে খাদ্য উপস্থিত থাকায় রক্তে গ্লুকোজ কম প্রবেশ করবে এবং ক্ষুধা কম লাগবে। এছাড়াও, এসিটিক এসিড চর্বি গলাতে সাহায্য করে। একটি জরিপে দেখা গিয়েছে, একাধারে ১২ সপ্তাহ অ্যাসিটিক অ্যাসিড ওজন কমানোর পাশাপাশি  তলপেটের ফ্যাট উল্লেখযোগ্য হারে কমায়।
  • ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে : এটি ইন্সুলিন সংবেদনশীলতার উন্নতি ঘটায়। গবেষণায় দেখা গেছে, আপেল সাইডার  ভিনেগারে বিদ্যমান এসিটিক এসিড রক্ত হতে লিভার ও মাংসপেশিতে ব্লাড শুগার  গ্রহণ করার প্রক্রিয়ার উন্নতি ঘটায়।এছাড়াও এটি  ইন্সুলিন ও গ্লুকাগন এর  অনুপাতের সামাঞ্জস্য বজায় রাখে যা ওজন কমাতেও সাহায্য করে।
  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে : জেনে অবাক হবেন, প্রতিদিন ৩ চা চামচ আপেল সাইডার  ভিনেগার ১ সপ্তাহের মধ্যে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।
  • ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে : বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে আপেল সাইডার  ভিনেগারে এন্টি-অক্সিডেন্ট উপস্থিত থাকায় শরীরে এন্টি কারসিনোজেনিক এজেন্ট হিসেবে কাজ করে থাকে।  যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে।এর উপরে এখনও গবেষণা চলছে।
  • লিভার সুস্থ রাখতে : এটি ডিটক্স উপাদান সমৃদ্ধ হওয়ায়  রক্ত পরিশুদ্ধকরণের ফলে লিভারে বিশুদ্ধ রক্ত প্রবেশ করে ও লিভার সুস্থ থাকে।
  • এলার্জি প্রতিরোধে : আপেল সাইডার ভিনেগার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, মিউকাস ভাংতে সাহায্য করে এবং রক্তনালীগুলো পরিস্কার রাখে। ত্বকের ইনফেকশন ও এলার্জি প্রতিরোধে আপেল সাইডার  ভিনেগার ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে ত্বকে যদি কোনো রিঅ্যাকশন দেখা দেয় তবে তার ব্যবহার সাথে সাথে বন্ধ করতে হবে।
  • হার্ট সুস্থ রাখতে : শরীরের অতিরিক্ত ফ্যাট বার্ন, হার্টের জন্য সবচেয়ে উপকারী এবং এটি আপেল সিডার ভিনেগারের অন্যতম  কাজ। এতে করে রক্তপ্রবাহও  নিয়মিত  হয় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়াও রক্তে অতিরিক্ত ফ্যাট ও গ্লুকোজ  উভয়ই হৃদরোগের  কারণ যা আপেল সাইডার  ভিনেগার নিয়মিত গ্রহণ করলে নিয়ন্ত্রণে থাকে।
  • হজমে সাহায্য করে : কারো এসিডিটি হলে দ্রুত আপেল সাইডার ভিনেগার পানিতে মিশিয়ে পান করলে উপকার পাওয়া যায়। তবে আলসার রোগীদের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। এছাড়াও গবেষণায় আপেল সাইডার  ভিনেগার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে বলে  যায়।
  • রক্ত বিশুদ্ধ করণে : জনপ্রিয় একটি ডিটক্স পানীয় হিসেবে গ্রহন করা হয় আপেল সাইডার  ভিনেগার   যা  রক্ত থেকে বিষাক্ত পদার্থ,  অতিরিক্ত গ্লুকোজ  নিঃসরণ করে রক্ত বিশুদ্ধ রাখে।
  • মেটাবলিজম বাড়াতে : আপেল সিডার ভিনেগার AMPK এনজাইম ক্ষরণ বাড়ায় যা কিনা কোষের গ্লুকোজ  ও ফ্যাটি এসিড গ্রহণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং তা জারিত করে শক্তি উৎপাদন করে। এতে আমাদের কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
  • ডায়রিয়া নিরাময়ে : আপেল সাইডার  ভিনেগারে রয়েছে পেক্টিন যা কিনা অন্ত্রের সংকোচ প্রসারন নিয়ন্ত্রণ করে ও উপকারী ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে সাহায্য করে। এতে হজম প্রক্রিয়া সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়। আবার, এটি প্রাকৃতিক এন্টিবায়োটিক হিসেবেও কাজ করে। ডায়রিয়ার জন্য দায়ী  E. coli এবং salmonella ব্যাকটেরিয়া  কে  ধ্বংস করে  আপেল সাইডার ভিনেগার।
  • রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে : হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, যেসব মানুষ আপেল সাইডার  ভিনেগার মিশ্রিত সালাদ গ্রহন করছে তাদের রক্তের কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের হার তুলনামূলকভাবে কম। তবে এর সঠিক কারণ নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
  • রক্তের pH নিয়ন্ত্রণে : রক্তের pH সমতা না থাকলে যে কেউ যে কোন সময় রোগাক্রান্ত হতে পারে।  এসিটিক এসিড এই সমতা রক্ষা করে।
  • সর্দি কাশি নিরাময়ে :  আপেল সাইডার  ভিনেগার গ্রহণের ফলে এর অম্লত্ব গলার মিউকাস দূরীভূত করে।  এটি সর্দির মেয়াদও কমিয়ে দেয়। এছাড়াও আপেল  সাইডার  ভিনেগারের ভিটামিন সি, দেহে  রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ধ্বংস করে ; পটাসিয়াম,  ভিটামিন ই যা এন্টিএক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
  • চুলের যত্নে : গোসল শেষে আপেল সিডার ভিনেগার পানির সাথে মিশিয়ে দিয়ে চুল ধুলে তা ভালো কন্ডিশনার হিসেবে কাজ করে। চুলের খুশকি দূর করে ও নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে।
  • ত্বকের যত্নে : মুখের অবাঞ্চিত দাগ ও ব্রণ দূরীকরণের হাতিয়ার। রোদের পোড়া দাগ থেকে মুক্তি পেতে, ত্বক উজ্জল করতে এবং ছেলেরা এটি আফটার শেভ হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। এর অম্লত্বের কারণে ত্বকের ক্ষতিকর ব্যক্টেরিয়াও নির্মূল  হয়।
  • কণ্ঠের যত্নে : গলা পরিস্কার করতে, মিউকাস অপসারণে, কাশি দূর করতে আপেল সাইডার  ভিনেগারের তুলনা হয় না।
  • শারীরিক দুর্বলতা কমাতে : আপেল সাইডার  ভিনেগার আমাদের দেহের মেটাবলিক হার বাড়িয়ে দেয়, তাই মেটাবলিজম  এ শক্তি উৎপাদন হয় বেশি এবং  দুর্বলতা কমে।
  • পায়ের ব্যাথা উপশমে : যেহেতু  আপেল সিডার ভিনেগারে পটাশিয়াম উপস্থিত তাই পটাশিয়ামের অভাবজনিত রোগ লেগ ক্রাম্পস নিরাময়ে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • দাঁত পরিস্কার করতে : দাঁতের হলদে ভাব দূর করে।

দৈনন্দিন কাজে :

  • খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণে : আপেল সাইডার ভিনেগার একটি প্রাকৃতিক প্রিজারভেটিভ। এর নিজস্ব জীবাণু ধ্বংসকারী গুণের কারণে যেকোনো খাবারে জীবাণু জন্মাতে পারেনা। ফলে খাবার বহুদিন সংরক্ষণ করা যায়।
  • বিভিন্নরকম খাবার রান্না করতে : চাটনি, সস, সালাদ তৈরিতে ; খাবার ম্যারিনেট করতে ; এবং মোটা আঁশযুক্ত মাংস যেমন; গরুর, খাসির, টার্কির মাংশ, দ্রুত সিদ্ধ করতে আপেল সাইডার  ভিনেগার খুব ভালো কাজ করে।
  • জিনিশপত্র পরিস্কার করণে : জীবাণুধ্বংসী গুণ এর কারণে এটি উচ্চমানের পরিস্কারক হিসেবে বেশ জনপ্রিয়।
  • প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে : এর অম্লত্বের করণে পোকা মাকড় জন্মাতে পারে না এবং পূর্বস্থিত পোকা মাকড় ধ্বংস হয়ে যায়।
  • ফলমূল বিষমুক্ত করতে : ফলে আবস্থিত ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভস যেমন; ফরমালিন, কার্বাইড ইত্যাদি ভিনেগার দ্বারা বিনষ্ট করা সম্ভব।
  • থালা বাসনে চকচকে ভাব আনতে : অনেকের বাসার পুরাতন বা নতুন থালা বাসনের ধাতব অংশে খনিজ পদার্থ জমে জং তৈরি করে।  আপেল সাইডার  ভিনেগার খুব সহজেই এই খনিজ পদার্থগুলো অপসারণ করে থালাবাসনে চকচকে ভাব এনে দেয়।

আপেল সিডার ভিনেগার কেনার পূর্বে বিবেচ্য বিষয়
১. এসিডিটি : এসিডিটি লেভেল থাকবে ৫%।
২. রং : আপেল সিডার ভিনেগারের রঙ হলুদ থেকে কমলার মধ্যে থাকে। তবে বর্ণহীন আপেল সাইডার  ভিনেগারও ইদানিং বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
৩. প্রকারভেদ :  বাজারে বিভিন্ন ধরণের আপেল সাইডার  ভিনেগার পাওয়া যায় যেমন- অপাস্তুরিত, কোল্ড কমপ্রেসড, অপরিশুদ্ধ, ফ্লেভারড ইত্যাদি।
অপাস্তুরিত আপেল সাইডার  ভিনেগারে অণুজীব থাকার সম্ভাবনা থাকে।
কোল্ড কমপ্রেসড ভিনেগার অন্যান্য ভিনেগারের চেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত।

অপকারিতা:
আপেল সাইডার  ভিনেগারের অপকারি দিক তেমন নেই। তবে অতিরিক্ত গ্রহণে স্বাস্থ্য ঝুঁকির বেশ সম্ভাবনা রয়েছে।

  • প্রতিদিন উচ্চমাত্রায় আপেল সাইডার  ভিনেগার গ্রহনের ফলে হজমে ব্যাঘাত ঘটায়।
  • এর অম্লত্ব দাঁতের এনামেলের ক্ষতি করে। এমনকি অকালে দাঁত পড়েও যেতে পারে।
  • যদিও এটিতে পটাসিয়াম র‍য়েছে তবু হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, ড. রবার্ট দাবি করেন, অতিরিক্ত আপেল সাইডার  ভিনেগার গ্রহণে দেহে পটাসিয়াম এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
  • ডায়বেটিস রোগীদের জন্য এটি একটি মহৌষধ। কিন্তু অতিরিক্ত গ্রহণে ব্লাড সুগার  বেশি পরিমাণে কমে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা ইনসুলিন শক্‌ হলে রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে যেতে পারে।
  • যথেষ্ট পরিমাণ পানি ছাড়া আপেল সাইডার  ভিনেগারের যেকোনো ব্যবহারই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

গ্রহনে সতর্কতা:
আপেল সিডার ভিনেগার সতর্কতার সাথে গ্রহণ করা উচিৎ। অল্প অল্প করে ধীরে ধীরে গ্রহণের পরিমাণ বাড়াতে হবে। প্রথমে দিনে সর্বোচ্চ ২ টেবিল চামচ থেকে শুরু করা উচিৎ। এরপর ধীরে ধীরে শারীরের গ্রহন ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে পরিমাণ বাড়াতে হবে। গ্রহণের পর কোনো প্রকার সমস্যা দেখা দিলে সাথে সাথে গ্রহণ বন্ধ করে ফেলা উচিত। নিয়মিত পান করলে স্ট্র ব্যবহার করুন কারণ এর অম্লত্ব দাঁতের এনামেলের ক্ষতি করতে পারে। এছাড়াও পানিতে মিশিয়ে পান করতে হবে এবং পান করা পর ৩০ মিনিটের আগে দাঁত ব্রাশ করা অনুচিত।

কিছু কথা তাও থেকে যায়।কারণ ইসলাম ধর্ম মতে, নবীজীর ১২টি পছন্দের খাবারের মধ্যে এটি একটি, যদিও এটি গ্রহনে মতভেদ থাকতে পারে।তবে কেউ যদি দ্রুত কোন উপকার পেতে চান(যেমন ওজন কমানো বা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন বা এমন কিছু)তবে পথ্য হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তাই কেউ যদি নিয়মিত ব্যবহার করতে চান তাহলে অবশ্যই কোনো ডায়েটিশিয়ান এর পরামর্শ মতে এবং এটি গ্রহনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় কোন বিধি বিধান থাকলে সেইভাবে মেনে ব্যবহার করবেন।

লেখক-
রাইসা বিনতে হাসনাত (আফ্রিদা)
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ।

সম্পাদনায়
তামান্না তাহসিন আহমেদ
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ।

 

6,031 total views, 8 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *