সন্তানের মুখে ভাত

প্রত্যেক মায়েরই নবজাতক সন্তানকে নিয়ে একরাশ চিন্তা থাকে । তবে নতুন মায়েদের মধ্যে এই একরাশ চিন্তাসহ আরো একটি চিন্তা বেশি থাকে- কবে প্রথম দেব সন্তানের মুখে ভাত, কী হবে তার প্রথম শক্ত খাবার, দুধের বাইরে  অন্যান্য কী খাওয়াব, কীভাবে খাওয়াব। আশপাশের নানা মানুষের নানা মত শুনে মা হয়ে যান বিভ্রান্ত। তাই চলুন আজকে জেনে নেওয়া যাক আপনার সন্তানের মুখে যখন প্রথম শক্ত খাবার দিবেন সেই সময়ে কি করনীয় তা  সম্পর্কে।

শিশুর ৬ মাস পূর্ণ হওয়ার পর মায়ের দুধের পাশাপাশি তাকে অন্যান্য খাবার দেওয়া শুরু করতে হয়। একে বলা হয় পরিপূরক খাবার। শিশুর সঠিক দৈহিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পরিপূরক খাদ্য দেওয়া খুবই প্রয়োজন।

পরিপূরক খাবারের সূচনাঃ

৬-৮ মাস-

  • এ সময়ে শিশু যেহেতু মায়ের তরল দুধ খেয়ে অভ্যস্ত থাকে তাই তার প্রথম পরিপূরক খাবারও তরলই হওয়া চাই। শুরু করতে পারেন তরল সবজি বা ডালের স্যুপ দিয়ে। ফলের রস কিংবা ডাবের পানিও দেওয়া যায়।
  • আস্তে আস্তে শিশুকে আরেকটু ঘন খাবার যেমন- পায়েস, ফিরনি, দুধে রান্না চালের গুড়া, নরম ভাত ও ডালের পানি, দুধে চটকানো কলা দিতে পারেন।সবজি সিদ্ধ করে চটকিয়ে এবং মাছ হাত দিয়ে পিষে ভাতের সাথে মিশিয়ে খাওয়াতে পারেন। বিভিন্ন দেশীয় মৌসুমী ফল এবং এদের রস খাওয়াতে পারেন।
  • শিশুর খাদ্য সামান্য তেলযুক্ত করতে হবে। কারন এতে করে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলো সহজে শোষিত হতে পারবে।
  • উপরের এই খাবার গুলো দিনে ২ বার দিতে পারেন। আরো ২ বার হালকা নাশতা দিতে পারেন। প্রথমে ২ টেবিল চামচ পরিমাণ খাওয়াবেন। আস্তে আস্তে পরিমাণ বাড়িয়ে ২৫০ মিলি এর বাটির আধা বাটি পর্যন্ত খাওয়াতে পারেন।৯-১১ মাস-
    • একদম ঝুরি করে কেটে বা হাত দিয়ে পিষে স্বাভাবিক খাবার খাওয়াতে পারেন। এসময় বাচ্চা নিজের হাতে তুলে মুখে দিতে পারে এরকম খাবারও দিতে হবে।
    • এসময় বাচ্চা মুরগীর স্যুপ দিতে পারেন, মাছ, নরম সিদ্ধ ডিম, রঙিন শাক-সবজি, ক্ষীর, পুডিং, দুধ সুজি, নরম খিচুড়ি দিতে পারেন।

    ১০-১১ মাস-

    • এই বয়সে মুরগীর কলিজা খাওয়ানো শুরু করতে পারেন।
    • দিনে ৩ বার করে খাওয়াবেন। ১-২ বার হালকা নাশতা দিতে পারেন। ২৫০ মিলি এর বাটির অর্ধেক বাটি পর্যন্ত খেতে দেবেন।

১২-১৩ মাস

  • পরিবারের বাকি সদস্যরা যা খায় তাই শিশুকেও খাওয়াতে পারবেন। প্রয়োজনে হালকা নরম করে বা ছোট ছোট টুকরো করে দিবেন খাবারটি। বাচ্চা যেন চাবাতে পারে এমন খাবার দেবেন।
  • বাচ্চাকে নরম মাংসের কিমা খাওয়াতে পারেন, ডাল বা দুধে ভেজানো নরম রুটি, চটকানো আলু সিদ্ধ ও মাখন, হালকা ঘি দিতে পারেন।
  • দিনে ৩ বার খাওয়াবেন। ১-২ বার হালকা নাশতা দিতে পারেন।
  • ২৫০ মিলি এর বাটির সম্পূর্ণ অংশ খাওয়াতে পারেন।

 

পরিপূরক খাবার প্রদানের কিছু শর্তঃ

১। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খাবার দিতে হবে।

২। বেশি তেল-মশলাযুক্ত খাবার দেওয়া যাবে না। প্রথমে অতি সামান্য তেল দিয়ে মশলা ছাড়া রান্না করে খাওয়াতে হবে। ৮ মাস বয়স থেকে খাবারে সামান্য হলুদ, আদা, রসুন, লবন দেওয়া যাবে।

৩। বাচ্চার বয়স ৮ মাস হলে খাওয়ানোর সময় হালকা লেবুর রস খাওয়াবেন। কমলার রস খাওয়াবেন। অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়াবেন না। এতে বাচ্চার এসিডিটির সমস্যা হতে পারে।

৪। বাচ্চাকে শুইয়ে খাওয়াবেন না। বসিয়ে খাওয়াতে হবে।

৫। বাচ্চাকে কখনো জোর করে খাওয়াবেন না।

৬। বাচ্চাকে পরিবারের সবার সাথে বসিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। বাচ্চা খাবারে হাত দিতে চাইলে না করবেন না। তার হাত পরিষ্কার করে তাকে হাত দিয়ে খেতে উৎসাহিত করবেন। এতে বাচ্চার খাবারের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে।

৭। বাচ্চাকে কোন কৃত্রিম রঙ ও সুগন্ধিযুক্ত খাবার দেবেন না।

৮। বাচ্চার খাবারে মিষ্টি ও লবণ কম দেবেন। ১২ মাস বয়সের পর থেকে বাচ্চার সহনশীলতা অনুযায়ী অল্প অল্প করে ঝাল খাওয়ানোর  অভ্যাস করুন।

৯। একই খাবার প্রতিদিন দেবেন না। কোন খাবার পুনরাবৃতি করতে চাইলে ৩ দিন পরপর করুন।

১০। বাচ্চা কোন খাবার খেতে না চাইলে তাকে জোর না করে ১৫ দিন পর আবার খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন।

১১। পরিপূরক খাবার দেওয়ার সময় বুকের দুধ বন্ধ করে দেবেন না।

১২। একেকদিন একেক রকম ফল খাওয়ানোর চেষ্টা করুন।

১৩। এক বেলার খাবার অন্য বেলার জন্য ফেলে রাখবেন না। যদি খাবার বেঁচে যায় তা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করুন এবং পরবর্তীতে খাওয়াতে হয়  তবে খাবারটি পর্যাপ্ত পরিমানে গরম করে নিতে হবে। তবে বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় অবশ্যই বাচ্চার গ্রহণযোগ্য তাপমাত্রায় নিয়ে এসে তবেই খাওয়াবেন।

 

বাচ্চার জন্য পরিপূরক খাবার তৈরির সময় খেয়াল রাখবেন বাচ্চার খাবার যেন সকল খাদ্য উপাদানে স্বয়ংসম্পূর্ন হয় এবং তাতে থাকে মৌসুমী ফল ও সবজি। কেননা আপনার প্রদানকৃত খাদ্যের উপর নির্ভর করছে আপনার বাচ্চার সুস্বাস্থ্য।

 

 

লেখকঃ

সৃজনী মন্ডল

 

সম্পাদকঃ

জিনাতুল জাহরা ঐশী

জেরিন তাসনিম

2,375 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *