ওজন নিয়ন্ত্রণে ইন্টারমিটেন ফাস্টিং ডায়েট

মানুষ হাজার হাজার বছর ধরেই উপবাস বা রোজা অনুশীলন করে আসছে । বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম এবং সংস্কৃতি জুড়ে এটি একটি অন্যতম প্রধান পালনীয় রীতি। বর্তমান বিজ্ঞানের যুগ এই প্রাচীন অনুশীলনকে নতুন মোড় দিয়েছে যেখানে এক্সপার্টদের মতে, ওজন হ্রাস এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করার এটি একটি সহজ, সুবিধাজনক উপায়।
ইন্টারমিটেন ফাস্টিং  কি?

বর্তমানে ইন্টারমিটেন উপবাস Intermittent Fasting) প্রচুর জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এবং দ্রুত ফিট হতে চেয়েছেন এমন অনেকের ক্ষেত্রেই কাজ করেছে। আইএফ নিয়মটি ব্যক্তির খাবারের চেয়ে খাওয়ার সময়কে নিয়ন্ত্রন করতে বলে। এখানে আক্ষরিকভাবে আপনাকে রোজা থাকতে হয়, পার্থক্য শুধু এই যে আপনি পানি খেতে পারবেন। আইএফ একটি নির্ধারিত অনুপাত অনুসরণ করে, অর্থাৎ ১৬:৮ বা ১৪:১০ বা এমনকি ১২:১২, যাতে আপনি নির্বাচিত সময়ের জন্য উপোস রাখেন এবং তারপরে অবশিষ্ট কয়েক ঘন্টা আপনি স্বাস্থ্যকর খাবার খান। এইভাবে, যখন শরীর বিশ্রাম নেয়, তখন এটি বিশ্রামের সময়গুলিতে শরীরের বাড়তি ক্যালোরিগুলি জ্বালিয়ে ফেলার সময় পায়। অবশ্যই, এই ডায়েট প্ল্যান আপনাকে অস্বাস্থ্যকর খাবারগুলি খেতে নিষেধ করে কিন্তু এটি আপনাকে আপনার নিয়মিত খাবার থেকে বিরত থাকতে বলবে না। কাজেই আপনি ডায়েটে থাকার পরও আপনার ডায়েটিং এর কস্ট হবে না, হলেও অনেক কম।

এই চক্রটি আপনার পছন্দ মতো বারবার পুনরাবৃত্তি করা যেতে পারে। আপনার ব্যক্তিগত পছন্দের উপর নির্ভর করে প্রতি সপ্তাহে প্রথমে এক দুই দিন দিয়ে শুরু করে পরবর্তীতে প্রতিদিন করা যেতে পারে।

আইএফ ডায়েটে কি খাবেন? 

আপনার ডায়েটের সর্বাধিক কার্যকারীতা পেতে আপনার খাওয়ার সময়ে সঠিক পরিমানে পুষ্টিকর খাবার এবং পানীয় রাখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

দিনের প্রতি ভাগের খাবারকে বিভিন্ন ধরণের স্বাস্থ্যকর  খাবারের সাথে ভারসাম্য দেওয়ার চেষ্টা করুন, যেমন:

প্রোটিন: মাংস, হাঁস-মুরগি, মাছ, ডিম, ফলমূল, বাদাম, বীজ ইত্যাদি
ফলঃ আপেল, কলা, বেরি, কমলা, পীচ, নাশপাতি ইত্যাদি
সবজিঃ ব্রোকলি, ফুলকপি, শসা, শাকের শাক, টমেটো ইত্যাদি
শস্যঃ, ভাত, ওটস, বার্লি, বেকউইট, লাল আটার রুটি (আঁশযুক্ত) ইত্যাদি
তেলঃ জলপাই তেল, নারিকেল তেল, ভেজিটেবল তেল।

পানি, চিনি ছাড়া চা এবং কফির মতো ক্যালোরি বিহীন পানীয় পান ডায়েট করার পরেও আপনাকে হাইড্রেটেড রাখার সাথে আপনার ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, জাঙ্ক ফুড ইন্টারমিটেন ফাস্টিং এর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ইন্টারমিটেন ফাস্টিং ডায়েট এর উপকারিতাঃ

এটি জনপ্রিয় ডায়েট কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদে অনুসরণ করা সহজ, নমনীয় এবং টেকসই। এটি প্রতি সপ্তাহে আপনার রান্না এবং প্রস্তুত করতে সময় ব্যয় এবং অর্থের পরিমাণ হ্রাস করতে পারে।

বর্ধিত ওজন হ্রাস: উপবাস ক্যালরি বিপাককে বাড়িয়ে তুলতে পারে, ফলে জমে থাকা ফ্যাট বার্ন হয় এবং  ওজন হ্রাস করে।

রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ : উপবাস ইনসুলিনের মাত্রা ৩১% এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ ৩-৬% কমায়।  দেখা গেছে, এটি আপনার ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি অনেকখানি হ্রাস করে।

আয়ু বৃদ্ধি: যদিও এর প্রমান সীমিত, কিছু  গবেষণায় দেখা গেছে যে ইন্টারমিটেন ফাস্টিং দীর্ঘায়ু করতে সাহায্য করে।

ইন্টারমিটেন ফাস্টিং ডায়েট এর সমস্যাঃ 

এই উপবাস এর অনেক স্বাস্থ্য উপকার থাকলেও এটির কিছু সমস্যাও আছে। প্রতিদিন আপনার খাওয়া মাত্র আট ঘন্টা সময়ের মধ্যে  সীমাবদ্ধ রাখার কারণে কিছু লোক উপবাস শুরুর আগে সাধারন সময়ের চেয়ে বেশি খেয়ে ফেলেন। এর ফলে অনেক সময় ওজন বাড়তে পারে, হজমে সমস্যা হয় এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাসের বিকাশ ঘটে। ইন্টারমিটেন ফাস্টিং  শুরু করার প্রথম দিকে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে যেমন ক্ষুধা, দুর্বলতা এবং অবসন্নতা – যদিও আপনি একবারে রুটিনে উঠলে প্রায়শই এটি হ্রাস পায়।

কিছু গবেষণা পরামর্শ দেয় যে বিরতিহীন রোজা পুরুষ ও মহিলাদেরকে আলাদাভাবে প্রভাবিত করতে পারে, গবেষণায় জানা গেছে যে এটি নারীদের উর্বরতা এবং প্রজননে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তবে ইন্টারমিটেন ফাস্টিং এর প্রজনন স্বাস্থ্যের উপর যে প্রভাব থাকতে পারে তা মূল্যায়নের জন্য আরও বেশি গবেষণা প্রয়োজন। যেকোন ক্ষেত্রেই, ধীরে ধীরে শুরু করাই ভালো এবং আপনি যদি কোনো নেতিবাচক দিক অনুভব করেন তবে এটা আপনার জন্য নয় এবং এরপরও আপনি যদি আগ্রহী হন তবে একজন নিউট্রিশনিস্ট এর সাথে কনসাল্ট করুন।

এই ডায়েট আপনার জন্যে কতটা উপযুক্ত?      

ইন্টারমিটেন ফাস্টিং স্বাস্থ্য উন্নত করার টেকসই, নিরাপদ এবং সহজ উপায় হতে পারে, যদি পুষ্টিকর ডায়েট এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা একসাথে জুটিবদ্ধ হয়। বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এটি নিরাপদ তবে এটি ফলো করার আগে আপনার নিউট্রিশনিস্ট সাথে কথা বলা উচিত, বিশেষত যদি আপনার কোনও অসুস্থতা থাকে।

আপনি যদি কোনও ওষুধ খান বা ডায়াবেটিস, নিম্ন রক্তচাপে ভোগেন তবে এই ডায়েট আপনার না করাই ভালো। যেসব মহিলারা গর্ভধারণের চেষ্টা করছেন বা যারা গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন তাদের ইন্টারমিটেন ফাস্টিং করতে নিষেধ করা হয়। এই সময় যদি আপনার কোনও উদ্বেগ বা কোনও বিরূপ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হয়, তবে আপনার নিউট্রিশনিস্ট সাথে পরামর্শ করার বিষয়ে নিশ্চিত হবেন।

ইন্টারমিটেন ফাস্টিং এ গ্রহনযোগ্য খাবারঃ
ইন্টারমিটেন ফাস্টিং এর একটি ভ্রান্ত ধারণাটি হ’ল ফাস্ট ফুড, চিনিযুক্ত এবং উচ্চতর প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলি সহ ফাস্টিং করার সময় যে কোন খাবার খাওয়া যেতে পারে। যদি আপনার লক্ষ্য ওজন হ্রাস করা, প্রজনন ক্ষমতা উন্নত করা এবং সহজভাবে স্বাস্থ্যকর হওয়া হয় তবে স্বাস্থ্যকর খাবারের সাথে লেগে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।এর অর্থ আস্ত খাবার(whole food) গুলো খাওয়া এবং চিনি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্ট ফুড ইত্যাদির মতো সাধারণ সন্দেহযুক্ত খাবার এড়ানো।আপনি যে ধরণের ডায়েট পছন্দ করেন তা আপনার উপর নির্ভর করে কত দ্রুত এটি আপনার জীবণযাত্রার সাথে ব্যালেন্স করতে এবং মানিয়ে নিতে পারেন।ইন্টারমিটেন ফাস্টিং এর সময় চুইংগাম চিবানো অনেক কার্যকর। অনেকের কাছে, কিটো ডায়েট ইন্টারমিটেন ডায়েট এর একটি দুর্দান্ত পরিপূরক হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে কারণ এ কিটো ডায়েট আপনাকে আরও মেদ পোড়াতে সহায়তা করতে পারে।

ইন্টারমিটেন ফাস্টিং এর পানীয়ঃ
ইন্টারমিটেন ফাস্টিং উপকারগুলো হলো চর্বি হ্রাস, বিপাক হার বৃদ্ধি, রক্তে শর্করার মাত্রা কমিয়ে আনা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ইত্যাদি। আপনার বেশি ক্যালোরিযুক্ত খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে আপনি ক্যালরিবিহীন বা কম ক্যালরিযুক্ত পানীয় গ্রহণ করতে পারেন। এর কারণ হ’ল নন-ক্যালোরিক পানীয়গুলি ইনসুলিনের ক্ষরনে কোন প্রভাব ফেলে না। ফলস্বরূপ চর্বি বার্নিং বা অটোফ্যাগি (সেলুলার ক্লিনআপ) এর কার্যকারিতায় বাঁধা দেবে না।

ফাস্টিংকালে গ্রহণযোগ্য পানীয়গুলোঃ
— পানি
— খনিজ পানি
— সরল কালো কফি
— লাল চা

ইন্টারমিটেন ফাস্টিং এর কিছু গাইডলাইনঃ

১. খাবার খাওয়ার জন্য একটি সময় বেছে নিন যা আপনার পক্ষে মানা সহজ।
২. আপনার ফাস্টিং এর সময় উল্লিখিত তরলগুলি পান করুন।
৩. যদি আপনার মনে হয় যথেষ্ট শক্তি আছে তবেই ব্যয়াম করুন।
৪. উপবাসের সময় ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করুন।
৫. কষ্টকর হলেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন।

তবে, ইন্টারমিটেন ফাস্টিং ডায়েট যতটা শারীরিক পরিবর্তনে কার্যকরী তার চেয়েও এটি আমাদের খাবারের সময়কে নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে আমাদের খাবার চাহিদাকে নিয়ন্ত্রন করে। এতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে বারবার খাওয়ার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

লেখক-
ফাতেমা তুজমিলা মৌলী
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ।

6,107 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *