সিজোনাল জ্বরে আর নয় এন্টিবায়োটিক

প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেছে মাহফুজের আম্মার জ্বর সেরে উঠছে না। তিনি কিছুই খেতে পারেন না, প্রচণ্ড মাথা ব্যথা, মাথা ভারী অনুভব হয়, মাথা ঘোরা, বমি হয়। যেদিন থেকে জ্বর জ্বর অনুভব করেছিলেন তার পরের দিনই গ্রামের এক হাতুড়ে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিকসহ নাপা গ্রহণ করা শুরু করছিলেন।  ওষুধ গ্রহণের পরে কিছু সময়ের জন্য জ্বর সেরে যায়, এরপর আবার জ্বর আসে।   এরকম এক সপ্তাহ কেটে যাচ্ছে ……

এন্টিবায়োটিক গ্রহন করার পরেও কোনো প্রকার উন্নতির আভাস পাওয়া গেলো না। বরং মাফুজের আম্মার শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে যেতে থাকল। এই অবস্থায় শেষে তাঁরা ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেন। ডাক্তার সব দেখে বললেন, সিজনাল জ্বর এমনিতেই সেরে যেত, এন্টিবায়োটিক খাওয়ায় উনি দুর্বল হয়ে গিয়েই এই অবস্থা হয়েছে।

প্রায় প্রতি বছরই আমাদের কোনো না কোনো সময় জ্বর হয়। এখন কম বেশি সবাই জ্বর হবার ২দিনের মাথায় এন্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করেন যা আমাদের শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলছে। আসুন জেনে নেই সিজোনাল জ্বর  কেন হয় এবং হওয়ার পর কি কি পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত।

সিজোনাল জ্বর  কী?
সিজোনাল জ্বর  হলো এক ধরনের ভাইরাল ইনফেকশনের ফলাফল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঋতু পরিবর্তনের সময় বেশি দেখা যায়।  সাধারণত দেহের গড় স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৬° ফারেনহাইট(৩৭° সেলসিয়াস)। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নরমাল দৈহিক তাপমাত্রার একটা রেন্জ ধরা হয় ৯৭° ফারেনহাইট (৩৬.১°সেলসিয়াস) থেকে ৯৯°ফারেনহাইট (৩৭.২°সেলসিয়াস) পর্যন্ত। যখন আপনার দেহের তাপমাত্রা ১০০.৪° ফারেনহাইটের  (৩৮°সেলসিয়াস) বেশি তখনই জ্বর জ্বর ভাব চলে আসে। জ্বর হওয়ার অর্থ হল আপনার শরীরে যেকোনো ধরনের অসুস্থতা কিংবা সংক্রমণ হয়েছে।

লক্ষণ:
নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো জ্বর হওয়ার একেবারে স্বাভাবিক লক্ষণ।

  • শির শিরে ভাব (প্রচন্ড ঠাণ্ডা )
  • ঘাম ঝরা
  • ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা
  • মাথা ব্যথা
  • গা -হাত -পা এমনকি মাংসপেশী ব্যথা
  • শরীর দুর্বল হয়ে যায়
  • খাবারে অরুচি
  • হঠাৎ করে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়াঃ যখন কোনো ভাইরাস আমাদের শরীরে প্রবেশ করে দেহের ভিতরে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে, তখন আমাদের শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে।

কিভাবে আক্রান্ত হতে পারেন?

ভাইরাস অতি ক্ষুদ্র, আমাদের শরীরে প্রবেশ করে বিভিন্নভাবে সংক্রমিত করতে পারে। নিচে তার মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো :

  • Inhalation : যদি কেউ (ভাইরাল ইনফেকশনে আক্রান্ত) আপনার কাছাকাছি হাই তোলে অথবা কাশি দেয়, তাহলে ভাইরাস নিঃশ্বাসের মাধ্যমে আপনার শরীরে অতি সহজেই প্রবেশ করতে পারবে। এর জন্য উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ঠান্ডা, সর্দিকাশি।
  • Ingestion : যেকোনো প্রকারের খাবারই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। আপনি যদি সেগুলো গ্রহণ করেন তাহলে আপনিও সংক্রমিত হবেন। এটার উদাহরণ হিসেবে বলা যায় নরোভাইরাস ও এন্টেরোভাইরাস।
  • Bites: বিভিন্ন ধরনের প্রাণী, কীটপতঙ্গ ভাইরাস বহন করে বেরায়। তারা যদি আপনাকে কামড় দেয়, তাহলেও আপনি আক্রান্ত হতে পারেন।  যেমন : ডেঙ্গুজ্বর, জ্বলাতঙ্ক।
  • Body Fluid: এছাড়াও বডি ফ্লুইডের এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ভাইরাস আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। যেমন : হেপাটাইটিস -বি, এইচআইভি।

জ্বর হলে দেহের যেসব বিপাকীয় পরিবর্তন ( শরীরের অভ্যন্তরে) দেখা যায় সেসব হলো :  

১। প্রতি ডিগ্রী জ্বরে ৭% বিপাকের হার বাড়ে। তাই শক্তি চাহিদা বাড়ে।
২। অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার দরুণ পানির চাহিদা বাড়ে।
৩। হজম ক্রিয়াও ব্যাহত হয়।
৪। প্রোটিনের চাহিদা প্রায় ২ গুন বেড়ে যায়।

করণীয়সাধারণত সিজোনাল ফেবারের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। জ্বর হলে যা যা করণীয় নিম্নে উল্লেখ করা হলো।  চলুন দেখে নেওয়া যাক আমাদের করণীয় কাজগু‌লো‌

  • নিয়মিত হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করতে হবে।
  • বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কুসুম গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে গা স্পঞ্জ করে দিতে হবে। বারবার পানি দিয়ে গা মুছিয়ে দিলে বাচ্চার সর্দি লাগতে পারে তাই মাঝে মাঝে লোশন হাতে নিয়ে সেটা দিয়ে ম্যাসেজ করে জ্বর তুলতে হবে।
  • প্রচুরপরিমাণ পানি পান করতে হবে। অথবা পানীয় স্যুপ, হালকা চা, ডাবের পানি, হরলিক্স ইত্যাদি খাওয়া ভালো।
  • প্রোটিনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে নরম সিদ্ধ ডিম, মাছ বা মুরগির ঝোল, পুডিং, পায়েস, দুধ, রুটি প্রভৃতি খেতে হবে।
  • যথাসম্ভব বিশ্রামে থাকতে হবে
  • শক্তি চাহিদা বাড়ে তাই ভাত, রুটি, পায়েস, সুজি, পুডিং দেওয়া যেতে পারে।
  • সহজপাচ্য, নরম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হবে।
  • কিছু সময় পর পর ভেজা কাপড় দিয়ে সমস্ত শরীর মুছতে হবে।
  • অল্প অল্প করে ৫-৬ বার খাবার গ্রহণ করতে হবে।

ডাক্তারের কাছেযাবনাকিযাব না’ !
আমরা অনেকেই একটু গা গরম হলেই ডাক্তারের কাছে চলে যাই। আসলে জ্বর হওয়ার পর কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
যখন নিম্নোক্ত বিষয়গুলো দেখা দিচ্ছে তখন আপনি একজন ডাক্তারের কাছে যাবেন —

  • প্রচন্ড মাথাব্যথা
  • শ্বাসক্রিয়ায় অসুবিধা
  • বুক ব্যথা
  • পেট ব্যথা
  • অনবরত বমি
  • ফুসকুড়ি (অনেক বেশি দেখা দিবে)
  • খিঁচুনি
  • জ্বর যখন ১০৪° ফারেনহাইট এর বেশি
  • অস্বাভাবিক আচরণ
  • ২৪ ঘন্টার বেশি একটানা জ্বর থাকলে।

জ্বরের কারণের  উপর নির্ভর করেই একজন ডাক্তার আপনাকে এন্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করতে পারেন। রক্ত পরীক্ষা করার কথাও বলে থাকেন।  একটি কথা সবসময় মাথায় রাখা উচিত জ্বর কোন রোগ নয়, রোগের উপসর্গ মাত্র। তাই জ্বর হলে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে ডাক্তার জেনে নেন কেন জ্বর দেখা দিয়েছে। আর হ্যাঁ, ভাইরাল ইনফেকশনের জন্য এন্টিবায়োটিক নয়, বরং এর জন্য এন্টি ভাইরাল ড্রাগস্ ব্যবহার করা যেতে পারে। এই বিষয়ে আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে।

লেখক
আছিয়া খাতুন মিম
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ 

সম্পাদনায় – নানজীবা ইবনাত
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ

 

3,788 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *