গর্ভাবস্থায় ভুলে যাচ্ছেন না তো এই খাবারগুলো?

দেহের জন্য যে সকল পুষ্টি উপাদান অতি প্রয়োজনীয় তার মাঝে ভিটামিন অন্যতম। ভিটামিন B-9 (ভিটামিন বি কমপ্লেক্স অন্তর্ভূক্ত)  ; শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সে সকল গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের মধ্যে একটি। ভিটামিন B-9 এর অপর নাম ফোলাসিন,  ফোলেট বা  ফলিক এসিড। তবে ফলিক এসিড রূপেই আমরা একে অধিকতর চিনি।

সাধারণত ফলিক এসিড পানিতে দ্রবণীয় হয়ে থাকে মানে খুব সহজেই পানি তে মিশে যেতে পারে। আমাদের দেহে ফলিক এসিডের প্রয়োজনীয়তা এবং উপকারিতা দুটোই খুব বেশি। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফলিক এসিড সকল প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের জন্যই গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। FAO অর্থাৎ আন্তর্জাতিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থা মতে সকল বয়সের নিম্নলিখিত ফলিক এসিডের চাহিদা রয়েছে। সেই সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক –

ফলিক এসিডের দৈনন্দিন চাহিদার পরিমাণঃ

বয়স পরিমাণ
০-৬ মাস ৪০ মাইক্রোগ্রাম

 

৭-১২ বছর ৬০মাইক্রোগ্রাম
১-১২ বছর ১০০ মাইক্রোগ্রাম
১৮ বছর ও তার সমবয়সী ২০০ মাইক্রোগ্রাম
গর্ভবতী মা ৬০০ মাইক্রোগ্রাম
দুগ্ধদানকারী মা ৫০০ মাইক্রোগ্রাম

 

এবার আসি ফলিক এসিড গ্রহণের উপকারিতা প্রসঙ্গে-

১.ফলিক এসিডের অন্যতম প্রধান কাজ আমাদের দেহে লোহিত রক্তকণিকা বা হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়ানো। তাই যথেষ্ট পরিমাণে ফলিক এসিড যুক্ত খাবার খেলে রক্ত স্বল্পতার ভয় থাকে না।

২.শরীরে নতুন কোষ সৃষ্টি এবং পরিচালনায় সাহায্য করে ফলিক এসিড

৩.ফলিক এসিড হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমায়।

৪. ডি এন এ( DNA)  এবং  আর এন এ (RNA) তৈরি এবং সংস্কারে সাহায্য করে ফলিক এসিড।

৫. এছাড়া মস্তিষ্কের উন্নয়নে ফলিক এসিডের ভূমিকা অসাধারণ।

৬.এমনকি ক্যান্সার প্রতিরোধেও ফলিক এসিড ভূমিকা রাখে।

৭. সাধারণত আলজেইমার নামক ভয়াবহ রোগ  ( Alzheimer’s disease) প্রতিরোধে এই ভিটামিনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

তবে কিশোরী এবং  গর্ভবতী মায়েদের জন্য ফলিক এসিড বিশেষ ভাবে প্রয়োজন। গর্ভবতী মায়েদের জন্য ফলিক এসিডের প্রয়োজনীয়তার কারণ গুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক আসুন-

১. গর্ভকালীন সময়ে বাচ্চার স্নায়ুবিক নলকে ( neural tube)  মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ড  ( spinal cord)  তে পরিণত করতে সাহায্য করে ফলিক এসিড।

২.Premature birth অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের পূর্বে জন্ম নেয়ার প্রবণতা রোধ করে ফলিক এসিড।

৩. তাছাড়া ফলিক এসিড গর্ভকালীন জটিলতা কমাতে অনেকাংশে সাহায্য করে।

৪.সাধারণত মায়ের গর্ভে ভ্রূণ শিশুর বৃদ্ধিতেও কাজ করে এই ভিটামিন।

৫. গর্ভকালীন সময়ে ভ্রূণ শিশুর মস্তিষ্ক পরিপক্ব হতে ফলিক এসিড ভূমিকা রাখে।

৬.শিশু যাতে কম ওজন বা Low weight নিয়ে না জন্মায় তার জন্য সঠিক পরিমাণে ফলিক এসিড গ্রহণ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

৭. Miscarriage বা অকাল গর্ভপাত রোধে এই ভিটামিন কাজ করে থাকে।

সর্বোপরি,  একজন গর্ভবতী মা এবং যিনি গর্ভবতী হতে যাচ্ছেন পরবর্তী সময়ে তাদের সকলের জন্যই ফলিক এসিড বা ফোলেট যুক্ত খাবার গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। কারণ গর্ভকালীন সময়ে বাচ্চার মস্তিষ্ক উন্নয়নের পাশাপাশি, বাচ্চার বৃদ্ধিহার এবং আরো নানা ধরণের গর্ভকালীন জটিলতা থেকে শরীর কে মুক্ত রাখতে সাহায্য করে ফলিক এসিড।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ফলিক এসিড যুক্ত অনেক খাবার রয়েছে যা হাতের কাছেই কম খরচে পাওয়া সম্ভব।  আসুন জেনে নেয়া যাক সেই খাবার গুলো সম্পর্কে –

খাবারের নাম ফলিক এসিডের পরিমাণ/ ১০০গ্রাম
ভূট্টার আটা ১৪.২ মাইক্রোগ্রাম
পালং শাক ৫১.০ মাইক্রোগ্রাম

 

মসুর ডাল ১৪.৫ মাইক্রোগ্রাম
সয়াবীন ৮.৭ মাইক্রোগ্রাম
বাঁধাকপি ১৩.৩ মাইক্রোগ্রাম
কারি পাতা ২৩.৫ মাইক্রোগ্রাম
পুদিনা পাতা ৯.৭ মাইক্রোগ্রাম
গাজর ৫.০ মাইক্রোগ্রাম
পেয়াজ ১.৫ মাইক্রোগ্রাম
আলু ৩.০ মাইক্রোগ্রাম
ঢেঁড়স ২৫.৩ মাইক্রোগ্রাম
বেগুন ৫.০ মাইক্রোগ্রাম
কুমড়া ৩.০ মাইক্রোগ্রাম
নারকেল ১১.৭ মাইক্রোগ্রাম
শশা ১২.৬ মাইক্রোগ্রাম
ডিম ৭০.৩ মাইক্রোগ্রাম
ছোট চিংড়ী ১৫.৭ মাইক্রোগ্রাম
মৃগেল মাছ ৯.৭ মাইক্রোগ্রাম
দই ৩.৩ মাইক্রোগ্রাম
দুধ ৫.৬ মাইক্রোগ্রাম

তবে কেউ যদি ফলিক এসিড চাহিদা অনু্যায়ী গ্রহণ না করেন তবে দেখা দিতে পারে কিছু রোগ ও জটিলতা। যেমন-

১. যেহেতু ফলিক এসিড রক্তকণিকা তৈরি তে সাহায্য করে তাই সঠিক পরিমাণে ফলিক এসিড গ্রহণ না করা হলে এনিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে।  এই ধরণের এনিমিয়া কে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় মেগালোব্লাস্ট এনিমিয়া।

২. ফলিক এসিডের অভাবে একজন নারীর জরায়ু উর্বরতা হ্রাস পেতে পারে যার ফলে গর্ভধারণ জটিলতা দেখা দেয়।

৩. নির্ধারিত সময়ের পূর্বে শিশুর জন্ম এবং কম ওজনের শিশু জন্মদান হতে পারে ফলিক এসিড অভাবজনিত জটিলতা

৪.এই ভিটামিনের অভাবে ভ্রূণ শিশুর নাড়ি বা নাভিরজ্জু নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই মায়ের জরায়ু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

৫. ক্যান্সার ও হৃদরোগ জনিত জটিলতাও হতে পারে ফলিক এসিড অভাবের লক্ষণ।

সর্বোপরি, দেহকে সুস্থ স্বাভাবিক রাখতে এবং মস্তিষ্কের ক্রমবিকাশের জন্য ফলিক এসিড অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে হ্যা কেউ যদি প্রয়োজনের চেয়েও বেশি ফলিক এসিড গ্রহণ করে ফেলেন তবে ভয়ের কিছু নেই কারণ এটি পানিতে দ্রবণীয় অবস্থায় থাকার দরূণ অতিরিক্ত অংশটুকু মূত্রের সাহায্যে দেহ থেকে বের হয়ে যেতে পারে। তাই নির্ভয়ে ফলিক এসিড যুক্ত খাবার গ্রহণ করুন। এবং আপনি যদি এমন একজন নারী হয়ে থাকেন যিনি খুব শীঘ্রই পরিবারে নতুন অতিথিকে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন তবে এই খাবার গুলো আপনার জন্য যথাবিহিত জরুরী।

লেখাঃআয়েশা সিদ্দিকা মারিয়া
খাদ্য ওপুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ
সম্পাদনাঃঐশী অরিন
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ

2,668 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *