রোজেলা-শুধু কি ওজনই কমায়?

বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলের আবহাওয়া সমতল অঞ্চলের চেয়ে আলাদা হওয়ায় পাহাড়ে বিশেষ ধরনের ফল ও সবজি উৎপাদন হয় যার সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানিনা। পাহাড়ি এই ফল ও সবজি এর গুনাগুন কিন্তু কম নয়। রান্নার পদ্ধতি ও আলাদা হয়ে থাকে। যা পরবর্তিতে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাস করা হবে ‘পুষ্টিবার্তা’-য়। আজকে আমরা যে ফল নিয়ে আলোচনা করবো তার নাম রোজেলা, প্রচলিত ভাবে বাজারে একে চুকাই, মেষ্টা ও বলা হয়ে থাকে। এটি হালকা গোলাপী বর্ণের ফল, দেখতে অনেকটা ফুলের কলির মতো। মূলত বাংলাদেশে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এলাকায় বেশি হয়। বিশেষ কিছু ভেষজ গুনাবলী থাকায় এর ব্যবহার বেশি হয়।

রোজেলা ফলের গুনাগুনঃ

– ঠান্ডা কমায়, ওজন কমাতে সাহায্য করে,
– হজমে সাহায্য করে।
– টক স্বাদযুক্ত হওয়ায় এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’। এর টক স্বাদের জন্য একে ডাল, তরকারি বা মাছের রান্নায় ব্যবহার করা যায়।
– এর গোলাপী বর্ণটি মূলত অ্যান্থোসায়ানিন জন্য হয়ে থাকে যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন করে, রক্তে চিনির পরিমান নিয়ন্ত্রন করে তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রন করে।
– ডি-টক্সিফিকেশন বা শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশনের বৈশিষ্ট থাকায় যকৃতের জন্য উপকারী।
– মাসিকের সময় একজন মেয়ে বা নারীর হরমনের পরিবর্তনের কারনে হতাশা, হঠাৎ করে মন-মেজাজের রূপ পরিবর্তন এবং খাবার খাওয়ার অভ্যাস নিয়ন্ত্রনহীন হয়ে পড়ে তাই রোজেলা চা এই সময়টাই সবচেয়ে বেশি উপকারী। কিন্তু গর্ভাবস্থায় এই পানীয় পান করা যাবে না।
– অম্ল, বুকে জ্বালা-পোড়া, অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে এই চা পান করা যাবে না।

এখন আমরা জেনে নিই কিভাবে এই ফল দিয়ে চা বানাবেন।

রোজেলা চা উপকরনঃ
• রোজেলা – ২ চামচ
• আদা কুচি- ১/২ চা চামচ
• পানি ২ কাপ
• মধু / গুড় ১ চা চামচ বা গুড় ১/২ চা চামচ

প্রণালীঃ
১। প্রথমে রোজেলা ফলগুলোকে ভালোভাবে ধুয়ে সুতির কাপড়ে বা তোয়ালেতে শুকিয়ে অন্য আরেকটা কাপড়ের উপর রোজেলা বীজ ফেলে শুধু পাপড়ি নিয়ে তা ভালোভাবে শুকাতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষন করার জন্য পাতলা নেটের ব্যাগে পাপড়িগুলো ২-৩দিন রোদে রেখে শুকাতে হবে।
একবার ভালোভাবে শুকিয়ে গেলে শুকনো পাপড়িগুলো ‘রোজেলা চা’ বানানোর জন্য একদম তৈরী। পুরোপুরি শুকানোর পর রোজেলার পাপড়িগুলো কাচের জার –এ সংরক্ষন করলে সঠিক স্বাদ বজায় থাকবে।
২। একটি পাত্রে পানিতে আদা, রোজেলার পাপড়ি ২ চামচ দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে ১০মিনিট ধরে সিদ্ধ করতে হবে।
৩। এরপর পানির রং হাল্কা গোলাপী থেকে গাঢ় গোলাপী হয়ে উঠলে নামিয়ে নিতে হবে।
৪। স্বাদ অনুযায়ী মধু/ চিনি/ গুড় যোগ করে গরম গরম পরিবেশন করতে পারেন।

রোজেলা মাসালা চা উপকরন: 
• পানি ২ কাপ
• শুকনো রোজেলা ১ চা চামচ
• দারুচিনি ২টা
• এলাচ ২টা
• লবঙ্গ ৩-৪টা

প্রনালীঃ
একটি পাত্রে পানিসহ অন্য মসলাগুলো একে যোগ করে এর সাথে শুকনো রোজেলা যোগ করে ভালোভাবে ঢেকে ১০মিনিট ফুটিয়ে হালকা গোলাপী রং আসলে গরম গরম পরিবাশন করুন।

রোজেলা –র আচারঃ
উপকরনঃ
• তেল ১ ১/২ চা চামচ
• পাঁচ ফোড়ন ১/৩ চা চামচ
• রোজেলা ২ কাপ
• (তাজা রোজেলা ভালোভাবে ধুয়ে তোয়ালেতে শুকিয়ে বীজ ফেলে শুধু খোসা নিয়ে নেওয়া হয়েছে)
• গুড় ২ কাপ ( রোজেলা যত কাপ গুড় তত কাপ)
• পানি ১/২ কাপ
• মরিচ গুড়া ১ চা চামচ
• আচারের মসলা ১ চা চামচ ( জিরা, ধনে, জায়ফল, জয়ত্রী, মরিচ গুড়া(শুকনা), গোলমরিচের গুড়া)
প্রণালীঃ
১। প্রথমে একটি পাত্রে তেল গরম করে তাতে পাঁচ ফোড়নের মসলা দিতে হবে, মসলা দেওয়ার পর আস্তে আস্তে নাড়তে হবে । মসলার চারদিকে বুদবুদ উঠা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
২।এরপর রোজেলা দিয়ে ৫মিনিট ভালোভাবে নাড়তে হবে, এর সাথে লবণ দিয়ে ভালোভাবে মেশাতে হবে।
৩।আস্তে আস্তে রোজেলা পাপড়ি গলে যাবে এবং মাঝে মাঝে নেড়ে দিতে হবে ।৪।পাপড়িগুলো গলে গেলে এর মধ্যে গুড় মেশাতে হবে। গুড়ের পরিমাণ রোজেলার পাপড়ির পরিমাণের সমান হবে অর্থ্যাৎ ১:১।
৫।গুড় গলে ভালোভাবে মিশে গেলে এর সাথে ১/২ কাপ পানি মেশাতে হবে, যেন রোজেলা ভালোভাবে সিদ্ধ হয়ে গেলে এটি গলে যাবে।
৬।কিছুক্ষন জ্বাল দেওয়ার পর মরিচ গুঁড়া মেশাতে হবে। এরপর এর সাথে ১ চা চামচ আচার মসলা মেশাতে হবে।
৭। এরপর একে ৮-১০ মিনিট ভালোভাবে নাড়তে হবে, যতক্ষন পর্যন্ত না পুরোপুরি গলে যাবে।
৮।এরপর একে ভালোভাবে ঠান্ডা করে কাচের জার (ভালোভাবে শুকনা এবং বাতাসে প্রবেশ করবেনা এমন জার) সংরক্ষন করতে হবে। যেন এর সঠিক স্বাদ বজায় থাকে।
৯।এভাবে এই আচারটি ৪-৫ মাস পর্যন্ত ভালোভাবে সংরক্ষন করা যায়।

আশা করছি অনেকেই রেসিপিটি থেকে উপকৃত হবেন।

লেখক-
পুষ্টিবিদ শাহরুখ নাজ রহমান

2,111 total views, 4 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *