আমার বাচ্চা কেন খায় না?

ছোটো বাচ্চাদের মায়েদের সবচেয়ে সাধারণ অভিযোগ গুলোর মধ্যে একটি হল আমার বাচ্চা খেতে চায় না। বাচ্চা দিব্যি হাটা-চলা করছে, হাসছে, খেলা-ধুলা করছে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু খেতে বসালেই তার কান্নাকাটি, জেদ, চিৎকার করা, ছুটে পালান, বমির করে দেয়া ইত্যাদি নানা নখরামি শুরু হয়ে যায়। মায়েদের তখন মাথাব্যাথার মুল কারণ হয়ে দাঁড়ায় যে অন্য বাচ্চারা তো ঠিক মতই খায়, আমারটা কেন খায় না?

এরকম হাজারটা চিন্তা মাথায় নিয়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ মা বাচ্চাদের খাওয়ানোর মিশন নিয়ে রীতিমত তাদের সাথে যুদ্ধ শুরু করে। তাদের মুখ চেপে ধরে, হাত বেঁধে রেখে, মার দিয়ে খাওয়ারটা গেলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতি ঘরে বাচ্চাদের খাওয়ানোর নিত্য দিনের চিত্রটা ঠিক এমন। এর পিছনের কারণটা কি শুধুই বাচ্চাদের জেদ বা খাওয়ার প্রতি তাদের অনাগ্রহ নাকি এর পিছনে অন্য কিছু আছে?

এই বিষয়টা “Erik Erikson’s 8 stages of Psychosocial Development” থিওরির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। বাচ্চার বয়স যখন ১৮মাস থেকে ৩বছর থাকে তখন সে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে শুরু করে, তার নিজস্ব একটা ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠতে শুরু করে। এরিকসনের থিওরি অনুযায়ী এই বয়সে শিশু  Autonomy vs Shame & Doubt নামের Psyco Social Crisis এর মধ্যে দিয়ে যায়।

বাচ্চারা যখন এই বয়সটা তে পা দেয় তখন তার মধ্যে নতুন কিছু আচরণের আত্নপ্রকাশ ঘটে। বাচ্চারা নিজে নিজে খেতে চায়, নতুন নতুন জিনিস খুঁজে বের করতে আগ্রহ দেখায়, নিজে নিজে কাজ করতে চায়, গ্লাস হাতে নিয়ে নিজে নিজে পানি খেতে চায়। এ সময়ে বাচ্চারা ছোট ছোট সিধান্ত গ্রহন করতে পছন্দ করে, তাদের পছন্দ-অপছন্দ এই চয়েসের ব্যাপারে, তাদের একটা সিধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা তৈরি হয়। আপনার বাচ্চার মাঝে যদি এই আচরণগুলো দেখা যায় তার মানে ওর মধ্যে autonomy তৈরি হচ্ছে অর্থাৎ শিশু প্রমান করতে চাচ্ছে এই পৃথিবীতে তার নিজস্ব একটা পরিচয় আছে।
এরিকসনের থিওরি অনুযায়ী এই সময়টা তে যদি তাকে এই কাজ গুলো করতে বাঁধা দেয়া হয় তবে তার মধ্যে যে অনুভূতির জন্ম নেয় তাকে বলে Shame & Doubt. সে নিজের উপর বিশ্বাস হারাতে শুরু করে, কোন কাজ করতে লজ্জা পেতে থাকে।তার মধ্যে একটা ধারনার সৃষ্টি হয় যে “আমি কি এটা পারব?” বিষয়টা সে মুখে বলতে পারে না। কিন্তু তার মনে এর একটা প্রগাঢ় ছাপ পরে।

এমন সময়ে আমরা বাচ্চাদের সাথে জোরাজুরি না করে যদি তাদের স্বাভাবিক কাজ গুলোতে তাদের সহযোগিতা করি, তাদের উৎসাহ দেই তাহলে তার autonomy অর্থাৎ এই বয়সে তার যে মানসিক চাহিদা তা সঠিক ভাবে গড়ে ওঠে। নিজের হাতে খেতে দিলে ঘর নোংরা করবে এই ভয়ে না থেকে বাচ্চারা যে খাবার গুলো পছন্দ করে, নিজে নিজে খেতে পারবে সে খাবারগুলো তাদের নিজের হাতে খেতে দিয়ে তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে হবে। যেমনঃ

  • রঙিন ফল, সেদ্ধ সবজি ছোট করে কেটে তাদের সামনে দিতে পারি
  • বাটিতে মুড়ি বা খই বা রুটি ছোট ছোট করে ছিঁড়ে তাদের নিজের হাতে খেতে দিতে পারি
  • ছোট গ্লাসে বা কাপে করে তাদের ফলের জুস বা শরবত খেতে দিতে পারি
  • ছোট বাটিতে স্যুপ দিয়ে, চামুচ দিয়ে তাকে খেতে দিতে পারি
  • নতুন কিছু করলে হাতে তালি দিয়ে বা অন্য উপায়ে তার প্রশংসা করে উৎসাহ দিয়ে
  • সবার সাথে খাবার টেবিলে খেতে বসিয়ে

এভাবেই বিভিন্ন উপায়ে তার থেকে একটু দূরে সরে, তাকে একটু ছাড় দিয়ে, একটু নিজের মত ব্যাপার গুলো পরিচালনা করতে দিয়ে ছোটবেলা থেকেই বাচ্চার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারি যা ভবিষ্যতে তার কর্মদক্ষতা বাড়াবে এবং বাচ্চার স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে আমরা সহায়তা করতে পারি।    

আমার বাচ্চা কিছুই খেতে চায় না কারণ যেটা তার কাছে স্বাভাবিক ছিল সেই অধিকারটা আমি তার থেকে কেঁড়ে নিয়েছি এবং আমি যেভাবে চাই সেভাবে তাকে খাইয়েছি। তার ক্ষুধা না লাগলেও তাকে চেপে ধরে, আমার পছন্দের খাবারটা, আমার মন মত পরিমানে তার মুখ ঠেসে ধরে তাকে খাইয়েছি। এখানে দোষটা কার- আমার? নাকি আমার ছোট বাচ্চাটার? এর উত্তর এবারে আপনারাই ঠিক করুন।

 

লেখক-
পুষ্টিবিদ জেরিন তাসনিম

2,341 total views, 4 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *