রসে টইটম্বুর তরমুজের কত গুন তা জানেন কি?

প্রচন্ড গরমে ধূলোবালি আর জ্যাম ঠেলে আপনি যখন কোথাও দাঁড়িয়ে একটু স্বস্তি পেতে চাইছেন, ঠিক তখনই হয়তো আপনার চোখ পড়বে রাস্তার পাশের অস্থায়ী দোকানে কেটে রাখা টুকটুকে লাল তরমুজের ফালির উপর।

ঠিক তখনই আপনার  মনে হতে পারে যা গরম পরেছে,একটু তরমুজ খেয়েই যাই।

আসলে তরমুজ ফলটিই এরকম যা দেখে প্রচন্ড গরমে লোভ সামলানো মুশকিল। হ্যাঁ,আমরা তরমুজ খাই বটে কিন্তু কখনো কি এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে ভেবে দেখেছি কি?

চলুন তাহলে তরমুজ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জেনে নিই।

“‌তরমুজ” অতি পরিচিত  মিষ্টি,রসালো স্বাদের অত্যন্ত উপকারী  একটি ফলের নাম। এটি মূলত গ্রীষ্মকালীন ফল। যার বৈজ্ঞানিক নাম হলো “Citrullus lanatus”।

*তরমুজে রয়েছে প্রায় ৯২% জলীয় উপাদান। যা শরীরে প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা পূরণ করে থাকে।

*প্রতি ১০০ গ্রামে কার্বোহাইড্রেট এর পরিমাণ ৭.৬ গ্রাম এবং চিনির পরিমান ৬.২ গ্রাম। তরমুজের প্রধান শর্করা ফ্রুক্টোজ হলেও গ্লুকোজ ও সুক্রোজও রয়েছে।

*এতে ক্যালরি এবং ফ্যাট এর মাত্রা অতি অল্প ।

যেমনঃ প্রতি কাপ ডাইস করে কাটা (১৫২ গ্রাম) তরমুজে রয়েছে ৪৬ ক্যালরি।

*তরমুজ রসালো ফল হলেও প্রতি ১০০ গ্রামে ০.৪% ফাইবার রয়েছে।

*এছাড়া এই তরমুজ ভিটামিন-সি এর একটি উত্তম  উৎস। এর পাশাপাশি ভিটামিন B1, B5,B6,ভিটামিন A, Potassium,Magnesium এর ও ভালো উৎস।

অধিকন্তু তরমুজে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিনয়েড যার মধ্যে বিটা ক্যারোটিন এবং Lycopen অন্তর্ভুক্ত।  এতে “Citrulline” নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ Amino Acid ও রয়েছে।

এতক্ষণ  তো জানলাম তরমুজের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে। এসব ছাড়াও তরমুজের রয়েছে অনেক উপকারিতা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু উপকারিতা হলো-

১.এক্সপেরিমেন্টাল এন্ড ক্লিনিক্যাল—শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক জার্নাল এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী -তরমুজে রয়েছে ৯২% পানি। যা গরমের সময় ঘামের জন্য দেহ থেকে যে পানি শূন্যতার সৃষ্টি হয় তা দূর করতে ভূমিকা রাখে।

২. তরমুজে অতি অল্প পরিমাণে ক্যালরি থাকে বিধায় এটি দেহে কোন প্রকার চর্বির  সৃষ্টি করে না। এছাড়া এতে রয়েছে –

*Vitamin C     : 21% of RDI

(Referrence Daily Intake -শরীরের চাহিদা অনুযায়ী  দৈনিক যে পরিমান পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন)

*Vitamin A     : 18% of RDI

*Potassium   :5% of RDI

*Magnesium : 4% of RDI

*Vitamin B1, B5, C ইত্যাদি।

এই ভিটামিন সি  একধরনের অ্যান্ট- এক্সিডেন্ট  যা ফ্রি  র‍্যডিক্যালস থেকে কোষ এর ক্ষয়-ক্ষতি প্রতিরোধ  করে।

৩.তরমুজে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম। যা শরীরে জমে থাকা Toxin পরিষ্কার করে কিডনীকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি রক্তে ইউরিক এসিড এর পরিমাণ কমায়। পাশাপাশি এতে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকায় মূত্রনালি কে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

৪.”The American Journal of Hypertension”—এ প্রকাশিত এক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে তরমুজে প্রচুর পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম থাকায় এটি উচ্চ রক্তচাপ কমাতে কার্যকরী।

৫. তরমুজ দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়। প্রতিদিনের  খাদ্যতালিকায় তরমুজ রাখা উচিত। কেননা তরমুজে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন-এ যা চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং চোখকে বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করে। কারণ ভিটামিন-এ কে চোখের পুষ্টি বিশেষজ্ঞ বলা হয়।

৬.সাধারণ মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব দেখা যায়।এ সময়ে ক্যালসিয়ামের চাহিদা বাড়ে। তাই এ বাড়তি চাহিদা পূরণের জন্য তরমুজের উপকারিতা অনেক। কেননা এতে বিদ্যমান ক্যালসিয়াম বয়স্ককালে হাড়ের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৭.হৃদরোগ সমস্যা বর্তমান বিশ্বে একটি মারাত্মক ব্যাধি। এক্ষেত্রে তরমুজের ভূমিকা অনেক দূরদর্শী। কারণ এতে রয়েছে Lycopen যা কোলেস্টেরল এবং ব্লাড প্রেশার লেভেল কে সীমিত রাখে। এছাড়া এতে “Citrulline” নামক যে এ্যামিনো এসিড রয়েছে তা দেহের রক্তবাহিকা গুলোকে প্রসারিত করতে সাহায্য করে।

৮.সাধারণত ক্রীড়া প্রতিযোগিদের ক্ষেত্রে জুসের সাথে Citrulline মিশিয়ে অথবা তরমুজের জুস খেলার পূর্বে খাওয়ানো হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, উভয়ই মাংসপেশির ব্যাথা এবং হার্ট রেট কে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

৯.এছাড়া তরমুজে বিদ্যমান ভিটামিন-সি দেহে কোলাজেন নামক প্রোটিন সৃষ্টি করে যা ত্বককে কোমল এবং চুল মজবুত করতে সহায়তা করে এবং ভিটামিন এ ত্বককে  রোদে পোড়া হাত থেকে রক্ষা করে।

১০.এছাড়া তরমুজ এ বিদ্যমান এই Lycopen প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। পাশাপাশি নিয়মিত তরমুজ এর গ্রহণ এ্যাজমা প্রতিরোধে সহায়ক।

তরমুজের পরেই আমাদের মনে পড়ে তার বাদামী রঙা বীজের কথা। তরমুজের বীজ খাওয়ার সময় আমরা অনেকেই ফেলে দেই। কিন্তু ছোট এই বীজটিও যে খাওয়ার উপযোগী এই সম্পর্কে  কোন ধারণা আছে কি? তাহলে জেনে নেওয়া যাক এর গুণাগুণ সম্পর্কে –

*তরমুজের বীজে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় ভিটামিন, ওমেগা ৩ ও ওমেগা ৬ ফ্যাটি এসিড, পটাশিয়াম, কপার,সেলেনিয়াম এবং জিংক যা হার্ট এর উন্নতি ঘটানোর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে এবং হার্ট  অ্যাটাক এর সম্ভাবনা কমায়।

*এছাড়া এতে রয়েছে জিংক যা বন্ধ্যাত্ব দূর করতে সহায়তা করে।

*ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করে।

*মস্তিষ্কের সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

*হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটায়।

 

তবে আমাদের অনেকেরই ধারণা হলো ফল যেহেতু অনেক উপকারী এর কোন অপকারিতা থাকতে পারে কিভাবে? বাস্তব হলেও সত্যি, অতিরিক্ত কোন কিছুই যেমন ভালো নয় তরমুজের অতিরিক্ত গ্রহণেও কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো—

১.সাধারণত তরমুজে রয়েছে Lycopen  যা  দেহের Heart Disease এবং ক্যান্সার এর ঝুঁকি কমায়। কিন্তু এই Lycopen এর অতিরিক্ত গ্রহণ বমি ভাব, ডায়রিয়া,হজমে ব্যাঘাত এবং অন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করে। মূলত প্রতি দিন ৩০ গ্রাম এর বেশি তরমুজ গ্রহন দেহের জন্য ক্ষতিকর।

২.তরমুজে বিদ্যমান পটাশিয়াম এর অতিরিক্ত গ্রহণের দরুণ বিভিন্ন Cardiovascular সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন –অনিয়ন্ত্রিত হৃদস্পন্দন,দুর্বল পালস রেট ইত্যাদি যা দেহের Nervous System এরও ব্যাঘাত ঘটায়।

৩.সাধারণত যারা নিয়মিত এলকোহল পান করে তাদের তরমুজের অতিরিক্ত গ্রহণ এড়িয়ে চলা উচিত। কেননা তরমুজের Lycopen এলকোহল এর সাথে বিক্রিয়া করে অন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করে।

৪.ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে তরমুজের অতিরিক্ত গ্রহণ ঝুকির কারণ। কারণ তরমুজে রয়েছে প্রায় ৭২% High Glycemic Index যা রক্তে সুগার লেভেল কে বাড়িয়ে দেয়।

৫.তরমুজ অনেকের ক্ষেত্রে আবার  এলার্জি সৃষ্টি করতে পারে।

৬.Pregnancy তে যদিওবা তরমুজের উপকারিতাই বেশি তবুও অতিরিক্ত খেলে মাথা ধরা, অন্ত্রে প্রদাহ,বমি ভাব, বদহজম প্রভৃতি দেখা দিতে পারে। তাই এ সময় একটু সতর্কতা মেনে চলতে হবে।

সাধারণত একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ দৈনিক ৫০০ গ্রাম বা (২-৩)কাপ পর্যন্ত তরমুজ হজম করতে সক্ষম। রসালো তরমুজ খাওয়ার পাশাপাশি এর বীজটাও ভেজে অথবা অন্য কোনো খাবারের সাথে গ্রহন করা যায়। যেহেতু এটি একটি গ্রীষ্মকালীন সহজলভ্য ফল তাই এর উপযুক্ত গ্রহণের মাধ্যমে আমরা এর উপকারিতা গুলো সহজেই ভোগ করতে পারি।

 

লেখক-

আফরিনা তাবাসসুম

খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান।

সম্পাদনা-

 

জান্নাতুল তাবাসসুম

খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান।

2,065 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *