কলার কথকতা

পৃথিবীজুড়ে সর্বাধিক সমাদৃত ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কলা। কিন্তু স্বাস্থ্য সচেতন
মানুষের মধ্যে এ নিয়ে বিতর্কও কম নয়। কলা খাবেন কি খাবেন না এমন প্রশ্ন তাই প্রায়শই
জন্ম নেয়। তবে এ প্রশ্নের জবাব হ্যাঁ বা না দিয়ে দেয়া যায় না। কেননা তা নির্ভর করে ব্যাক্তির
সার্বিক স্বাস্থ্য এবং কলার ধরনের ওপর।
প্রথমে জেনে নেয়া যাক কলার রকমফের। আমাদের দেশে কলার যে জাতগুলো সহজলভ্য সেগুলো
হলোঃ
 সাগর কলা
 সবরি কলা
 চাঁপা কলা বা চিনি চম্পা কলা
 বিচি কলা
 বাংলা কলা বা কবরি কলা
 কাঁচা কলা বা আনাজি কলা।

এদের মধ্যে সাগর কলা ও সবরি কলায় চিনির মাত্রা বেশি এবং বিচি কলা, বাংলা কলা ও চাঁপা
কলায় চিনির মাত্রা তুলনামূলক ভাবে কম ও খাদ্য আঁশের মাত্রা বেশি থাকে। জাতভেদে এ মাত্রা
সামান্য কম বেশি হয়।
সাধারনত একটি মাঝারি সাইজের কলা থেকে ১০৫ কিলোক্যালরি শক্তি, ০.৪ গ্রাম ফ্যাট, ১.৩
গ্রাম প্রোটিন, ২৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১৪ গ্রাম চিনি, ৩.১ গ্রাম খাদ্য আঁশ ও ৪২২.৪
মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পাওয়া যায়।

কাঁচা কলাঃ
কাঁচা কলার শর্করার বেশিরভাগই স্টার্চই রেসিস্ট্যান্ট স্টার্চ বা এক ধরনের খাদ্য আঁশ যা
ক্ষুদ্রান্ত্রে হজম হয়না। এছাড়া থাকে কিছু পরিমান পেকটিন। খাদ্য আঁশ এবং পেকটিন উভয়ই
আমাদের অন্ত্রে প্রিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে উপকারী ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে সাহায্য করে। এ
ব্যাকটেরিয়া গুলো একধরনের ক্ষুদ্র শিকল যুক্ত ফ্যাটি এসিড বিউটাইরেট উৎপন্ন করে যা
অন্ত্রকে সুরক্ষা দান করে।কাঁচা কলা ইনসুলিনের কার্যকারিতাও বৃদ্ধি করে।
কাঁচা কলা রান্না করে কিংবা রান্না ছাড়াই খাওয়া যায়। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে কাঁচা কলা
গ্যাসের উদ্রেক করে।

পাকা হলুদ কলাঃ
কলার পরিপক্বতার সাথে সাথে এর রেসিস্ট্যান্ট স্টার্চ চিনিতে রুপান্তরিত হতে থাকে এবং
পানিতে দ্রবণীয় পেকটিনের পরিমান বাড়তে থাকে। কাঁচা কলার তুলনায় এতে অধিক মাত্রায়
এন্টিঅক্সিডেন্ট (ফ্ল্যাভোনয়েড) থাকে।
দাগধরা কলাঃ
কলা অতি পরিপক্ব হয়ে গেলে এর চামড়ায় বাদামী দাগ দেখা দিতে থাকে। এর সরল শর্করা বা
চিনির পরিমান তত বাড়তে থাকে। এ কলায় অতি উচ্চ মাত্রায় এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে।
বাদামী বর্ণধারনকারী কলাঃ
সাধারনত অনেকেই এই অবস্থায় কলাকে খাওয়ার অনুপযোগী মনে করেন, আদতে এই অবস্থায়
কলা হলো এন্টিঅক্সিডেন্টের ভান্ডার। তবে একই সাথে এই কলা চিনিরও ভান্ডার। এতে প্রায় ৯৯

ভাগ রেসিস্ট্যান্ট স্টার্চ ই চিনিতে পরিনত হয়। এই কলাতে মুক্ত চিনির পরিমান কলার মোট
ওজনের ১৬ শতাংশের ও বেশি হয়। অর্থাৎ, এই পর্যায়ে ১০০ গ্রাম ওজনের একটা কলায় ৪ চা
চামচের সমপরিমাণ চিনি থাকে।

কলা খুবই পুষ্টিকর খাদ্য। যদি এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে থাকেন কলা খাবেন কিনা, তাহলে
জেনে নিন কলার কিছু অসাধারণ গুন-
* অনেক গবেষণায় দেখা গেছে,কাঁচা কলা ডায়রিয়া নিরাময়ে সহায়তা করে। কারন এতে রয়েছে
পেকটিন নামক খাদ্য আঁশ যা অন্ত্র থেকে অতিরিক্ত পানি শোষন করে মল শক্ত করতে এবং
কোলন ও ক্ষুদ্রান্ত্রের মিউকাসের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে।
* যে সমস্ত হৃদরোগ আক্রান্ত ব্যক্তির ডায়াবেটিস বা ওজনাধিক্য নেই তারা নিশ্চিতে কলা খেতে
পারবেন। এর উচ্চ মাত্রার পটাশিয়াম ও ফ্ল্যাভোনয়েড( catechin) হৃদপিণ্ডের সুস্থতায় সহায়ক।
উচ্চমাত্রার পটাশিয়াম ও সামান্য সোডিয়ামের সমন্বয় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে দৈনিক ১.৩-১.৪ গ্রাম পটাশিয়াম গ্রহণ করলে হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায়
২৬% পর্যন্ত কমে। একটি মাঝারি আকারের কলায় প্রায় ০.৪ গ্রাম পটাশিয়াম পাওয়া যায়।
* কলার আরেকটি উপকারী দিক যা অনেকেরই অজানা তা হলো, কলা ঘুমে সহায়তা করে। কলায়
থাকা ট্রিপ্টোফ্যান সেরোটোনিন হরমোন উৎপাদনে সহযোগিতা করে। এই সেরোটোনিন মানসিক
উদ্বেগ কমায় এবং ভালো ঘুম আনয়ন করে।
* কলার ম্যাগনেসিয়াম পেশির আড়ষ্ট ভাব কমায়, মাংসপেশিকে রিল্যাক্স করে।
*প্রতি ১০০গ্রাম কলায় রয়েছে ০.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি৬ যা লোহিত কনিকা তৈরিতে,
প্রয়োজনীয় অ্যামিনো এসিড উৎপাদনে ও সুস্থ স্নায়ুতন্ত্র গঠনে সহায়তা করে।
* খেলাধুলা ও শরীরচর্চার পর কলা খেলে তা শক্তি ও ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি পূরন করে।
* খাবার হজমে এবং বিপাক ক্রিয়ায় কলা বেশ উপকারি।
তবে কলা খাওয়ার আগে কিছু বিষয় মনে রাখা ভালো –
*টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং স্থুলকায় ব্যক্তি অথবা যারা ওজন কমাতে চাচ্ছেন তাদের জন্য দাগধরা
এবং বাদামী বর্ণ ধারণকারী কলা বর্জনীয়। পাকা হলুদ কলা পরিমিত মাত্রায় গ্রহণ করা নিরাপদ।
এক্ষেত্রে সাগর কলা বা সবরি কলার পরিবর্তে চাঁপা কলা, বাংলা কলা বা বিচি কলা খাওয়ার চেষ্টা
করতে হবে।
* কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে কাঁচা ও অপরিপক্ব কলা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন।
* কলায় চিনির পরিমান বেশি। তাই দাঁতের এনামেল ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
* একবারে বেশি কলা খেলে ঝিমুনি ভাব হতে পারে।

বহু পুষ্টিগুনে সমৃদ্ধ কলা ছোট বড় যে কারোরই বেশ পছন্দের। ফ্রুট
সালাদ,ফালুদা,কাস্টার্ড,স্মুদি,ওটস ইত্যাদি খাবারে অনায়াসে কলা যোগ করতে পারেন। এতে যেমন
খাবারের স্বাদ বৃৃদ্ধি পাবে তেমন পুষ্টিগুনও বাড়বে। তাই বিশেষ কোন সমস্যা না থাকলে শরীর
সুস্থ রাখতে প্রতিদিন কলা গ্রহন করতে পারেন।

লেখকঃ
হুমায়রা নাজনীন

খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ

সম্পাদনাঃ
জান্নাতুল তাবাসসুম
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ

1,901 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *