ডায়াবেটিস বলে কি আম খাবেন না?

চারদিকে বেশ ভ্যাপসা গরম। এই গরমকাল নিয়ে বাঙালির অভিযোগের শেষ নেই। তবে যতই অভিযোগ থাক
না কেন, পাকা আমের সুঘ্রানে এবং স্বাদে গরমের সব দোষ যেন ঢাকা পড়ে যায়। এর অতুলনীয় স্বাদের
জন্যই আমকে ফলের রাজা বা “The King of Fruits” বলা হয়।
আম কাঁচা হোক বা পাকা হোক, জিভে জল আসবেই। কিন্তু আম খাওয়ার কথা ভাবলে ডায়াবেটিস রোগীদের
মনে দুশ্চিন্তা চলে আসে। আম খেলে ডায়বেটিস ঠিক থাকবে তো? ডায়াবেটিস থাকলে আম খেতে পারবোই
বা কতটুকু? হ্যাঁ, তারাও খেতে পারবেন। তবে কিছু বিষয় সম্পর্কে জানা থাকলে ডায়বেটিস রোগীরাও
নিশ্চিন্তে তাদের পছন্দের আম তাদের খা পারবেন।
প্রথমেই জেনে নেই আমের পুষ্টিগুন সম্পর্কে। শুধু স্বাদেই নয়, পুষ্টির দিক থেকেও কিন্তু কম যায় না
আম। ১৬৫ গ্রাম স্লাইস করে কাটা আমে থাকে-

  • ৯৯ কিলোক্যালরি শক্তি
  • ১.৪ গ্রাম প্রোটিন
  • ০.৬ গ্রাম ফ্যাট
  • ২৫ গ্রাম শর্করা
  • ২.৬ গ্রাম খাদ্য আঁশ
  • ২২.৫ গ্রাম চিনি

এছাড়াও আমের ভিটামিন এ, ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই যথাক্রমে দৈনিক খাদ্য চাহিদার ১০%, ৬৭% ও
১০% পূরন করে। আমে খনিজ লবনের পরিমানও কম নয়। এর পটাশিয়াম ১৩৮ মি.গ্রাম,কপার ০.০৯
মি.গ্রাম ও ফলেট ৩৫.৩ মি.গ্রাম রয়েছে।
এত পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ আমের গুনেরও কোন তুলনা নেই। যেমন

  • আমের এনজাইম প্রোটিন ভাঙনে ভূমিকা রাখে ও খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে
  • এর ভিটামিন সি ইমিউন সিস্টেমকে আরো শক্তিশালী করে।
  • পটাশিয়াম, খাদ্য আঁশ ও পেকটিন কোলেস্টেরল লেভেলকে নিয়ন্ত্রণে রাখে
  • ভিটামিন এ দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
  • আমে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে।
  • ফাইটোক্যামিক্যাল ও খাদ্য আঁশগুলো ওজন কমাতে সাহায্য করে।
  • ভিটামিন এ, ভিটামিন সি ত্বক পরিষ্কার ও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে ইত্যাদি।

এত উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও ডায়বেটিসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য আম খাওয়া বা না খাওয়ার মধ্যে
বিতর্ক লেগেই থাকে।
ডায়বেটিস রোগীদের যেকোন খাবার গ্রহনের আগে তার ক্যালরি মান, গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ও গ্লাইসেমিক
লোড সম্পর্কে জানা থাকা প্রয়োজন। একটি আমের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৫১-৫৬ এর মধ্যে এবং
গ্লাইসেমিক লোড ৯ এর মতো থাকে। কোন খাদ্য খাওয়ার পর রক্তে শর্করার পরিমান কতটা বাড়ে তারই
পরিমাপ করে এই সূচক। সূচকের হার যত কম তত ভালো। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৫৫ এর নিচে হলে তা নিম্ন
মাত্রার, ৭০ এর বেশি হলে উচ্চ মাত্রার। আবার গ্লাইসেমিক লোড ২০ এর বেশি হলে তা উচ্চ, ১১ -এর
নিচে হলে কম। অর্থাৎ আম নিম্ন বা মধ্যম রেটের মধ্যে পড়ে। তাই রোগীর খাদ্যতালিকা থেকে আম
একদম বাদ না দিলেও চলবে।

আবার,আমের অধিকাংশ ক্যালরি আসে (প্রায় 90℅ ক্যালরি) চিনি থেকে যার কারণে ব্লাড সুগার বেড়ে
যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে ডায়বেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে । কিন্তু, আমে রয়েছে প্রচুর পরিমানে
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং খাদ্য আঁশ যা রক্তে চিনির প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। ওকলাহোমা
ইউনিভার্সিটির একটি গবেষনা থেকে জানা যায়, ডায়বেটিস রোগীরা নিয়মিত আম গ্রহন করলে ইনসুলিন
রেসিস্ট্যান্স কে কমিয়ে আনে এবং দেহের গ্লুকোজ সহনশীলতাকে উন্নত করে।
ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখার একমাত্র উপায় হলো নিয়ম করে সময়মতো খাওয়া। আম খাওয়ার ক্ষেত্রেও
তাই ব্যতিক্রম নয়। এখন জেনে নেওয়া যাক, আম খেতে চাইলে ডায়বেটিস রোগীকে কি কি মেনে চলা
প্রয়োজন-

  •  আমের পরিমান কম বেশির উপর রক্তের সুগার বাড়া কমা অনেকটাই নির্ভর করে। রক্তের
    গ্লুকোজ লেভেল সবসময় পর্যবেক্ষনে রাখতে হবে। আমের শর্করা ও ক্যালরির পরিমান দুটোই
    বেশি হলেও যদি পরিমিতভাবে খাওয়া যায় তবে গ্লুকোজ লেভেলে তেমন প্রভাব পড়ে না।
  • হজমের সমস্যা এড়াতে আমকে ছোট ছোট টুকরো করে ১/২ কাপ পরিমান বা ১-২ টুকরা স্লাইস করা
    আম খাওয়া যেতে পারে। ১/২ কাপ আম থেকে ১২-১৪ গ্রাম এর মতো শর্করা পাওয়া যায়। তাই
    একেবারে অতিরিক্ত না খেয়ে অল্প অল্প করে খাওয়া নিরাপদ।
  • ডায়বেটিস রোগীর সময় মেনে খাবার খাওয়া বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সাধারনত দিনের বেলা বা বিকাল ৫
    টার আগে যেকোন ফল খাওয়া উচিত। দিনের বেলায় শরীরের মধ্যে এনজাইমগুলো বেশি সক্রিয়
    থাকে বলে আমের মধ্যে যে ক্যালরি আছে তা তাড়াতাড়ি নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। তাই, সন্ধ্যা বা
    রাতে আম খাওয়ার পরিবর্তে সকালে বা মধ্য সকালের নাস্তায় খাওয়া যেতে পারে।
  • আমে যেহেতু ফ্রুক্টোজ (শর্করা) বেশি পরিমাণে আছে তাই দুপুরের খাবারের পর আম খাওয়ার ইচ্ছে হলে ভাত কম গ্রহন করবেন।
    তবে দুপুরের খাওয়ার পর পরই আম না খাওয়া ভালো। এতে ব্লাড সুগার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। নিতান্তই খেতে ইচ্ছা করলে দুপুরের খাবারে ভাত কম খেয়ে শাক সবজি বেশি খাবেন এবং খাওয়ার ১০ মিনিট পর একটি আম খাবেন।
  • আমের সাথে প্রোটিনজাতীয় খাবার যেমন লো ফ্যাট মিল্ক, বাদাম অথবা ডাল খাওয়া ভালো।
  • আমের জুস খাওয়ার পরিবর্তে গোটা আম খাওয়ার উপর গুরুত্ব দিন। কারন জুসে খাদ্য আঁশের ঘাটতি থাকে। ডায়বেটিস রোগীর জন্য আঁশযুক্ত ফল বেশি উপকারি। তবে জুস খেতে ইচ্ছা করলে জুস না খেয়ে স্মুদি খাওয়া ভাল। কারণ স্মুদিতে ফলের আঁশ উপস্থিত থাকে।
    আমাদের দেশি আমগুলোতে প্রচুর আঁশ রয়েছে যেমন ফজলি আম, আশ্বিনা আম। রোগীরা তাদের
    খাদ্যতালিকায় বেশি আঁশযুক্ত আম বাছাই করে নিবেন। এই ধরনের আমে ফ্রি সুগারের পরিমান
    কিছুটা কম থাকে।
  • সাধারনত কালোজাম ব্লাড সুগার কমাতে সাহায্য করে। তাই আম খাওয়ার পরে কয়েকটি জাম খেয়ে
    নিলে সুগার লেভেল ঠিক থাকবে। তাছাড়া, মিক্সড ফ্রুট সালাদে যেমন রসালো, সাইট্রাস ফলগুলোর
    সাথে আম যোগ করেও খেতে পারেন।

তাহলে, এখন আর ডায়বেটিস রোগীদের আম খাওয়া নিয়ে ভয় পেতে হবে না। শুধু আমই নয়, যেকোন পছন্দের
ফল খাওয়ার আগে সে সম্পর্কে ভালো করে জেনে নিন। তবে মনে রাখবেন, আপনি কতটুকু পরিমাণ আম খেতে
পারবেন তা অবশ্যই আপনার রক্তের সুগার লেভেলের উপর নির্ভর করে। নিয়ম মেনে সতর্কতার সাথে চললে
পছন্দের আম খেতে আর বাধা থাকবে না।

লেখক
ছামিয়া মাহবুবা
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান

সম্পাদনা
জান্নাতুল তাবাসসুম

খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান

1,675 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *