শুধু মাছেরই নয়, পুষ্টিরও রাজা ইলিশ

বাঙ্গালি কিন্তু ইলিশ মাছ পছন্দ না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। ভোজনরসিক বাঙ্গালীর পাতে ইলিশ যোগ হয় নানা রুপে। সর্ষে ইলিশ, ভাপা ইলিশ, ইলিশ ভুনা,ইলিশ ভাজা, ইলিশ পাতুরি, ইলিশ পোলাও, ইলিশের ডিম, নোনা ইলিশ ইত্যাদি। মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের চলতি মাসের হিসাবে বিশ্বের মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশ এখন বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সাধারনত ৩ প্রজাতির ইলিশ পাওয়া যায়। যার মধ্যে বিখ্যাত ও সুপরিচিত প্রজাতি হলো পদ্মা ইলিশ (Tenualosa ilisha) যা পদ্মা অববাহিকা ও বঙ্গোপসাগরে পাওয়া যায়। মেঘনা অববাহিকা ও বঙ্গোপসাগরে পাওয়া যায় চন্দনা ইলিশ (Nenuacosa toli)। আরেকটি হলো গুর্তা ইলিশ (Hilsha kelle) যা কেবলমাত্র বঙ্গোপসাগরেই পাওয়া যায়। তবে স্বাদের বিবেচনায় পদ্মার ইলিশের কোনো তুলনাই চলে না।

বাঙ্গালি সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা এ মাছটি স্বাদে যেমন অতুলনীয়, পুষ্টিতেও তেমন অনন্য। ২০১৫ সালে মাছের পুষ্টিগুন নিয়ে করা ওয়ার্ল্ড ফিশের একটি গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার জনপ্রিয় ৩০ টি মাছের মধ্যে ইলিশ সবচেয়ে বেশি পুষ্টিকর।

প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁটা ছাড়া ইলিশে আছেঃ
 শক্তি -২২৩ কিলোক্যালরি
 আর্দ্রতা – ৬২.৭ গ্রাম
 প্রোটিন – ১৮.০ গ্রাম
 চর্বি -১৬.৮ গ্রাম
 ক্যালসিয়াম – ৮৬ মিলিগ্রাম
 আয়রন – ১.৩ মিলিগ্রাম
 ম্যাগনেসিয়াম – ২৬ মিলিগ্রাম
 ফসফরাস – ১৯৫ মিলিগ্রাম
 পটাশিয়াম – ১৬২ মিলিগ্রাম
 সোডিয়াম – ৫২ মিলিগ্রাম
 জিংক – ০.৫৪ মিলিগ্রাম
 নায়াসিন – ৫.৬ মিলিগ্রাম

ইলিশের চর্বির ১০-১১ শতাংশই ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, এবং ওয়ার্ল্ড ফিশের মতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের হিসেবে স্যামন মাছের পরই ইলিশের অবস্থান। অবশিষ্ট চর্বির ও বেশিরভাগই বিভিন্ন ধরনের মনো ও পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড। যার মধ্যে রয়েছে, ওলেইক , লিনোলেইক, লিনোলেনিক, অ্যারাকিডোনিক, ইকোসাপেন্টানয়িক এসিড(EPA), ডোকসাহেক্সানয়িক এসিড(DHA)।

এই ফ্যাটি এসিড গুলোর উপস্থিতিই ইলিশের এই অনন্য স্বাদ তৈরিতে ভুমিকা রাখে।
চলুন এবার জেনে নেয়া যাক ইলিশের যত উপকারী গুনঃ

 রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণঃ ইলিশ উচ্চ চর্বিযুক্ত মাছ, তবে মজার বিষয় হচ্ছে, এই
চর্বির বেশিরভাগই HDL যা উপকারী চর্বি। এটি রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বা LDL এর
মাত্রা হ্রাস করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে , ১০ মাস দৈনিক ১০০ গ্রাম ইলিশ খাওয়ার
পর রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ১৪ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক আবদুল ওয়াহাব ইলিশের
নতুন গুণ আবিষ্কৃত হওয়ার দিকে আলোকপাত করে বলেন, ইলিশ মাছের মধ্যে ওমেগা-৩
নামে একধরনের তেল আছে, তা হৃদরোগসহ বেশ কিছু রোগের ওষুধ হিসেবে বিশ্বজুড়ে
ব্যবহৃত হচ্ছে।
 রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়ঃ ইলিশে উপস্থিত EPA ও DHA ইকসিনয়েড হরমোন তৈরী রুখতে
পারে। এই হরমোন রক্ত জমাট বাঁধিয়ে দেয়, ফলে শিরা ফুলে যায়। নিয়মিত ইলিশ খেলে
রক্ত সঞ্চালন ভালো থাকে, থ্রম্বসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে।
 বাত নাশকঃ ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড অস্টিওআরথ্রাইটিস উপশম করে। দৈনিক খাদ্য
তালিকায় সামুদ্রিক মাছ যোগ করা গেলে বাতের ব্যাথা, গাঁটের ব্যাথায় আরাম পাওয়া যায়।
 অবসাদ হ্রাসঃ ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড অবসাদ দূর করতে পারে। এছাড়াও ইলিশ সিজনাল
ডিফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (SAD) ও প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতা (Depression) কাটাতে
সাহায্য করে।
 মনোযোগ বৃদ্ধিঃ ইলিশ মনোযোগের অভাবজনিত রোগ এটেনশন ডেফিসিয়েট হাইপার
এক্টিভিটি ডিসঅর্ডার ( ADHD) রোধ করতে পারে, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে।

জেনে রাখা ভালোঃ
 ইলিশ মাছ খুবই স্বাস্থ্যকর মাছ, তবে এর পরিপূর্ণ পুষ্টি তখনই মিলবে যখন তা পুষ্টিসম্মত উপায়ে রান্না করা হবে। কড়া তেলে ভাজা বা ঝলসানো ইলিশ স্বাস্থ্যকর নয়, তেলে ভাজলে এর ক্যালরির মাত্রা বেড়ে যায়।
 ভাপা ইলিশ ও কম তেলে রান্না করা ইলিশ সবচেয়ে পুষ্টিকর। তাই ইলিশ মাছ নিয়মিত
খেতে হলে কড়া তেলে ভাজা বা ঝলসানো বা সরষে বাটা বা তৈলাক্ত রান্না না খেয়ে পাতলা ঝোল খাওয়া উচিৎ।
 ব্যক্তি বিশেষে ইলিশ মাছ গ্রহণে অ্যালার্জি বা গ্যাসের উদ্রেক হতে পারে, সেক্ষেত্রে ইলিশ মাছ এড়িয়ে চলাই উত্তম।

ইলিশ মাছ সাগর থেকে যতই নদীর মিষ্টি পানির দিকে আসে, ততই এর শরীর থেকে লবণ কমে গিয়ে
স্বাদ বাড়ে। তবে ডিম ছাড়ার আগ পর্যন্তই ইলিশের স্বাদ সবচেয়ে বেশি থাকে। সহজলভ্য ও পুষ্টিসমৃদ্ধ হওয়ায় ইলিশ মাছের কোন তুলনা হয়না। তাই স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ইলিশ রান্না করে এর অসাধারণ স্বাদ ও পুষ্টিগুন দুটোই উপভোগ করুন।

লেখকঃ হুমায়ারা নাজনীন তামান্না
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ
সম্পাদনাঃ জান্নাতুল তাবাসসুম
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ

651 total views, 8 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *