শিশুর বাড়তি খাবারে আপনি যত্নশীল তো?

জন্মের পর প্রথম ৬ মাস শিশুর সব ধরনের পুষ্টি চাহিদা পূরনের জন্য মায়ের দুধই যথেষ্ট। ৬ মাসের পর হতে শিশুর দৈহিক বৃদ্ধির হার দ্রুত হয়,ফলস্বরূপ পুষ্টি চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। শিশুর এই বাড়তি চাহিদা পূরনের জন্য মায়ের দুধের পাশাপাশি যেসব বাড়তি খাবার দেওয়া হয় তা পরিপূরক খাবার নামে পরিচিত। শিশুর বয়স অনুযায়ী পুষ্টিচাহিদা পূরণ করতে পরিপূরক খাবারের বিকল্প নেই। তবে এই পর্যায়েও মায়ের দুধই পুষ্টি ও শক্তি  চাহিদার প্রধান উৎস।
শিশুর পরিপূরক খাবারের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন। ইউনিসেফ এর দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী
শিশুর পরিপূরক খাবার হবে উচ্চ শক্তি ও পুষ্টি সম্মৃদ্ধ । এই খাবার অবশ্যই সুষম, নরম এবং হজমোপযোগী
হতে হবে। ৩/৪ রকমের খাবারের মিশ্রণে শর্করা জাতীয় খাবার(শস্য ও আলু) ছাড়াও আমিষ যেমন মাছ, ডিম, কলিজা আবার ভিটামিন জাতীয় ফল ও সবজিও রাখতে হবে। সেই সাথে রাখতে হবে পর্যাপ্ত পরিমানে স্নেহ বা তেল। বিভিন্ন ধরনের খাবারের মিশ্রণ সকল ধরনের পুষ্টি উপাদানের চাহিদা পূরন নিশ্চিত করে।
মা অথবা পরিচর্যাকারীকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, শিশুর পাকস্থলী খুবই ছোট, তাই খাবার দিতে হবে অল্প পরিমানে, ঘন ঘন করে।

শিশুকে পরিপূরক খাবার দেয়ার সময় কিছু নিয়ম মেনে চলা উচিত। যেমনঃ
১. প্রথমে শুরু করতে হবে ফলের রস বা ছেঁকে নেয়া স্যুপ দিয়ে। এরপর আঁশবিহীন নরম ফল যেমন পাকা কলা,আম,পেঁপে চটকে দেয়া যায়।
শিশু এটি গ্রহণ করতে শুরু করলে নরম শস্য জাতীয় খাবার, যেমনঃ চালের গুঁড়া, সুজি, নরম সেদ্ধ ডিমের কুসুম, সেদ্ধ আলু ইত্যাদি দিতে হবে।
প্রথম প্রথম শিশুর মুখে খাবার দেয়ার সময় বুকের দুধ মিশিয়ে দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়, এতে নতুন খাবারের স্বাদ শিশুর মুখে সম্পুর্ণ অপরিচিত মনে হয় না।

Oranges for Babies: Nutritional Value, Health Benefits & Recipes
২. শিশুকে ১-২ চামচ করে খাবার মুখে দিয়ে অভ্যাস করাতে হবে।
৩. শিশুকে জোর করে খাওয়ানো যাবে না। শিশু যতটুকু স্বেচ্ছায় খায় ততটুকুই যথেষ্ট।
৪. প্রথমবার খাবার খাওয়ানোর পরের দিন শিশুর মল পরীক্ষা করতে হবে, মলে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা? খাবারের অংশ আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে।
৫.এই খাবারগুলোতে শিশুর শারীরিক কোনো সমস্যা না হলে, পরবর্তীতে চাল,ডাল ও সবজির মিশ্রনে নরম
পাতলা খিচুড়ি দিতে হবে। তবে ব্লেন্ড করে নয়।

৬. প্রথমবার শিশুকে খাওয়াতে গেলে, দুধ খাওয়ানোর কিছু সময় পরে ১/৪ চা চামচ খাবার দিতে হবে। কান্না
করলে দুধ খাওয়ানোর মাঝামাঝি ২ বার খাবার দিতে হবে।
৭. ৬/৭ মাসের শিশুকে প্রায় ৫০-৬০ গ্রাম খাবার দিনে ২ বার দেওয়া যায়। ১ বছর হলে ৭৫-১০০ গ্রাম খাবার
দিনে ৩-৪ বার দেওয়া যায়।
৮. পরিপূরক খাবার প্রথমে পাতলা, পরে নরম থকথকে করতে হবে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে গোটা খাবার দেওয়া যায়।
৯. শিশুকে কখনোই বাসি খাবার দেওয়া যাবে না। সবসময় টাটকা ও তাজা খাবার খাওয়ানো উচিত।
১০. যখন তখন শিশুকে খাওয়ানো যাবে না। খাওয়ানোর একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে নিতে হবে। যখন
তখন খাওয়ালে ক্ষুধা নষ্ট হয়, শিশুর স্বাস্থ্যহানি ঘটতে পারে।
১১. পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। নোংরা খাবার, থালা বাটি, চামচ ইত্যাদিতে শিশুর অসুখ, কৃমি ইত্যাদি ডেকে আনতে পারে। শিশুকে খাওয়ানোর পূর্বে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করতে হবে। শিশুর খাবার রান্না ও পরিবেশনের তৈজসপত্র পরিচ্ছন্ন হতে হবে।
১২. শিশুর দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খাবার খাওয়াতে হবে।
১৩. শিশু যদি কোনো খাবার খেতে অপছন্দ করে তাকে বার বার সে খাবার দেওয়া যাবে না। ১/২ সপ্তাহ পরে
আবার চেষ্টা করে দেখতে হবে খায় কিনা।
১৪. খাবারে বৈচিত্র্যতা আনতে হবে। বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফলমূল খাবারে রাখতে হবে।
১৫. শিশুর খাবার তৈরির সময় তেল, মাখন বা ঘি দিতে হবে।
১৬. ৮/৯ মাস বয়সে শিশু যখন চিবিয়ে খেতে পারবে তখন ফল ছোট ছোট টুকরো করে খেতে দিতে হবে। এ বয়সে শিশুকে ফিংগার ফুড অর্থ্যাৎ শিশু নিজে আঙ্গুলে ধরে খেতে পারবে এমন খাবার খেতে দিন।
১৭. ফলের জুস খাওয়ানো যেতে পারে। তবে বোতলে করে নয়, কাপে খাওয়াতে হবে।
১৮. স্বল্প পুষ্টিমূল্য কিংবা পুষ্টিহীন খাবার বা পানীয় ( চা, কফি, সফট ড্রিংকস, চিপস ইত্যাদি) দিয়ে শিশুর ছোট পেট ভরাবেন না। এতে শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়।
১৯. কিছু কিছু সময় শিশুর খাবারের প্রতি অনীহা আসে। যেমন গরমের সময় বা যখন শিশুর ঠাণ্ডা লাগে বা দাঁত ওঠার সময়। তখন খেয়াল রাখতে হবে এবং আরও যত্নশীল হতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে বুকের দুধ খাইয়ে যেতে হবে।
২০. শিশুর গলায় আটকে যেতে পারে এমন কোনো খাবার যেমন, গোটা আঙ্গুর, কাঁচা গাজর, বাদাম,
আপেলের টুকরা ইত্যাদি দেয়া উচিৎ নয়।
২১. শিশুর বয়স ১ বছর হওয়ার পূর্বে মধু দেয়া যাবে না। মধু গুরুপাক খাবার, যার ফলে শিশুর হজমে গোলমাল হতে পারে।

২২. কোনো কারন বশত যদি শিশুকে বুকের দুধ না খাওয়ানো হয়, তাহলে আরও ঘন ঘন খাবার দিতে হবে, এবং দুগ্ধজাত খাবার দিতে হবে।
২৩. ১ বছর বয়সে শিশুরা মোটামুটি সকল স্বাভাবিক খাবার খেতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, শুধু লক্ষ্য রাখতে হবে
খাবারটি যেন সহজে চাবানো এবং গেলা যায়।

 শিশুর শারীরিক অবস্থা বা মলে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের
পরামর্শ নিন। আপনার যত্ন ও ভালোবাসায় পরিবারের ছোট্ট সদস্যটি বেড়ে উঠুক সুস্বাস্থ্যকে সঙ্গী করে।

লেখা
আছিয়া(মিম)
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ
সম্পাদনা
হুমায়ারা নাজনীন তামান্না
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ

918 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *