ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করলার ভূমিকা কতটুকু?

করলা এক প্রকার ফল জাতীয় সবজি। ইংরেজিতে একে Bitter Melon, Bitter Gourd, Wild Cucumber, Bitter Apple, Balsam Apple, Balsam Pear,Karela, Kunga বলা হয়ে থাকে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Momordica charantia. করলা মূলত এমন একটি সবজি যা তার তিক্ত স্বাদের জন্য এই নামটি পেয়েছে। সাধারণত পাকার সাথে সাথে এটি আরো তিক্ত হয়ে উঠে।
করলার আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশে, যা ১৪শ শতাব্দী তে কানাডায় পরিচিত লাভ করে। এছাড়াও এটির বিস্তার এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, পূর্ব আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চল জুড়ে অনেকটা জায়গা দখল করে রেখেছে,যেখানে সময়ের সাথে সাথে এটি বিভিন্ন চিকিৎসা ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
করলা দেখতে কিছুটা শশার মত কিন্তু এর স্বাদ খুব তেতো। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি উপাদান যেমন – Vitamin A, Vitanin C, beta-carotine এবং Minerals ( আয়রন, পটাশিয়াম,জিংক) যা আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বেশ উপকারী। এছাড়াও এটি Dietary Fibre এর একটি মূল উৎস। সাধারণত ঐতিহ্যগত ভাবে ওষুধ তৈরীর ক্ষেত্রে করলা এবং করলার বীজ ব্যবহৃত হয়।
এইতো গেলো করলার আদিবৃত্তান্ত। এখন জানবো আমাদের মূল বিষয়, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এই করলা ঠিক কতটা কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
বর্তমান বিশ্বে ডায়াবেটিস সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, যা মূলত একজন ব্যক্তির লাইফস্টাইল এর সাথে অনেকটাই সম্পর্কিত। WHO এর মতে সারা বিশ্বে ৩৮২ মিলিয়ন মানুষের এই ডায়াবেটিস রয়েছে।
এই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি জিনিস হচ্ছে নিয়মিত ব্যায়াম এবং পরিমিত খাদ্যাভাস। এটা ছাড়াও আর একটি জিনিস যেটি এসবের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তা হলো এই করলা। এতে অনেক কার্যকরী পুষ্টি উপাদান রয়েছে যেমন Iron, Mg, K ইত্যাদি। করলায় সাধারণত পালংশাক,ব্রকলি ও কলার তুলনার প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণে যথাক্রমে ক্যালসিয়াম,বিটা-ক্যারোটিন এবং পটাশিয়াম পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে Vitamin C , B1, B2 এবং B9 যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়াও –
১. রক্তের গ্লুকোজ লেভেল নিয়ন্ত্রনেঃ করলাতে মূলত আন্টি ডায়াবেটিক বৈশিষ্ট্যসহ ৩ ধরণের কার্যকরী উপাদান রয়েছে যাতে Charanti অন্তর্ভুক্ত যা মূলত রক্তে গ্লুকোজ লেভেল কমাতে সাহায্য করে ও Vicine এবং এক ধরণের ইনসুলিন জাতীয় উপাদান রয়েছে যা Polypeptide-p নামে পরিচিত। এই তিনটি উপাদান সাধারণত একইসাথে অথবা আলাদা আলাদা ভাবে কাজ করে রক্তে সুগার লেভেল কে কমাতে।
Journal of Ethanopharmacology তে প্রকাশিত এক পরীক্ষায় জানা যায় যে,একজন ডায়াবেটিক রোগী যদি প্রতিদিন ২০০০ মিলিগ্রাম করলা জুস গ্রহণ করে তাহলে তার রক্তে গ্লুকোজ এর মাত্রা স্বাভাবিক থাকা শুরু করে। এটি টাইপ – ১ এবং টাইপ – ২ ডায়াবেটিস উভয় অবস্থার ক্ষেত্রেই কার্যকরী।

এছাড়াও এতে রয়েছে Sitosteryl Glucoside এবং Stigmasteryl Glucoside নামক ২ টি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা ডায়াবেটিক রোগীর রক্তে গ্লুকোজ লেভেল কে কমাতে সাহায্য করেছে।
২. Immune System কে শক্তিশালী করতেঃ একজন ডায়াবেটিক রোগীর জন্য অন্যান্য যেকোনো রোগ এর সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা অতীব জরুরি কেননা এটি রোগীর স্বাস্থ্যগত অবস্থাকে আরো খারাপ করতে পারে। এক্ষেত্রে শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে করলার কেন জুড়ি নেই।
করলাতে রয়েছে Vitamin C এবং Anti-Oxidant যা দেহে কোষের বৃদ্ধিকে সচল রাখে এবং দেহকে ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি রোগীর এলার্জি এবং হজম সংক্রান্ত সমস্যাদি প্রতিহত করতে সাহায্য করে।
Pharmaceutical Research Journal এ ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন হতে জানা যায় যে- করলাতে রয়েছে Anti-Carcinogenic এবং Anti-tumor এর বৈশিষ্ট্য সমূহ যা দেহের Immue System এর জন্য অনেকটাই উপকারী।
৩. রক্তে Hemoglobin A1C- এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণেঃ একজন ডায়াবেটিক রোগীকে সাধারণত তার রক্তে হিমোগ্লোবিন এর মাত্রা একটি নির্দিষ্ট লেভেলে রাখতে হয়। কেননা গ্লুকোজ ডায়াবেটিক রোগীর ক্ষেত্রে লোহিত রক্ত কণিকার হিমোগ্লোবিন এর সাথে সংযুক্ত হয়। আর এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণে করলার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা করলাতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদান টাইপ -২ ডায়াবেটিক রোগীর রক্তে Glycosylated hemoglobin (HbA1C) এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এ রাখে।
The Journal of Clinical Epidemiology তে প্রকাশিত এক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গিয়েছে যে, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং যাদের নতুন ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে তাদের ক্ষেত্রে এই করলা শতভাগ কার্যকরী।
৪. ওজন কমাতে সহায়তাঃ সাধারণত একজন ডায়াবেটিক রোগীর জন্য অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর হচ্ছে স্থূলতা। তাই এই ক্ষেত্রে করলা মূলত রোগীর ক্যালরি কন্টেন্ট, ফ্যাট এবং কার্বোহাইড্রেট এই ৩ টি উপাদানের উপর নিয়ন্ত্রণ এনে স্থূলতার হাত থেকে রক্ষা করে। কেননা এটি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ক্ষুদা লাগার প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এর পাশাপাশি করলা দেহে খারাপ কোলেস্টেরল এর মাত্রাকেও কমাতে
এবং এতে বিদ্যমান Iron ও Folic Acid এর উপস্থিতিতে স্ট্রোক এর ঝুঁকি কমিয়ে দেহকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

এতো গেলো মূল প্রতিপাদ্য ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করলার ভূমিকা। তবে ডায়াবেটিস ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রেও করলার ভূমিকা অনন্য। যেমন –
 করলাতে বিদ্যমান Vitamin-A এবং Beta Carotene যা দৈনিক গ্রহণে চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও Dietary Fibre এর অন্যতম উৎস এই করলা হজমে সহায়তা এবং পাকস্থলী এর আলসার রোগের প্রতিষেধক হিসেবেও কাজ করে।

 এছাড়াও করলাতে বিদ্যমান Anti-oxidant বিভিন্ন বর্জ্য দূর করে এবং পিত্ত রসের নিঃসরণ বাড়িয়ে লিভারের কার্যকলাপ কে সচল রাখতেও সাহায্য করে। পাশাপাশি Anti-microbial এবং Anti-oxidant এর বৈশিষ্ট্য থাকায় সপ্তাহে অন্তত ২ দিন করলা গ্রহণে রক্তের বিভিন্ন বর্জ্য দূর করতে রক্তের গতিবৃদ্ধি সচল রাখতেও সহায়তা করে।
 এছাড়াও এটি ত্বকের সুরক্ষায়,চুলের যত্নে ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় ও সমান ভাবে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তবে বিভিন্ন পুষ্টিগুণ এ সমৃদ্ধ এই করলার ও কিছু সীমাবদ্ধতা
রয়েছে।যেমন –
 করলা মূলত একটি উদ্ভিদ জাতীয় সবজি হওয়ায় একে দীর্ঘ মেয়াদি ডায়েট বা মেনু পরিকল্পনায় রাখার আগে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।
 এছাড়া গর্ভাবস্থায় কিছুটা বুঝে শুনে করলা গ্রহণ করতে হবে কেননা এটি প্রমাণিত হয়েছে যে,গর্ভাবস্থায় করলা গ্রহণে অনিয়মিত মাসিক এর কারণ হতে পারে।
 যদি কোন ওষুধ এর ডোজ চলতে থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে ফিজিশিয়ান এর পরামর্শ অনুযায়ী খেতে হবে।
 ডায়াবেটিক রোগীর ক্ষেত্রে ডায়েটে এক দিনে ২ টির বেশি করলা থাকা উচিত নয় কেননা এর অতিরিক্ত গ্রহণ Mild Abdominal Pain অথবা Diarrhoea এর সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ উপরোক্ত তথ্যাবলী থেকে এটা বুঝা যায় যে, করলা শুধুমাত্র একটি ফল নয় বরং বিভিন্ন পুষ্টিগুণ এ সমৃদ্ধ এক মহৌষধ। তাই আমাদের উচিত এর পুষ্টিগুণের কথা বিবেচনা করে নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করে স্বাস্থ্য সুস্থতা নিশ্চিত করা।

লেখক
মাহজাবিন হক দিভা
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ
সম্পাদনা
জান্নাতুল তাবাসসুম
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ

272 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *