জানেন কি গর্ভবতী মায়ের হাড়ের ব্যাথার কারণ ও তার প্রতিকার

আজ তিথির সাতসা।এই দিনটা ঘিরে তার কত পরিকল্পনা, কত অপেক্ষা ছিল গত ছয়টা মাস ধরে! কিন্তু সকাল থেকেই তার পিঠ আর কোমরের ব্যাথাটা ক্রমশ বেড়ে উঠে তাকে জানান দিচ্ছে দিনটা তার পুরোই ভেস্তে যাবে। ব্যাথাটা শুরুর দিকেও ছিল কিন্তু ডেলিভারির তারিখ যতই এগিয়ে আসছে ব্যাথাটাও যেন সমানুপাতিকভাবে বেড়েই চলেছে। ডাক্তার আপাকে ব্যাথার কথা প্রতিবারই বলেছে তিথি, তিনি কিছু ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খেতে দিয়েছেন। ওষুধ গুলা নিয়মিতই খায় সে তবুও ব্যাথাটা কমছে না।শুধু তিথি নয়, অধিকাংশ গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন ও প্রসব পরবর্তী সময়ে পিঠের, কোমরের হাড়ের ব্যাথার অভিযোগ প্রায়শই থেকে থাকে। প্রশ্ন হল, হাড়ের এই ব্যাথার কারন কি? এক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম প্রয়োজন কেন? গর্ভাবস্থায় এমন হওয়াটা কি স্বাভাবিক?

কেন ক্যালসিয়াম প্রয়োজন?
গর্ভবতী মায়ের শারীরিক অবস্থা এবং তার খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভ্রুনের বিকাশ সম্পূর্ণটাই নির্ভরশীল।গর্ভধারণের ১৩তম সপ্তাহ পর ভ্রুনের স্কেলেটাল কাঠামোর বিকাশ শুরু হয়। শুরুটা হয় নমনীয় তরুণাস্থি গঠনের মাধ্যমে এবং তা ক্রমান্বয়ে ossification (অস্থি কলা গঠন ) প্রক্রিয়ায় নিরেট অস্থিতে প্রতিস্থাপিত হয়। এ সময় প্লাসেনটার মাধ্যমে মায়ের দেহ থেকে প্রচুর পরিমানে ক্যালসিয়াম ভ্রুনে সরবরাহিত হয়। এই ক্যালসিয়াম শিশুর হারকে দৃঢ়,মজবুত ও প্রসারিত করতে ব্যবহৃত হয়। ক্যালসিয়াম ফিটাসের মজবুত দাঁতের গঠন,পেশির গঠন, হৃদপিণ্ডের গঠন নিশ্চিত করে। এছাড়াও দেহে ক্যালসিয়াম অত্যন্ত সক্রিয় একটি মিনারেল যা স্নায়ু তন্ত্রের নিউরোট্রান্সমিশন, সেল সিগনালিং, স্নায়ুর যথাযথ কার্যকারিতার জন্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। দৈহিক গঠনের চাহিদা ছাড়াও শিশু জন্মের সময় ৩০গ্রাম ক্যালসিয়াম দেহে সঞ্চিত করে গর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হয়। এ সকল কারনে মায়ের শরীরে ক্যালসিয়ামের পর্যাপ্ততা থাকা আবশ্যক। মায়ের রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা সর্বদা একটি নির্দিষ্ট মানে অপরিবর্তনীয় রাখা অত্যন্ত জরুরী। ক্যালসিয়ামের মান ধ্রুব রাখার জন্যে মানব দেহে কার্যকরী একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। যখন রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায়,তখন ক্যালসিটনিন হরমোনের ক্রিয়ায় অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম পরবর্তীতে ব্যবহারের জন্যে আমাদের হারে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় সঞ্চিত হয়ে থাকে।আবার শরীরে যখন ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হয়, তখন প্যারাথাইরয়েড হরমোন ও ভিটামিন- ডি গৃহীত খাদ্য হতে অতিরিক্ত ক্যালসিয়ামের চাহিদা মেটাতে সচেষ্ট হয়। এমতাবস্থায় মা যদি ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যথেষ্ট পরিমানে গ্রহণ না করেন তখন মায়ের হারে সঞ্চিত ক্যালসিয়াম, ঘাটতি পূরণের জন্যে এর প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। প্যারাথাইরয়েড,ক্যালসিট্রাওল(ভিটামিন- ডি) হরমোন গুলো হাড়ের উপর ক্রিয়া করে সঞ্চিত ক্যালসিয়ামকে রক্তে বিমুক্ত করে। দীর্ঘদিন ধরে এ প্রক্রিয়া চললে মায়ের হাড়ের ক্ষয় ঘটে এবং ব্যাথা অনুভূত হয়।

কিভাবে বোঝা যাবে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি আছে কি না?
ক্যালসিয়ামের ঘাটতি যদি যথা সময়ে পূরণ করা না হয় তবে সেই মা পরবর্তীতে অস্টিওপোরোসিস-এ আক্রান্ত হতে পারেন। অস্টিওপোরোসিস হল এমন একটি রোগাবস্থা যাতে হাড়ে ছোট ছোট ছিদ্র দেখা যায় বা হাড়ের বিভিন্ন স্থান দুর্বল হয়ে পরে ফলে হাড়ে তীব্র ব্যাথা হওয়া, চিড় ধরা, Dowager’s hump(কুঁজ) সৃষ্টি হওয়া ইত্যাদি জটিলতাগুলো দেখা যায়। তাই এ অবস্থা এড়ানোর জন্যে মায়ের রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা নিবিড় পর্যবেক্ষনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।মায়ের শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব জনিত উপসর্গ গুলো হল-

  • দুর্বল ও ভঙ্গুর অস্থি
  • হাড়ে ব্যাথা ও ফাটল সনাক্ত হওয়া
  • রক্ত জমাট বাঁধা প্রক্রিয়া সংক্রান্ত সমস্যা
  • দুর্বলতা ও অবসাদগ্রস্ততা
  • ভ্রুনের বর্ধন ও বিকাশে বিলম্বতা
  • উচ্চ রক্তচাপ ও হার্টের সমস্যা

 মায়ের হাড়ে ব্যাথা হলে করণীয়
গর্ভাবস্থায় ভ্রুন যাতে পর্যাপ্ত পরিমানে ক্যালসিয়াম পায় এবং মায়ের হাড়ের ক্ষয় রোধের জন্যে মাকে প্রতিদিন ১০০০ মি.গ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।তবে মাকে তার খাদ্য তালিকায় ক্যালসিয়ামের সাথে ভিটামিন- ডি, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-কে সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।কারন খাদ্য উৎস থেকে পাওয়া ক্যালসিয়ামের শোষণের জন্যে এ উপাদানগুলো অত্যাবশ্যক। এ কারনে অনেক সময় দেহে ক্যালসিয়ামের পর্যাপ্ততা থাকলেও এসকল উপাদানের ঘাটতির ফলে ক্যালসিয়ামের শোষণ ব্যাহত হয়,যার কারনে এর অভাবজনিত উপসর্গগুলো দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে মায়ের হাড়ের ব্যাথা ও ক্ষয়ের কারন হয়ে দাঁড়ায়।একারনে তিথি ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাচ্ছে কিন্তু তার দেহে এর শোষনের জন্যে প্রয়োজনীয় উপাদান গুলোর ঘাটতি থাকায় ক্যালসিয়ামের শোষন ক্রিয়া ঠিকমত হচ্ছে না তাই তার ব্যাথাও কমছে না। তাই অবশ্যই গর্ভবতী মাকে খাদ্য হতে এসকল উপাদান সমূহের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে –

  • খাদ্য তলিকায় ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেব দুধ, দই,পনির, ঢেঁড়স, তিল, কিডনি বিন, বাদাম ইত্যাদির উপস্থিতি রাখতে হবে।
  • পালংশাক, মিষ্টিকুমড়ার বিচি, টক দই, কলা, কাজুবাদাম, অ্যাভোকাডো ইত্যাদি ম্যাগনেসিয়ামের ভাল উৎস হওয়ায় গুলো পর্যাপ্ত পরিমানে খেতে হবে।

 

  • ভিটামিন- ডি পাওয়ার ভাল উৎস হিসেবে ডিম,পনির, গরুর কলিজা, টুনা মাছ, সারডিন মাছ, স্যালমন মাছ, মাশরুম, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য পরিমানে গ্রহন করতে হবে। এছাড়া সূর্যের আলো শরীরে ভিটামিন ডি তৈরিতে অত্যাবশ্যকীয়, তাই দিনের বেলা কিছুটা সময় রোদ এ থাকা ভাল।
  • সবুজ শাক- সবজি, পিয়াজ, ব্রকলি, বাধা-কপি, ফুলকপি, শশা, পেয়ারা, দুগ্ধজাত(ফারমেন্টেড)খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি খাবার থেকে ভিটামিন- কে ও ভিটামিন-সি গ্রহন নিশ্চত করতে হবে।
    মনে রাখতে হবে, মায়ের ঘাটতির কারনে ভ্রুন যদি পর্যাপ্ত পরিমানে ক্যালসিয়াম না পায় তবে নবজাতক শিশু অসম্পূর্ণ বিকাশ, রিকেট সহ মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিতে থাকে। এছাড়াও দুগদ্ধদান কালে মায়ের ক্যালসিয়ামের চাহিদা আরো বেড়ে যায়,কারন মায়ের দুধ নবজাতক শিশুর জন্যে একমাত্র ক্যালসিয়ামের উৎস। এতে গর্ভকালীন ঘাটতি পরবর্তীতে আরো ভয়াবহ অবস্থা ধারন করে। তাই মাকে অবশ্যই এই বিষয়টির গুরুত্বের সাথে সমাধান করতে হবে। গর্ভকালীন সময়ে মায়েদের কিছু কিছু উপাদানের দৈহিক চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা পূরণ করার জন্যে ওষুধ বা সাপ্লিমেনটেসনের উপর নির্ভর না করে মায়ের খাদ্যাভ্যাস উন্নত করার প্রতি অধিকতর মনোযোগ দেয়া উচিত। কোন খাবার কতটুকু খেলে, কি উপায়ে খেলে মায়ের চাহিদা গুলো যথাযথভাবে পূরণ হবে তার জন্যে একজন দক্ষ পুষ্টিবিদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে হবে এবং সে অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে এবং অবশ্যই তা যথাযথাযথ ভাবে মেনে চলতে হবে।
    পরিশেষে বলবো যে, ভাল ফসল পাওয়ার জন্যে কৃষককে যেমন বীজ বোনার আগে সার ইত্যাদি দিয়ে জমি প্রস্তুত করতে হয় তেমনি গর্ভধারণের পূর্বে মায়ের দায়িত্ব হচ্ছে তার শরীরকে পুষ্টিগত দিক থেকে গর্ভধারণের উপযোগী করে তোলা। মায়ের জন্যে তার সন্তান হল অমূল্য সম্পদ। মা তার সব কিছু দিয়ে তার সন্তানকে আগলে রাখতে চান, নিরাপদে রাখতে চান। আর এজন্যেই একজন আদর্শ মা অবশ্যই চাইবেন একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে,সাথেসাথে সন্তানের নিরাপত্তার জন্যে নিজের সুস্থতা নিশ্চিত করতে।

লেখক-
জেরিন তাসনিম
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ (৪র্থ বর্ষ),
গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, আজিমপুর।

 

 

6,428 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by জেরিন তাসনিম

খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *