জেনে নিন গর্ভবতী মায়ের উচ্চরক্তচাপ জটিলতার কারণ ও প্রতিকার

“মা”- ডাকটি খুব সাধারণ শোনালেও, একজন নারীর “মা” হয়ে উঠার গল্পটা কিন্তু খুব জটিল। “মা” পদবীটি অর্জন করার জন্যে একজন নারীকে অনেক ধরনের শারীরিক ও মানষিক পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে যেতে হয়। দুর্ভাগ্যবশত গর্ভকালীন সময়ে স্বাভাবিক পরিবর্তনের সাথেসাথে বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তন্মদ্ধে প্রি- এক্লাম্পসিয়া জনিত জটিলতা অন্যতম, যা অনেক সময় মা ও ফিটাসের(ভ্রুন) মৃত্যুর কারন হয়ে দাড়ায়।তাই গর্ভবতী মায়েরা সাবধান প্রি- এক্লাম্পসিয়া হতে!

আসুন আগে জেনে নেই –

প্রি-এক্লাম্পসিয়া কিঃ
প্রি-এক্লাম্পসিয়া (যা পূর্বে টক্সিমিয়া নামে পরিচিত ছিল) গর্ভকালীন সময়ে উচ্চ রক্তচাপ জনিত একটি জটিল অবস্থা। এতে আক্রান্ত মায়ের, গর্ভাবস্থার পূর্বে উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কিত কোন জটিলতার অভিজ্ঞতা থাকেনা। এক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার ২০তম সপ্তাহের পর বা এর কাছাকাছি সময়ে হঠাৎ মায়ের -উচ্চ রক্তচাপ, ইউরিনে উচ্চ মাত্রায় প্রোটিনের উপস্থিতি এবং সাথে প্লাসেন্টার দ্রুত বর্ধন লক্ষ্য করা যায়। এইসময়য় প্রস্রাবে প্রোটিন বেড়িয়ে যাওয়ার কারনে গর্ভবতী মায়ের হাত-পা ও মুখমণ্ডলে পানি এসে ফুলে যায়, যাকে ইডিমা বলে।প্রি-এক্লাম্পসিয়ার যদি বেশিদিন থাকে এটি মা ও শিশুর উভয়ের মৃত্যুর কারন হতে পারে। তাই এই লক্ষণ গুলো প্রকাশ পেলে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

কারা প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেনঃ
প্রি-এক্লাম্পসিয়া গর্ভবতী মায়ের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক শারীরিক অবস্থা। এতে রক্তচাপ বৃদ্ধির সাথেসাথে মায়ের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ (যেমন- লিভার, কিডনি,ব্রেইন,প্লাসেন্টা) এর মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয় সাথে অনাগত শিশুর বিকাশও ত্রুটিপূর্ণ হয়।তাহলে জানতে হবে কারা প্রি- এক্লাম্পসিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন?

যিনি প্রথমবার মা হতে যাচ্ছেন
 যে মায়ের gestational hypertension(গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ) বা প্রি-এক্লাম্পসিয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে
 যিনি একাধিকবার গর্ভবতী হয়েছেন এবং তখন প্রি- এক্লাম্পসিয়াতে আক্রান্ত ছিলেন
অনিয়ন্ত্রিত জীবনব্যবস্থা ( ড্রাগ বা তামাক সেবন,অধিক পরমানে অস্বাস্থ্যকর খাদ্দ্য গ্রহণ)
৪০ বা তার অধিক বছর বয়সের গর্ভবতী নারী
মায়ের যদি গর্ভাবস্থার পূর্বে উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি জনিত জটিলতা থেকে থাকে
মা যদি obese(স্থূলকায়)হন বা তার BMI ৩০এর অধিক হলে

প্রি-এক্লাম্পসিয়ার উপসর্গগুলোঃ
প্রি-এক্লাম্পসিয়া গর্ভবতী মায়ের organ malfunction, water retention(শরীরে পানি আসা), abdominal pain (তলপেটে ব্যাথা) সহ আর কিছু গুরুতর অবস্থার জন্য দায়ী।এ কারনে প্রত্যেক মায়ের প্রি- এক্লাম্পসিয়া-এর উপসর্গ গুলো জানা ও তদানুসারে নিজেদের শারীরিক অবস্থা মনিটরিং করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক প্রি- এক্লাম্পসিয়া- এর উপসর্গ গুলো কি কি –

 —-উচ্চ রক্তচাপ(১৪০/৯০ mm Hg বা  তার উপরে) থাকলে,

—-ইউরিনে উচ্চ মাত্রায় প্রোটিনের      উপস্থিতি (২৪ ঘণ্টার ইউরিন   টেস্টে  ০.৩ গ্রাম বা তার বেশি্‌-      প্রোটিন-
ক্রিয়েটিনিন (mg/dL)অনুপাত ০.৩ বা তার বেশি,

—-শরীর ফুলে যাওয়া অর্থাৎ হাত,পা,মুখে পানি আসা,

—-ঘনঘন তীব্র মাথা ব্যাথা হওয়া,

—-তল পেটে তীব্র ব্যাথা অনুভূত হওয়া্,

—-দ্রুত অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি ,

—-ক্লান্তিভাব ও মাথা ঘুরানো ভাব,

—-অনবরত বমিবমি ভাব ও বমি করা,

—-ক্ষুধা কমে যাওয়া,

—-সল্প মাত্রায় ইউরিন এবং সেটা যদি লালচে হয় ,

—-Placental Abruption; এতে প্লাসেন্টা, ইউটেরাস হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় প্লাসেন্টাতে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়,

—-Vaginal Bleeding (যোনি হতে রক্তক্ষরণ)।

প্রি-এক্লাম্পসিয়ার কারনঃ
প্রি-এক্লাম্পসিয়া প্রথমবার যারা মা হচ্ছেন তাদের মধ্যে বেশি হতে দেখা যায়। প্রি-এক্লাম্পসিয়া কেবল মায়েরই নয় অনাগত শিশুর মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। উচ্চ রক্তচাপ uterus(জরায়ু) ও placenta(অমরা) এর ব্লাড ভেসেল গুলোকে সংকুচিত করে দেয়,যা umbilical cord(মা ও ভ্রুনের মধ্যবর্তী সংযোগকারী নাড়ি) দিয়ে পুষ্টি উপাদান ও অক্সিজেন সরবরাহকে বাধাগ্রস্থ করে। ফলে শিশুর বিকাশ ঠিকমত হয় না, underweight(কম ওজন বিশিষ্ট) শিশুর জন্ম হয়, Premature birth(অপরিণত শিশু জন্ম) হয়, শিশুর Nerve and neurological damage(স্নায়ু জনিত জটিলতা )ঘটে, শিশুর Epilepsy বা seizures(খিঁচুনি) হয়, Hearing and visual problems(চোখ ও কানের সমস্যা) দেখা দেয়।

যদিও প্রি-এক্লাম্পসিয়া এর সঠিক কারন সম্পর্কে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে,তবে গবেষকেরা মনে করেন এক্ষেত্রে প্রেগনেন্সির প্রাথমিক পর্যায়ে প্লাসেন্টাল টিস্যু ও ব্লাড ভেসেল গুলোর বিকাশ সঠিকভাবে হয়না।

প্রথমবার মা হবার ঝুকি প্রি-এক্লাম্পসিয়া

ভ্রুন এর Trophoblast cell (ভ্রুনকে বেষ্টন করে রাখা কোষ), ইউটেরাসের decidua (জরায়ুকে বেষ্টনকারী কোষ) ও myometrium layer (জরায়ুকে ঘিরে রাখা মসৃণ পেশীর আবরণ) ভেদ করে spiral arteries (যারা জরায়ুতে রক্তপ্রবাহ করে) এ প্রবেশ করে, যাতে Embrayo পর্যাপ্ত পরিমানে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত পেতে পারে। এভাবেই সাধারণ অবস্থায় মায়ের শরীর থেকে ফিটাসে রক্ত সরবরাহিত হয়।

এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে হওয়ার জন্যে Trophoblast কে অত্যন্ত সক্রিয় এবং spiral arteries গুলোকে অধিক পরিমানে রক্ত প্রবাহ করার জন্যে প্রশ্বস্ত ও দৃঢ় হতে হয়।যদি কোন কারনে এ দুটির মধ্যে কোন একটি ক্রিয়া ঠিকমত না ঘটে তখন গর্ভবতী মা প্রি-এক্লাম্পসিয়াতে আক্রান্ত হন।

প্লাসেন্টা যদি spiral arteries এ সঠিকভাবে প্রবেশ করতে না পারে, তাহলে এতে পর্যাপ্ত পরিমানে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত প্রবাহিত হয়না। তখন প্লাসেন্টার পরিবেষ্টিত কোষ গুলো inflammatory molecules(প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদান) নিষ্কৃত করে যা মায়ের রক্ত প্রবাহে প্রবেশ করে, ব্লাড ভেসেলের endothelial cell (শিরা বা ধমনির অভ্যন্তর ভাগকে বেষ্টন করে রাখা কোষ) কে ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে এগুলো সংকুচিত হয়ে যায়।এ কারনেই প্রি-এক্লাম্পসিয়া এর বৈশিষ্টপূর্ণ উপসর্গ গুলো প্রকাশ পায়।

Inflammatory molecules গুলো, ব্লাড ভেসেল গুলোকে ছিদ্রযুক্ত করে ফেলে এতে পানি, প্রোটিন ইত্যাদি এর থেকে বের হয়ে যায়, যার কারনে শরীরে পানি আসে।একইভাবে কিডনি,লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউরিনে প্রোটিনের উপস্থিতি মেলে, right upper quadrant(উদর হতে ডান পার্শ্বের উপরি ভাগে)এ ব্যাথা অনুভূত হয়, লিভার এনজাইমের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।এছাড়া পরবর্তী পর্যায়ে HELLP syndrome[H-hemolysis(লোহিত রক্তকণিকার ভাঙ্গন), ELL- elevated liver enzyme(লিভার এনজাইমের মাত্রা বৃদ্ধি), P-low platelet (অণুচক্রিকার সংখ্যা হ্রাস পাওয়া)] দেখা যায়।

প্রি-এক্লাম্পসিয়া প্রতিরোধে যা করনীয়ঃ
বোঝাই যাচ্ছে প্রি-এক্লাম্পসিয়া গর্ভবতী মায়েদের জন্যে রীতিমত এক আতঙ্কের নাম। তাহলে একে প্রতিরোধ করার উপায় কি? দুর্ভাগ্যবশত এই ভয়ঙ্কর ব্যাধি পুরোপুরিভাবে প্রতিরোধ করার কোন কার্যকারী পন্থা এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে বেশ কিছু উপায় আছে যা এর ক্ষতির তীব্রতা কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।আসুন উপায় গুলো জেনে নেয়া যাক-

স্বাস্থ্য সম্মত ওজন রক্ষা করা – গবেষণায় দেখা গিয়েছে মা গর্ভবতী হওয়ার পূর্বে স্বাস্থ্য সম্মত ওজনে থাকা, পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য সম্মত ওজনে থাকা বলতে, BMI ১৯-২৫ বা ৩০এর নিচে থাকাকে বোঝায়।এর জন্যে গর্ভকালীন সময়ের অনেক জটিলতা এড়িয়ে চলা সম্ভব হয়।

দৈনিক ব্যায়াম করা- দৈনিক যথাযথ উপায়ে মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম স্বাস্থ্যসম্মত প্রেগনেন্সির সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। যা বন্ধ্যাত্ব এর মাত্রা কমায় ও গর্ভাবস্থা জনিত জটিলতা হ্রাস করে। গর্ভধারণ অবস্থায় ব্যায়াম করার উপকারিতা গুলোর মধ্যে প্রদাহ- (inflammation) এর মাত্রা হ্রাস পাওয়া, কাঙ্ক্ষিত ওজন অর্জন ও রক্ষা করা, স্ট্রেস জনিত প্রভাব হতে রক্ষা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে স্বাস্থ্য সম্মত খাদ্য গ্রহণ করা– মায়ের দেহে আরেকটি নতুন প্রানের সূচনার আগে চিকিৎসকগণ মাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন, মিনারেল ও অধিক এণ্টি-অক্সিডেণ্ট সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহনের পরামর্শ দেন।অপেক্ষাকৃত কম পরিমানে লবন ও লবনাক্ত খাদ্য গ্রহণ এবং অধিক পরিমানে পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। প্রচুর পরিমানে তাজা ফলমূল ও রঙ্গিন শাক-সব্জি খাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত। এ সকল খাবার উচ্চ মাত্রায় ইলেকট্রলাইট ও পটাশিয়াম সরবরাহ করে থাকে। সব ধরনের প্যাকেজেড খাদ্যদ্রব্য, হাই- সুগার স্ন্যাকস, আর্টিফিসিয়াল অ্যাডিটিভস, ফ্রাইড ফুড খাদ্য-তালিকা থেকে পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।

ডিহাইড্রেসন ও অবসন্নতা প্রতিরোধ করা– গর্ভবতী মায়ের শরীর হাইড্রেটেড রাখা ও দেহে সোডিয়ামের মাত্রার ভারসাম্য রক্ষা করা অতীব জরুরী।মাকে পর্যাপ্ত পরিমানে পানি পান করতে হবে( দৈনিক কমপক্ষে ৮ গ্লাস করে) এবং অ্যাকোহোলিক ও ক্যাফেইনেটেড পানীয় গ্রহণ পরিহার করা উচিত।মায়ের মন সবসময় প্রফুল্ল রাখা এবং স্ট্রেস পরিহার করা উচিত।

নিয়মিতভাবে পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা– গর্ভবতী মা কে নিয়মিত একজন পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে।মা যদি তার মধ্যে, প্রি-এক্লাম্পসিয়া-এর কোন একটি উপসর্গ থাকার সন্দেহ করেন অথবা তার পরিবারে কারো এই সমস্যার পূর্ববর্তী রেকর্ড থাকে তবে তা চিকিৎসককে জানাতে হবে এবং এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যত শীঘ্র এই সমস্যা নির্ণয় করা যাবে, এর ক্ষতির মাত্রা ততই কমিয়ে আনা যাবে।পুরো গর্ভকালীন সময় জুড়ে মায়ের রক্তচাপ ও ইউরিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।অপ্রত্যাশিত কোন পরিবর্তন বা প্রি-এক্লাম্পসিয়া-এর সম্ভাবনাসূচক কোন লক্ষণ মনে হলে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হতে হবে।

মনে রাখতে হবে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার যদি সময়মত সঠিক চিকিৎসা করা না হয় পরবর্তীতে অধিকতর খারাপ অবস্থা এক্লাম্পসিয়ার সৃষ্টি করে। এতে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার জটিলতা গুলোর সাথে গুরুতর খিঁচুনি হয়ে থাকে, সাথে লিভারে রক্তক্ষরণ, হার্ট ফেইলর, লাংসে পানি আসা, কোমা, এমনকি মা ও শিশুর মৃত্যুও ঘটতে পারে। একারনে প্রি-এক্লাম্পসিয়াকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এর সঠিক চিকিৎসা করতে হবে।

পরিশেষে এতটুকুই বলবো,গর্ভকালীন সময়টা একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত।তাই এসময়ের শারীরিক ও মানষিক বিপত্তি গুলো স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে প্রতিরোধ করে ভাল থাকুক সকল মা এবং নিরাপদ ও সুন্দর হোক তার গর্ভকালীন মুহূর্তগুলো।

লেখক-
জেরিন তাসনিম

খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ।

53,065 total views, 8 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *