ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কোন কোন খাবার নিরাপদ

রহমান সাহেব আজ বাজার করতে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে হঠাৎ পড়ে গেলেন, লোকজন তাকে ধরাধরি করে বাসায় দিয়ে আসলেন। বেশ কিছুদিন ধরেই উনার প্রচুর পিপাসা পেতো, ক্ষুধা বেড়ে গিয়েছিল কিন্তু ওজন কমে যাচ্ছিল। তিনি বরাবরের মতো কিছুই পাত্তা দেন নি। আজ মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাওয়ায় ডাক্তার তাকে কিছু টেস্ট দেন যাতে ধরা পড়ে রহমান সাহেবের ডায়াবেটিস। ডাক্তার উনাকে বেশ কিছু নিয়মনীতি দিয়ে দেন যা মেনে চলতে হবে সবসময় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

ডায়াবেটিস বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। আগে উন্নত দেশ সমূহে দেখা যেতো, কিন্তু এখন আমাদের দেশে এর হার অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছে। প্রায় প্রতি পরিবারেই দেখা যাচ্ছে ডায়াবেটিকস রুগী, কিন্তু আমাদের এখনো সঠিক পরিমানে সচেতনতা বৃদ্ধি পায় নি এই রোগ নিয়ে। এই প্রচলিত রোগটি নিয়ে বা এই রোগের জন্য কি খাদ্যাভ্যাস তৈরি করতে হবে তা নিয়ে অনেকেরই নেই সঠিক ধারনা। যার কারণে প্রতিনিয়ত অনেক বিড়ম্বনায় পড়েন ডায়াবেটিকস রুগীরা।

ডায়াবেটিস একটি রোগ যাতে রক্তের গ্লুকোজ বা ব্লাড সুগারের পরিমাণ অনেক বেশি বেড়ে যায়। এই গ্লুকোজ আমাদের প্রতিদিন গ্রহণ করা খাদ্য থেকে। আমাদের দেহে ইনসুলিন নামক হরমোন আছে যার কাজ হল এই গ্লুকোজকে দেহের সকল কোষে পৌঁছে দেওয়া। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে দেহে এই ইনসুলিন তৈরি বন্ধ হয়ে যায়। টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন কাজ করে না। বেশির ভাগ সময় টাইপ-২ ডায়াবেটিস রুগী দেখা যায়। ইনসুলিন তৈরি না হওয়া বা এর অকার্যকারিতার জন্য রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে চোখ, কিডনি, নার্ভ এর অনেক ক্ষতি হয়। ডায়াবেটিসের কারণে হার্ট এট্যাক, স্ট্রোকও হতে পারে। গর্ভবতী মায়েদেরও ডায়াবেটিস হতে পারে।

ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া প্রয়োজন। তবে স্বাস্থ্যকর খাবারের অংশ হিসেবে নানা ধরনের খাবার উপভোগ করতে পারাও প্রয়োজন। প্রথম অবস্থায় স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যপারটি আপনার কাছে কঠিন হতে পারে, তবে দীর্ঘকাল ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সুস্থ থাকতে হলে সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা অপরিহার্য। এজন্য রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ানের শরণাপন্ন হলে উপকার পাওয়া যায়।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু খাবারের ধারণা :

১. দিনে তিনবেলা সময়মত খাবার গ্রহণ করা :

প্রতিবেলায় আহার করবেন। কোনবেলায় যাতে আহার বাদ না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন। সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার সময়মত করার চেষ্টা করতে হবে। এতে ক্ষুধা নিবারণের সাথে দেহের গ্লুকোজের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

২. প্রতিবেলার খাবারে স্টার্চ যুক্ত কার্বোহাইড্রেট খাবার গ্রহণ করা :

এই ধরণের খাবার গুলো হল আলু, ব্রেড, পাস্তা, নুডলস, ভাত, সিরিয়াল, চাপাতি ইত্যাদি। রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করবে এই ধরণের খাবার। বিশেষ করে যেসব খাবার আস্তে আস্তে হজম হয়। এই খাবার রক্তে গ্লুকোজ তেমন বাড়াবে না। বেশি আঁশযুক্ত খাবার গ্রহন করতে হবে যাতে পরিপাকতন্ত্র সুস্থ থাকে এবং কোষ্টকাঠিন্য দূর হয়।

৩. অধিক শাকসবজি ও ফলমূল :

দৈনিক অন্তত ৫ পরিবেশন ফলমূল এবং শাকসবজি খেতে হবে। এক পরিবেশন করে বিভিন্ন ফল ও সবজি নিয়ে ৫ পরিবেশন তৈরি করা যায়। এক পরিবেশন সমান কলা, আপেল, কিছু আংগুর, কিছু শুকনো ফল, এছাড়া ফলের রস, সবজি এবং ফলের সালাদ খাওয়া যায়। এতে প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং আঁশ থাকে।

৪. চর্বি যুক্ত খাবার কম খাওয়া :

সম্পৃক্ত চর্বি বা স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড যুক্ত খাবার কম খেতে হবে। চর্বি যুক্ত খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে। তবে অসম্পৃক্ত বা আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড যুক্ত খাবার খাওয়া ভালো। এই ধরণের খাবার হার্টের জন্য উপকারী।

বাটার, মার্জারিন, ঘি, চিজ খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। এগুলো স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড যুক্ত খাবার। মাংসের চর্বি কেটে ফেলে দিয়ে রান্না করতে হবে। সামুদ্রিক মাছে অনেক ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড থাকে যা আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিডের বড় উৎস, যেমন – ম্যাকারুল, স্যামন, সার্ডিন ইত্যাদি সামুদ্রিক মাছ। রান্নায় অলিভ অয়েল ব্যবহার করা উত্তম। এছাড়া ওভেনে বেক করা খাবারে তেল কম থাকে। কম চর্বি যুক্ত দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ করতে হবে।

৫. খাবারে চিনির পরিমাণ সীমিত করা :

ডায়াবেটিস হলে প্রথমেই চিনি কম খেতে বলা হয়। এর মানে এই নয় যে চিনি খাবার থেকে একদম বাদ দিয়ে দিবেন। অতিরিক্ত যে পরিমাণ চিনি খাওয়া হয় সেটি বাদ দিতে হবে। তা না হলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ অনেক কম বা অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে। খাদ্যে চিনির পরিমাণ কমাতে হলে সুগার ফ্রি খাবার খাওয়া যায়।চিনিমুক্ত ডায়েট পানীয় পান করা যায়। খাবারে চিনিমুক্ত সুইটেনার ব্যবহার করলে ভালো হয়। তবে বাজারে পাওয়া যায় যে ডায়াবেটিক বিস্কুট, কেক, পানীয় পাওয়া যায় তাতে খুব বেশি কাজ হয় না, তার বদলে নিজে থেকে চিনি জাতীয় খাবার কম করে খেলেই ভালো।

৬. বিভিন্ন ধরণের সালাদ :

আহারে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার কমিয়ে বিভিন্ন ফল এবং সবজির সালাদ খেলে পেটও ভরা থাকবে এবং শরীরের জন্যও উপকারী হবে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ভালো থাকবে, দেহে প্রয়োজনীয় পানির পরিমাণ ঠিক থাকবে। এছাড়া প্রচুর পানি পান করতে হবে প্রতিদিন।
এইসকল দিকে খেয়াল রেখে খাবার গ্রহণ করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা খুব বেশি কষ্ট হওয়ার কিছু নয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে রাখার জন্য সুষম খাবার গ্রহণ করার অভ্যাস করলে একটি সুন্দর সুস্থ জীবন যাপন করা যায়।

লেখক-
আনিকা জাহিন ত্রনি
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ

4,999 total views, 6 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *