ডায়েটারি ফাইবার বা খাদ্য আঁশ এর উপকারিতা বেশি নাকি অপকারিতা?


খাদ্যআঁশ – শুনলেই মনে হতে পারে এ আবার কি জিনিস ! খাদ্যে আঁশ কেন থাকবে, তাই না ? খাদ্যআঁশ বা Dietary fibre বলতে আসলে বোঝায় উদ্ভিদজাত খাদ্যের ঐ সমস্ত অংশ যা মানবদেহে পরিপাক হয় না, খাদ্য গ্রহনের পর অপরিপাককৃত অবস্থায় থাকে এবং মল তৈরি করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে খাদ্যআঁশ যদি পরিপাক না-ই হয় তবে আমরা খাবো কেন ? খাদ্যআঁশ পরিপাক না হলেও স্বাস্থ্যরক্ষায় এদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। খাদ্যআঁশ কোথায় কোথায় পাওয়া যায় চলুন এক নজরে তা দেখে নেওয়া যাক।

উৎস : খাদ্যআঁশ প্রধানত পাওয়া যায় শাকসবজি, ফল, শস্য ও শস্যজাত খাদ্যে। যেমন – খোসাসমেত ফল (পেয়ারা, আপেল), বিভিন্ন ধরনের শাক্ (পুঁইশাক, লালশাক, কলমিশাক ইত্যাদি), সবজি (লাউ, টমেটো, পেঁপে, গাজর ইত্যাদি), জিরা, ধনে, মটরশুটি, শুকনা ফল, নানা ধরনের বাদাম, ডাল, বীচি, গম, যব ইত্যাদি। অপ্রক্রিয়াজাত অবস্থায় খাদ্যে আঁশ অধিক পরিমানে পাওয়া যায়। অর্থাৎ খাদ্যকে আকর্ষনীয় করে তোলার জন্য মেশিনে ছাঁটাই না করা, খোসা আলাদা না করা, গোটা শস্য।

দেখে নেওয়া যাক খাদ্যআঁশ এর গুরুত্ব:
১. কোষ্ঠ্যকাঠিন্য রোধ করে : খাদ্যআঁশ মলের পরিমান বৃদ্ধি করে এবং মল নরম করে। ফলে কোষ্ঠ্যকাঠিন্য এর প্রকোপ কমে।
২. মলাশয়ের রোগ প্রতিরোধে : আঁশ পানি ধরে রাখে এবং মলের ঘনত্ব কমায়, ফলে মলাশয়ের উপর চাপ কমে। তাই মলাশয়ের বিভিন্ন রোগ যেমন – অর্শ, এপেন্ডিসাইটিস, কোলাইটিস ইত্যাদি প্রতিরোধে সহায়তা করে।
৩. অন্ত্রের ক্যান্সার প্রক্রিয়ায় বাঁধা সৃষ্টি : অন্ত্রে খাদ্যের অবশিষ্টাংশ এবং মল অধিক সময় স্থায়ী হলে জীবানুর ক্রিয়া অধিক হয় এবং বিষাক্ত উপাদান তৈরি হয়। এ উপাদানগুলো অন্ত্রের ক্যান্সার সৃষ্টিতে সহায়ক। খাদ্যআঁশ এ উপাদানগুলোর সাথে বিক্রিয়া করে দ্রুত নিষ্কাশন করে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে বাঁধা দেয়।
৪. কোলেস্টেরল এর পরিমান কমায় : খাদ্যআঁশ রক্তের কোলেস্টেরল কমায়। অন্ত্র পিত্তরস পুনঃশোষিত করে। পিত্তরসের উপাদানগুলো যকৃতের কোলেস্টেরল সংশ্লেষন হ্রাস করে।
৫. রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রন : অধিক আঁশযুক্ত খাদ্য গ্রহন করলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে। যা ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে উপকারি। আঁশ যুক্ত খাবার রক্তে শর্করার বৃদ্ধিতে বাঁধা দেয় এবং শর্করার অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পরিমান কমায়।
৬. হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় : খাদ্যআঁশ সিরাম ফিব্রিনোজেন এর পরিমান কমায়, ফলে রক্ত তঞ্চনের প্রবনতা এবং মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকশন এর আশঙ্কা কমে।
৭. স্থুলতার বিপরীতে : খাদ্যআঁশ মানবদেহে পরিপাক না হওয়ায় পাকস্থলিতে অনেকক্ষন স্থায়ী হয়। ফলে ক্ষুধাবোধ কম হয় এবং ঘন ঘন খাদ্য গ্রহনের প্রবনতা কমে। উপরন্তু এ জাতীয় খাদ্যগুলো কম ক্যালরি প্রদান করে।
৮.খাদ্য পরিবহন সহজ করে : খাদ্যআঁশ অন্ত্রের ক্রমসংকোচন স্বাভাবিক রাখে। ফলে খাদ্য পরিবহন সহজ হয়।
৯. পিত্ত লবনের মাত্রা নিয়ন্ত্রন : কিছু খাদ্যআঁশ যেমন – পেকটিন, লিগনিন ইত্যাদি অন্ত্র হতে পিত্ত লবনের পুনঃশোষণ কমায় এবং মল হতে পিত্ত লবনের রেচন বাড়ায়।
১০. রোগের প্রকোপ কমায় : খাদ্আঁশ গ্রহনের ফলে কিছু কিছু রোগের প্রকোপ কমে। যেমন – পিত্তথলির রোগ, মলাশয়ের ক্যান্সার, অর্শ্ব, এ্যাপেন্ডিকস্, হৃদরোগ, স্থুলতা ইত্যাদি। এছাড়াও মলাশয়ের রক্তক্ষরণ কমায়।
১১. পানি শোষন করে : খাদ্যআঁশ পানি শোষণ করে এবং পানি ধরে রাখতে সহায়তা করে। ফলে দেহে পানি স্বল্পতার বিপরীতে ভূমিকা রাখে।

খাদ্যআঁশ যখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশী গ্রহন করা হয় তখন দেহে তার কিছে বিরূপ প্রভাব পড়ে। আসুন সেগুলো এক নজরে দেখা যাক।
 অতিরিক্ত খাদ্যআঁশ গ্রহন দেহে আমিষের পরিপাক ও শোষণ এর বাঁধার কারন হয়ে দাঁড়ায়।
 অতিরিক্ত আঁশযুক্ত খাদ্য ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদি খনিজ পদার্থ শোষণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
 অন্ত্রে অবস্থানরত ব্যাকটেরিয়া কিছুক্ষেত্রে খাদ্যআঁশগুলোকে গাঁজিয়ে তোলে যা পেট-ফাঁপা ও অস্বস্তির কারন হয়ে দাঁড়ায়।

কোন কিছুর-ই অতিরিক্ত ভাল নয়। খাদ্যআঁশ এর উপকারিতা আছে মনে করে যদি আপনি যদি তা মাত্রাতিরিক্ত গ্রহন করেন তবে অবশ্যই তা আপনার জন্য সুফল বয়ে আনবে না। প্রতিদিন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৩০ গ্রাম পরিমান খাদ্যআঁশ গ্রহন করা উচিৎ। বিশেষ অবস্থায় এ পরিমান হ্রাস বা বৃদ্ধি করা যায়। তাই খাদ্যআঁশ অবশ্যই গ্রহন করুন, মাত্রা বজায় রেখে।

লেখক-
জিনাতুল-জাহরা-ঐশী
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান।

5,046 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *