ডিপ্রেশন কি কমবে সঠিক খাদ্যাভাসে ?

ডিপ্রেশন

-দোস্ত চল ঘুরতে যাই!
– যাবো না রে, ভালো লাগছে না।
-বাহিরে খেতে যাই?
– নাহ যাবো না।
-ক্লাসে আসলি না কেন কাল?
– ভালো লাগছিলো না।
-বাসা থেকে বের হ! খেলা দেখতে যাই চল!
– তোরা যা, আমার ভালো লাগছে না।

এই কথা গুলো যেন বর্তমানে ফাহিমের নিত্যদিনের বুলি। তার কিছুই ভালো লাগে না। সারাদিন বাসায় চুপচাপ শুয়ে বসে দিন কাটায়, যেখানে তার বন্ধুরা বিভিন্ন ভাবে সুন্দর জীবনযাপন করছে। তাকে কোনভাবেই স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত করানো যায়না, সে তার নিজের ভালো না লাগার জগতে বসবাস করে। তার সবকিছু নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তা, আতংক, ভয় কাজ করে, যার কারণে সে নিজেকে গুটিয়ে একা রাখে সবসময়। সে তার জীবন নিয়ে অনেক হতাশ। দিনদিন যেন তার কথা বলাও কমে যাচ্ছে। বন্ধুদের থেকে জানা যায় তার পরীক্ষার ফলাফলও খারাপ হচ্ছে।

ফাহিমের যে মানসিক লক্ষণ গুলো দেখা যাচ্ছে তা হচ্ছে ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশন হলো একটি কমন এবং গুরুতর মানসিক অসুস্থতা যা কোন ব্যক্তির অনুভূতি,  চিন্তাধারা এবং কার্যকলাপের উপর প্রভাব ফেলে। ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তি সর্বদা দুঃখী অবস্থায়  থাকে, যেসব কাজে আগে অনেক আগ্রহ ছিলো সেসব কাজ ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হলে আর ভালো লাগবে না। সবধরনের কাজে হতাশ লাগবে বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

লক্ষণ: কেউ ডিপ্রেশনে ভুগছে কিনা যেসব সাধারণ লক্ষণ বা শারীরিক ও মানসিক জটিলতা দ্বারা বুঝা যায় সেগুলো হল –

ডিপ্রেশনের সাধারণ লক্ষণ বা শারীরিক ও মানসিক জটিলতা

* কাজকর্মে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
* সবসময় দুঃখ বোধ করা।
* ঘুম খুব কম হওয়া অথবা খুব বেশি হওয়া।
* খাওয়ার প্রতি অনীহা, আবার অনেক সময় অতিরিক্ত খাওয়া। ডিপ্রেশনের রোগীদের ওজন অনেক বাড়তেও পারে আবার অনেক কমেও যেতে পারে।
* অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অবসাদ বোধ করা।
* অতিরিক্ত চিন্তা করা, কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হওয়া, কোন কাজে মনোযোগী হতে না পারা।
* সবসময় হতাশ বোধ করা এবং নিজেকে অপদার্থ, মূল্যহীন মনে করা।
* খুব বেশি ডিপ্রেশনে ভুগলে রোগী আত্মহত্যা করার চিন্তাও করতে থাকে।

কারণ : ডিপ্রেশন মানুষের মনে ধীরে ধীরে জন্ম নিতে থাকে, একসময় তা বড় এবং মারাত্মক আকারে রূপ নেয়। এই মারাত্মক ক্ষতিকর মানসিক রোগটি হওয়ার জন্য কিছু কারণ আছে, যেমন –
* একাকীত্বতা পরিবার যদি সময় কম দেয় অনেক টিনেজদের মধ্যেই ডিপ্রেশন দেখা দেয়।

একাকীত্বতা

* অতিরিক্ত কাজ বা বেকার জীবন অতিরিক্ত কাজ বা  অবসরহীনতা স্নায়ুকে এতটাই পরিশ্রান্ত করে দেয় যে সেটাই কখনো হতাশায় ভোগায়।  আবার তেমনি বেকার জীবন আরও বেশি ডিপ্রেশন তৈরি করে।
* খারাপ ব্যবহার: কারো থেকে কোন ভাবে খারাপ ব্যবহার পেলে ডিপ্রেশন তৈরি হতে পারে।
* মাদকদ্রব্য: দীর্ঘদিন যাবত বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সেবন করতে থাকলে ডিপ্রেশন হতে পারে। তখন ডিপ্রেশনের কারণে এই মাদকদ্রব্য সেবন আরো বেড়ে যায়, যা শারীরিক ও মানসিক উভয় ভাবেই মারাত্মক ক্ষতি করে।
* ঝগড়া / মনোমালিন্য: পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা কাছের মানুষজনের সাথে মনোমালিন্য হলে এবং তা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে ডিপ্রেশন আসতে পারে।
* মৃত্যু: পরিবারের কেউ বা খুব কাছের কারো মৃত্যু হলে সেই আকস্মিক দুঃখ ডিপ্রেশনের সৃষ্টি করে।
* বংশগত: পরিবারের সদস্য কারো ডিপ্রেশনের ইতিহাস থাকলে সেই পরিবারের অন্যদের ডিপ্রেশনের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
* অনেক দিন ধরে কঠিন অসুস্থতার কারণেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন অনেকে। এক্ষেত্রে ডিপ্রেশন চলে আসতে পারে।
* পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল বা চাকুরীক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা ও অবমূল্যায়ন থেকেও ডিপ্রেশনের শুরু হয়।
* বিভিন্ন ব্যক্তিগত সমস্যাঃ অনেক ব্যক্তিগত সমস্যা থাকে যা কারো সাথে শেয়ার করা যায়না সহজে- অনেক সময় এটাই ব্যাক্তিকে কঠিন ডিপ্রেসড করে ফেলে।

এছাড়াও আরো অনেক অনেক কারণ আছে কারো ডিপ্রেশনের রোগী হওয়ার। ইদানীং ডিপ্রেশন রোগীর পরিমাণ অনেক বাড়ছে। সাধারনত বাহির থেকে বুঝা যায়না কে ডিপ্রেসড, একারণে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা, পথ্য ও সহানুভূতিশীল ব্যবহার পায়না বেশিরভাগ ডিপ্রেশনের রোগী। তবে কেউ যদি নিজের মানসিক অবস্থার প্রতি একটু ভালোমতো খেয়াল রাখে তবে ডিপ্রেশন শুরুতেই দূর করা সম্ভব।

ডিপ্রেশনের চিকিৎসা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসা নিতে হয়, দীর্ঘ মেয়াদী ঔষধ, মেডিটেশন, বিভিন্ন ব্যায়াম, খাদ্যাভ্যাস, পথ্য ইত্যাদির মাধ্যমে ডিপ্রেশনের চিকিৎসা করা হয়। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে যদি বুঝা যায় যে কেউ ডিপ্রেশনে ভুগছে তবে তাকে সঠিক মানসিক সাপোর্ট, সুস্থ জীবনধারা ও খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একজন ডিপ্রেশন রোগীকে তার অন্যান্য চিকিৎসার সাথে তাকে একজন ডায়েটিশিয়ানের সাহায্য নিতে হবে যিনি তার সঠিক খাদ্যাভ্যাস তৈরি করে মানসিক অবস্থায় উন্নতি করতে পারেন।

খাদ্যের মাধ্যমে ডিপ্রেশন দূর হয় কিভাবে?

অমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড যুক্ত খাবার

মানসিক সমস্যা গুলো খুবই জটিল হয়ে থাকে, আমাদের মস্তিষ্কও খুবই জটিল। আমাদের মানসিক অবস্থা নির্ভর করে মস্তিষ্কের সুস্থতার উপর। আমরা প্রতিদিন যেসব খাবার খাই তা দেহের বিভিন্ন অংশের স্বাভাবিকতা বজায় রাখে। আমাদের মস্তিষ্কের প্রচুর পরিমাণে শক্তির প্রয়োজন হয় তার বিভিন্ন কাজ চালানোর জন্য। আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই তা থেকে মস্তিষ্ক এই শক্তি পেয়ে থাকে। খাদ্য থেকে পাওয়া পুষ্টি উপাদান সমূহ আমাদের নার্ভাস সিস্টেম সচল রাখার জন্য শক্তি প্রদান করে। পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রয়োজনীয় পুষ্টিমানের খাদ্য গ্রহন করা না হলে আমাদের মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। তখন অপুষ্টি থেকেও মানসিক বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কম পুষ্টি সম্পন্ন প্রসেসড খাদ্য বেশি গ্রহণ করা ব্যক্তিদের ডিপ্রেশনে ভুগার সম্ভাবনা প্রায় ৬০%. এক্ষেত্রে কিছু তথ্য মাথায় রাখা উচিত –

* সঠিক পুষ্টি আমাদের দেহের বিভিন্ন ইনফেকশন দূর করে। মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগ ও ইনফেকশন রোধ করে মস্তিষ্ক সুস্থ রাখে।

* খাদ্যের পুষ্টি উপাদান সমূহ আমাদের অন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখে, মস্তিষ্ক সচল রাখে, দেহের সকল কাজ সঠিক ভাবে সম্পন্ন করার জন্য বড় ভূমিকা পালন করে। দেহ সুস্থ সবল থাকলে ডিপ্রেশনের ঝুঁকি কম থাকে।

* আমরা পুষ্টিকর খাদ্য থেকে যে পুষ্টি পাই তা আমাদের দেহের কোষে প্রয়োজনীয় শক্তি যোগায়, আমাদের নার্ভাস সিস্টেম সচল রাখে।

ওমেগা ৩ যুক্ত খাবার বেশি করে খেতে হবে যেমন বিভিন্ন মাছের তেল, বাদাম, ডিম, বিভিন্ন ধরণের বীজ ইত্যাদি। এগুলো সুস্থ ব্রেন ডেভেলপমেন্ট করতে কাজ করে। ভিটামিন বি ও ডি জাতীয় খাবার যেমন মাংস, সবুজ শাকসবজি, সামুদ্রিক খাবার, হোল গ্রেন ফুড, বিভিন্ন ধরণের ডাল মস্তিষ্কের জন্য অনেক উপকারী। সেলেনিয়াম ও ট্রিপ্টোফ্যান সমৃদ্ধ খাবার যেমন আখরোট, ডিম, গরুর মাংস, দুগ্ধজাত খাবার খেতে হবে।
ডিপ্রেশন রোধ করার মতো কিছু খাবার –

১. গাড় সবুজ শাকসবজি : একটি ইনফেকশন রোধী উপাদান সমৃদ্ধ খাদ্য।

২. আখরোট : মেজাজ ভালো করার উপাদান ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড আছে এতে।

৩. মাশরুম : রক্তের অতিরিক্ত সুগার কমাতে সাহায্য করে।

৪. বিভিন্ন ধরনের বেরি যেমন স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, ক্রেন বেরি, রেস্পবেরি ইত্যাদি, এরা কোষ এর ক্ষয়ক্ষতি পূরণের এন্টিঅক্সিডেন্ট আছে।

৫.এভোকাডো : এর অলেয়িক এসিড দেয় ব্রেন পাওয়ার।

৬. পেঁয়াজ : ক্যান্সার প্রতিরোধী উপাদান এলিয়াম সমৃদ্ধ।

৭. টমেটো : ডিপ্রেশন প্রতিরোধক।

৮. বিভিন্ন বিন বা সীমের বীচি : মেজাজের তারতম্য কমায়।

ডিপ্রেশন প্রতিরোধে খাবারের কিছু গাইডলাইন –  

১.হোল গ্রেন অর্থাৎ বেশি আঁশযুক্ত খাদ্য খেতে হবে। যতটা সম্ভব টাটকা খাবার খেতে হবে, বাজারে পাওয়া প্রসেসড ফুড বর্জন করতে হবে।

২.ডিপ্রেশন রোধে দুগ্ধজাত খাবার খুবই উপকারী যেমন দই বা ইয়োগার্ট। এগুলো রেগুলার খেতে হবে। বিভিন্ন গাঁজানো বা ফারমেন্টেড খাদ্যও এক্ষেত্রে অনেক উপকারী।

৩.ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, ভিটামিন ডি, এন্টিঅক্সিডেন্ট এসব জাতীয় খাদ্য যেহেতু ডিপ্রেশন রোধী তাই এদের বেশি খেতে হবে। তবে প্রাকৃতিক ভাবে পাওয়া খাদ্য থেকে এদের গ্রহণ করলে সর্বোত্তম হয়। সাপ্লিমেন্টস গ্রহণ করার আগে চেষ্টা করতে হবে যতটুকু সম্ভব দৈনিক আহারের মাধ্যমে এগুলো গ্রহণ করা। প্রতিদিন রোদে বের হয়ে ঘুরাঘুরি করলে, মুক্ত বাতাসে হাঁটলে ডিপ্রেশনের মাত্রা কমে আসে।

৪.কিছু খাদ্য ডিপ্রেশন বাড়ায় যেমন এলকোহল, ক্যাফেইন বা কফি, অতিরিক্ত চিনি। ক্যাফেইন ঘুম কমিয়ে দেয়, অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। এলকোহল আমাদের নার্ভাস সিস্টেমের জন্য ক্ষতিকর যা ডিপ্রেশন তৈরি করে। অতিরিক্ত চিনি আমাদের দেহের ব্লাড সুগার বাড়িয়ে দেয় যা বিভিন্ন ইনফ্ল্যামেশন থেকে সুস্থ হতে ব্যাঘাত ঘটায়। এই খাবার গুলো অবশ্যই বর্জন করতে হবে।

ডিপ্রেশন একটি জটিল মানসিক অবস্থা, এটি সম্পূর্ণ নির্মূল করতে হলে অনেক গুলো ধাপ পার হতে হয়। চিকিৎসার সাথে সাথে এই ধরণের খাদ্যাভ্যাস তৈরি করা গেলে ডিপ্রেশন দূর করা অনেকটাই সহজ হয়। আর যারা ডিপ্রেশনের ঝুঁকিতে আছেন তারা আগে থেকেই সতর্ক হয়ে এই খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনধারা নিয়ে চললে ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হবেন না। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা একে অপরের উপর নির্ভরশীল, শরীর সুস্থ থাকলে মনও ভালো থাকবে।

লেখক –

আনিকা জাহিন ত্রনি

খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান।

6,967 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *