নবজাতকের ছোট-বড় স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর লক্ষণ এবং করনীয় 


শিশুর আগমন

গৃহে একটি নতুন শিশুর আগমন বড়ই আনন্দদায়ক। এই ছোট শিশুটিই সকল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু-সকল মনোযোগ ও আলোচনার বিষয়বস্তু। মা বাবার জীবনে এটি একটি গৌরবময় এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বাবা মা আত্মীয়-স্বজন,প্রতিবেশী সবাই অপেক্ষায় থাকেন তাদের শিশুটি কবে বড় হবে। কিন্তু নবজাত শিশুটি বড় দুর্বল, অসহায় আর পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। তাই আপনার শিশু অসুস্থ থাকে তখন এটা অনেক কষ্টকর হয় যখন। তারা শারীরিকভাবে একটু অস্বাভাবিক হলেই পরিবারের প্রত্যেকেই দুশ্চিন্তার স্বীকার হন। তাই তাদের সুন্দরভাবে বড় করে তুলতে হলে প্রয়োজন মা বাবা সহ পরিবারের প্রত্যেক সদস্যদের দরকার অনেক সচেতনতা আর বিশেষ যত্ন।

নবজাতক কারা?
যে শিশু এই মাত্র জন্মগ্রহণ করল তাকে সদ্যোজাত নবজাতক বলা হয়। জন্মগ্রহণের পর প্রথম দুই সপ্তাহ সময় হচ্ছে নবজাতক কাল।  নতুন পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে প্রথম সপ্তাহে শিশুর ৫-১০% ওজন হ্রাস পায়। শিশুর জন্মের পর প্রথম বছরই শিশু মৃত্যু হার সবচেয়ে বেশি থাকে। প্রতি ১০০০ জনে ১৪-২২ জন মারা যায়। এর মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ মারা যায় জন্মের প্রথম সপ্তাহে। তাই জীবনের প্রথম দুই সপ্তাহ (নবজাতক কাল) শিশুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সদ্যোজাত শিশুর কিছু ছোট-বড় বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন-

.শ্বাস-প্রশ্বাসে: অনেক সময় সদ্যপ্রসূত শিশুর মুখ ও নাকে শ্লেষ্মা এবং অন্যান্য পদার্থ জমে শ্বাস-প্রশ্বাসে বাঁধার সৃষ্টি করে সর্দি জমে থাকলে শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয় ফলে বুক ঘন ঘন ওঠানামা করে ও শিশু ক্লান্ত হয়ে পরে

সমাধান- বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাহায্যে সাকার মেশিন দিয়ে নবজাতকের নাক ও মুখ পরিষ্কার করতে হবে পরবর্তীতেও নবজাতকের নাক পরিষ্কার রাখতে হয়   

.জ্বর: নবজাতকের শরীরের তাপমাত্রা সাধারণত (৩৬.৩৭.) ডিগ্রি সেলসিয়াস এর মধ্যে থাকে জন্মের পর পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা ১০২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে কিন্তু কোন কারণে (জলবায়ু,আবহাওয়া ও ঋতু পরিবর্তন) যদি শিশুর দৈহিক তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয় এবং শিশুর জ্বর (দেহে সংক্রমণ) হয়।

সমাধান- জ্বর কম হলে বাচ্চাকে মায়ের বুকের দুধ বার বার দিতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে। কারণ নবাজাতকের জ্বর মানেই হল শিশু কোন জীবাণু দিয়ে সংক্রমিত হয়েছে এবং অবস্থা খারাপ হবার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে।  

.জন্ডিস: জন্ডিস কোন রোগ নয় অন্য রোগের বিশেষ করে লিভারের রোগের লক্ষণ হিসেবে জন্ডিস দেখা দেয় জন্ডিসকে বাংলায় পান্ডুরোগ বলা হয় জন্ডিস হলে রক্তে বাইল পিগমেন্টের পরিমাণ বেড়ে যায়, এর জন্য চোখের সাদা অংশ ও শরীর হলুদ হয় শিশু জন্মগ্রহণের কয়েকদিনের (/) মধ্যে জন্ডিস দেখা দিতে পারে এসময় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব জরুরী  জন্মগ্রহণের পর যে সকল কারণে জন্ডিস দেখা দিতে পারে সেগুলো হলো-

(ক) ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিসঃ জন্মগ্রহণের পর প্রায় নবজাতক সাধারণত ফিজিওলজিক্যাল/ শরীর বৃত্তীয় জন্ডিস হয়ে থাকে একে নির্দোষ জন্ডিস/ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস বলা হয়।   
() মা ও শিশুর রেসাস গ্রুপের (Rh-factor) অসঙ্গতি
() কম ওজনের শিশু।
() প্রিটার্ম বেবী।      
() লিভারের প্রদাহ, পিত্ত নালী বন্ধ থাকা।   
() জন্মকালীন অক্সিজেনের অভাব
() মাতৃগর্ভে থাকাকালীন হেপাটাইটিস বি, রুবেলা, সিফিলিস, হারপিস, সেপটিসেমিয়া ইত্যাদি থাকলে শিশুর রক্তের লোহিত কণিকা ভেঙ্গে যায় ফলে জন্ডিস হয়।

সমাধান- ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস হলে নবজাতককে সকালের নরম রোদে খালি গায়ে প্রতিদিন আধা ঘন্টা করে রাখতে হয়অন্যান্য  ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

.ডায়রিয়া: সাধারণত ২৪ ঘন্টার মধ্যে তিন বা ততোধিকবার পাতলা পানির মত মল ত্যাগ করাকে ডায়রিয়া বলে। ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে পানি ও লবণ মলের সাথে বের হয়ে যায়। ফলে রক্তে পানির পরিমাণ কম দেখা দেয়। পানিশূন্যতা বেশি হলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। কিছু লক্ষণ দেখা দেয় সেগুলো হল:

-মাথার তালু ডেবে যায়।
-অস্থির ও খিটখিটে ভাব
-চোখ বসে যায়, চোখের পানি কমে যায়। মুখ ও জিহ্বা শুকিয়ে যায়।
-পেটের চামড়া টেনে পরে ছেড়ে দিলে ভাজ পরে এবং ভাজ মিশে যেতে বা স্বাভাবিক হতে সময় লাগে।
-প্রসাব একেবারে কম হয়।
-নিস্তেজ ও অবসন্ন দেখায়।
-রক্ত চলাচল কমে যায় ফলে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

কি কি কারণে শিশুর ডায়রিয়া হতে পারে একনজর দেখে নিই-

(ক) জীবাণুর আক্রমনজনিত কারনে- ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া, প্রটোজোয়া, কৃমি ইত্যাদি।
(খ) অন্যান্য রোগের কারণে- ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ব্রঙ্কোনিউমোনিয়া, জ্বর, কানের সংক্রমণ ইত্যাদি।
(গ) ঔষধের পার্শপ্রতিক্রিয়া।
(ঘ) বদহজমজনিত ডায়রিয়া, পুষ্টিহীনতা ইত্যাদি।

সমাধান: ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি খাবার স্যালাইন দিতে হবে। পরবর্তীতে শিশুর খাবার  এবং পানি যেন নিরাপদ হয় সেদিকে যত্নবান হতে হবে।

.নিউমোনিয়া (Pneumonia): শীতকাল শুরুর প্রথমদিকে ও শেষদিকে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেশি থাকে। নিউমোকক্কাস (Pneumococcas) নামক জীবাণু দ্বারা ফুসফুস আক্রান্ত হলে এই রোগের সৃষ্টি হয়। এ জীবাণু গলা হতে ফুসফুসে গিয়ে আক্রমণ করে।

–হঠাৎ জ্বর উঠে। কাশি ও বুকে ব্যথা হয়।
–ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস নিউমোনিয়ার অন্যতম লক্ষণ। শ্বাস নেওয়ার সময় গলায় কর্কশ গড় গড় শব্দ হয়।    আক্রান্ত শিশুর মুখের দিকে তাকালে শ্বাসকষ্টের লক্ষণ প্রকাশ পায়।
–কানের লতি,নাকের ডগা ও হাতের নখ নীলাভ হয়।

সমাধান: রোগের লক্ষণ বুঝতে পারার সাথে সাথে শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।এ সময় শিশুর স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতনতা আবশ্যক।

.হুপিংকফ (Whooping Cough): যেকোন বয়সের শিশু এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। হুপিংকফ একটি সংক্রামক ব্যাধি। হেমোফেলাস পারটিউসিস (Heamophalus pertusis) নামক জীবাণু দ্বারা এ রোগ হয়। প্রথমে কেয়কদিন সর্দি কাশি ও জ্বর থাকে। জ্বর (৯৯-১০০)ডিগ্রি হতে পারে। কাশতে কাশতে বমি হয়ে যায়। নাক, মুখ ফুলে যায় ও চোখ রক্তবর্ণ হয়ে যায়। বারবার বমি হওয়ার ফলে শিশু কৃশ ও দুর্বল হয়ে যায়। এই রোগ সংক্রমিত ব্যক্তির কাছ থেকে জীবাণু ছড়ায়। কাজেই অসুস্থ ব্যক্তির কাছে নবজাতককে দেবেন না।

সমাধান: শিশুর তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শিশু জন্মের পরপরই কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ডি.পি.টি.( D.P.T. = Diphtheria, Pertussis or Whooping Cough and Tetanus) নামক টীকা দিতে হবে।

শিশুর হাম

. হাম (Measles): হাম ভাইরাস সংক্রামক রোগ। সাধারণত রোগীর হাঁচি, কাশি, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে রোগটি ছড়ায়। শীত ও বসন্তকালে এই রোগ বেশি দেখা যায়। কপালে যেখানে শিশুর চুল উঠা শুরু হয় ঐ স্থানে ও কানের পেছনে প্রথম র‍্যাশ বা ইরাপশন দেখা দেয়। ১ দিনের মধ্যে হাত, পা, গলা ও সমস্ত শরীর ছড়িয়ে পড়ে। র‍্যাশ ছোট ছোট লাল ঘামাচির মতো হয়। অনেকগুলো র‍্যাশ মিলে বড় লাল চিহ্নের সৃষ্টি হয়। এ রোগের জটিলতায় নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কো-নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মেনিনজাইটিস হতে পারে।

সমাধান: হামের বিশেষ কোন চিকিৎসা নাই। হাম হলে শিশুকে বিশ্রামে রাখতে হবে। পানি ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ  নিতে হবে। হামের টিকা দিতে হবে।

. পায়খানা ও প্রস্রাব না করা: সদ্যোজাত শিশু২৪ ঘণ্টার মধ্যে পায়খানা ও প্রস্রাব করবে এটাই স্বাভাবিক। যদি না করে তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

নবজাতকের চোখে অতিরিক্ত পিচুটি

. চোখের সংক্রমণ: অনেক নবজাতকের চোখ থেকে বেশি পানি পড়ে এবং ঘুমালে পিচুটি দিয়ে  চোখ বন্ধ হয়ে যায়।  একে New born conjunctivitis বা সহজ বাংলায় বলে চোখ ওঠা। চোখের সাধারণ সংক্রমণ পরিষ্কার কাপড় হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে চোখ মুছে পরিষ্কার রাখতে হয়।

বাবা-মায়ের যৌনব্যাধি থাকলে নবজাতকের গণোকাক্কাস কনজাংটিভাইটিস হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সুষ্ঠু চিকিৎসা না হলে শিশু অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

১০. নাভী সংক্রমণ: নবজাতকের নাভী জীবানু দ্বারা  সংক্রমিত হতে পারে। এই ক্ষেত্রে সার্জিক্যাল স্পিরিট। কুসুম গরম পানি দিয়ে নাভি পরিষ্কার করতে হয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়।

১১. কানের সমস্যা: প্রস্রবের সময় রক্ত, নিকোনিয়াম ইত্যাদি নবজাতকের কানে প্রবেশ করতে পারে এবং পরবর্তীতে শুকিয়ে ব্যথার উদ্রেক করে। আবার বুকের দুধ কানে ঢুকে মধ্যকর্ণে প্রবেশ করে প্রদাহ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

১২. দেহের তাপ কমে যাওয়া: দেহের তাপ কমে যাওয়াও সংক্রমণের লক্ষণ। এই ক্ষেত্রে গরম কাপড় জড়িয়ে, রুম হিটার ব্যবহার করে উষ্ণতা বৃদ্ধির চেষ্টা করতে হবে ও সত্ত্বর চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

১৩. বমি: ঢেঁকুর তোলার সময় পাকস্থলীর বাতাসের সাথে গলা দিয়ে অনেক সময় দুধ বের হয়ে আসে। এটা স্বাভাবিক। বারবার বমি করলে, লালা নির্গত করলে, কাশির উদ্রেক ও শ্বাসকষ্টের লক্ষণ থাকলে যথাশীঘ্র চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

১৪. খিঁচুনি: নবজাতকের খিঁচুনি মারাত্মক উপসর্গ। জন্মের পর ১/২ দিনের মধ্যে খিঁচুনি হলে মেনিনজাইটিস, ধনুষ্টংকার ইত্যাদির লক্ষণ। আবার রক্তে শর্করা বা ক্যালসিয়ামের স্বল্পতা খিঁচুনির কারণ হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করা আবশ্যক।

১৫. অনিদ্রাঃ  নবজাতক বাচ্চা কিছুক্ষন পর পর ঘুমায়। এই ঘুম ১.৩০ থেকে ২ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। অনেক সময় বাচ্চার শোবার পজিসন ঠিক না থাকলে বাচ্চা ঠিক ভাবে ঘুমাতে পারেনা। আবার ডায়াপার ভেজা থাকলেও বাচ্চা ঘুমাতে পারেনা। অনেক সময় সর্দি লেগে শ্বাস নিতে সমস্যা হলেও বাচ্চা ঘুমানোর ২০মিনিটের মধ্যে জেগে যায়। এই সব ব্যাপারে যত্ন সহকারে লক্ষ্য রাখতে হবে।

১৬. দুধপানে অনিচ্ছাঃ শিশুর পেটে গ্যাস, সর্দি থাকলে অথবা মা যদি রিলাক্স  না থাকেন তাহলে বাচ্চা দুধ খেতে অনিহা প্রকাশ করে। 

১৭. অতিরিক্ত কান্নাঃ শিশুর  বদহজম, পেটে গ্যাস, সর্দি  অথবা ঘুমে ব্যাঘাত হলে অথবা মায়ের ঘুম কম হলে শিশুর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং শিশু অতিরিক্ত কান্না করে। এ ব্যাপারে পরিবারের সকলকে সচেতন থাকতে হবে।

আপনার আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক। বারবার শিশু যদি রোগে আক্রান্ত হয় তবে তার বিকাশ  বাধাগ্রস্থ হবে। তাই আপনার শিশুর সুষ্ঠু বিকাশের জন্য উপযুক্ত যত্ন ও পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে করতে হবে এবং অবশ্যই মা-বাবাসহ পরিবারের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

লেখক-
আছিয়া রহমান মীম
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ।

8,425 total views, 6 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *