নবজাতকের জন্ডিস – কখন সতর্ক হবেন?

জন্ডিস কথাটা শুনলেই আমাদের প্রত্যেকের কেমন যেন একটা ভয় কাজ করে এবং সেটা যদি হয় নবজাতকের, তাহলে তো বাবা-মার চিন্তার শেষ থাকেনা। সবার মনে একই ধরনের প্রশ্ন- ‘জন্ডিস ও নবজাতকের জন্ডিস একই রকমের ক্ষতিকর কিনা’, ‘সুস্থ্ হতে কতদিন লাগে’, ‘মায়ের বুকের দুধ খাওয়া যাবে কিনা?’ ‘কিভাবে এর প্রতিকার করা যাবে?’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আসুন নবজাতকের জন্ডিস নিয়ে অজানা তথ্যগুলো জেনে নেই।

নবজাতকের জন্ডিসঃ
মানব শরীরে প্রতিনিয়ত লোহিত রক্ত কণিকা গঠিত হয়,আবার ১২০ দিন পর পর ভেঙে যেয়ে নতুন ভাবে  তৈরি হয়। এই ভেঙে যাওয়া লোহিতকণিকা পরিণত হয় ‘বিলিরুবিন’ নামের হলুদ রঙের একটি পদার্থ বের হয়। লিভার এই পদার্থটিকে ভাঙ্গতে সহায়তা করে যাতে এটি মলের মাধ্যমে দেহ হতে দূর হতে পারে। আর যখন এটি দেহ হতে নিঃসৃত হতে পারে না রক্তে এর লেভেল অধিক হয়ে যায় তখনই জন্ডিস দেখা যায়। আর এমন ঘটনা যখন একটা নবজাতকের ক্ষেত্রে হয় তখন একে জন্ডিস বলা হয়।

নবজাতকের জন্ডিসের লক্ষণ:
→হাত, পা, মুখ, চোখের ভেতরের সাদা অংশ প্রস্রাবের রং হলুদ হয়ে যাওয়া,
→জ্বর জ্বর ভাব থাকতে পার্‌
→অসুস্থ দেখায়,
→বাচ্চা খেতে চায়না এবং
→দুর্বল হয়ে থাকে।

নবজাতকের জন্ডিসের কারণসমূহঃ
শিশুর জন্মের পর শিশুর বিলিরুবিনের মাত্রা একটু বেড়ে যাবে এটা খুবই স্বাভাবিক। যখন শিশু মায়ের গর্ভে বড় হতে থাকে, তখন প্লাসেন্টা শিশুর দেহ থেকে বিলিরুবিন দূর করে। প্লাসেন্টা (গর্ভ ফুল)  এমন একটি অঙ্গ যা শিশুর খাদ্য গ্রহণের জন্য গর্ভাবস্থায় বৃদ্ধি পায়। জন্মের পরেই লিভার কাজ শুরু করে। শিশুর লিভার দক্ষতার সাথে সক্ষম হয়ে কাজ করতে কিছু সময় নিতে পারে। আর এই সময়ের মধ্যেই শিশুর দেহের রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে জন্ডিস দেখা দিতে পারে।স্বাভাবিকভাবে রক্তে 2 mg/dc বিলিরুবিন থাকে। কিন্তু যখন বিলিরুবিনের পরিমাণ 5mg/dc হবে তখনই জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দেবে।ফুল টার্ম শিশুদের থেকে যেসব শিশুরা শীঘ্রই জন্মগ্রহণ করে (premature) তাদের জন্ডিসের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এছাড়া নবজাতকের জন্ডিস এর অন্যতম কারণ হতে পারে-
>কিছু ঔষধ
>জন্মের সময় উপস্থিত সংক্রমণ, যেমন-রুবেলা,সিফিলিস এবং অন্যান্য
>লিভার বা Biliary tract এর প্রভাবিত রোগ= যেমন হেপাটাইটিস, লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার ইত্যাদি রোগের লক্ষণ হিসেবে জন্ডিস দেখা দেয়,
>কম অক্সিজেন মাত্রা-=শিশুর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে কম হলে জন্ডিস হতে পারে,
>সংক্রমণ(Sepsis)=অন্য কোনো রোগের সংক্রমণ হিসেবে জন্ডিস দেখা দিতে পারে,
> বিভিন্ন ধরণের জেনেটিক অথবা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অসংঙ্গতি।

নবজাতকের জন্ডিসের প্রকারঃ
অধিকাংশ নবজাতকের ত্বক হলুদাভ থাকে অর্থাৎ জন্ডিস হয়ে থাকে। এটাকে বলে ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস। এটা বেশির ভাগ দেখা যায় যখন শিশুর বয়স ২-৪ দিন হবে। অধিকাংশ সময়ে এটা সমস্যা তৈরি করে না এবং দুই সপ্তাহের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায়। যে সকল শিশু মায়ের বুকের দুধ পান করে তাদের দুই ধরণের জন্ডিস হতে পারে। উভয়ই সাধারণত ক্ষতিকর নয়। এগুলো হল-

  • ) (Breast-feeding Jaundice) ব্রেস্টফিডিং জন্ডিসঃ

বুকে দুধ খাওয়ানো শিশুদের মধ্যে প্রথম সপ্তাহে এটা দেখা যায়। ব্রেস্টফিডিং জন্ডিস হবার প্রধান কারণ হলো শিশুরা ভালোভাবে দুধপান করতে না পারা অথবা মায়ের বুকের দুধ ধীর গতিতে আসা।

  • ) (Breast Milk Jaundice) ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস:
    সুস্থ শিশুদের জন্মের এক সপ্তাহ পরেও এই জন্ডিস হতে পারে। ১ মাস পর্যন্ত এই জন্ডিস কম পর্যায়েই থাকতে পারে। এটি নির্ভর করে একটি বিষয়ের উপর সেটা হলো বুকের দুধের উপাদানগুলো কিভাবে বিলিরুবিনের ভাঙনকে প্রভাবিত করে। এই ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস, ব্রেস্টফিডিং জন্ডিস থেকে আলাদা।

অপর যে ধরনের জন্ডিসগুলো কখনো কখনো গর্ভবতী মা(বংশগত বা ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া জনিত কারন) থেকে নবজাতক শিশুর হতে পারে এগুলো আসলে অন্যান্য কিছু রোগের লক্ষণ।-

ক) রক্তকোষ এর অস্বাভাবিক আকৃতি (sickle cell anemia): এই সমস্যায় রক্তের লোহিত কণিকার আকৃতি অস্বাভাবিক হওয়ায় লোহিত কণিকা বেশিদিন স্থায়ী হয়না  এবং দ্রুত ভেঙে যায়। তাই বিলিরুবিনও বেড়ে যায়, দেখা দেয় জন্ডিস।

খ) অধিক সংখ্যক রক্ত কণিকার ভাঙ্গনঃ কোন কোন রোগে রক্তের লাল কণিকা অধিক পরিমাণে সৃষ্টি হলে বাইল পিগমেন্ট ও বেশি পরিমাণে তৈরি হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাইল পিগমেন্ট(পিত্তরস) এর কারণে জন্ডিস সৃষ্টি হয়।

গ) থ্যালাসেমিয়াঃ এই রোগে দেহে অতিরিক্ত আয়রনের উপিস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্লীহা বড় হয়ে যায় এবং যকৃতের কাজ করার হার বেড়ে যায়। ফলে পিত্তরসও অধিক নিঃসৃত হয় যাতে বিলিরুবিন থাকে। ফলে জন্ডিস দেখা দেয়।

ঘ) পিত্ত নির্গমণের পথে বাধা তৈরি হলে পিত্ত ক্ষুদ্রান্তে যেতে ব্যর্থ হয় তখন ক্রমে রক্তে মিশে যায় এবং চোখ, হাতের তালু, গায়ের রং,প্রস্রাবের রং হলুদ হয়ে যায় এবং জন্ডিস হয়।

ঙ)মা শিশুর রক্তের ধরণ অসম্পূর্ণ (Rh অসঙ্গতি): মায়ের রক্তের গ্রুপ যদি পজিটিভ হয়, আর শিশুর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হলে অথবা মায়ের রক্তের গ্রুপ ‘এ’ পজিটিভ, আর শিশুর ‘বি’ পজিটিভ হলেও সেই শিশুর জন্ডিস দেখা দেয়।

চ)একটি জটিল ডেলিভারির মাধ্যমে নবজাতকের মাথার খুলির (Cephalohematoma) নিচে রক্তপাত ঘটলে।

ছ)এছাড়া ইনফেকশন, নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন(এনজাইম) এর অভাব, মায়ের ডায়াবেটিস হলে, লাল রক্তকোষের উচ্চমাত্রা যা যমজ বাচ্চা এবং Small-for-gestational age (SGA) এর ক্ষেত্রে হতে পারে যার কারনে জন্ডিস হতে পারে।

নবজাতকের জন্ডিসের প্রতিকারঃ
আপনার শিশুর জন্ডিস  হলে ডাক্তার ডাকার পাশাপাশি আর কি করবেন তা একটু জেনে নিন-
*যখন শিশুকে অসুস্থ দেখায়, কিছু খেতে চায়না, ঘুমিয়ে আছে বলে মনে হয় অথবা শিশুর শরীরের তাপমাত্রা 38 ডিগ্রি  সেলসিয়াস হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
*শিশুর শ্বাস নিতে অসুবিধা হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
*যেহেতু সূর্যের আলো বিলিরুবিনকে ভাঙতে সহায়তা করে, সেহেতু দিনে দুইবার শিশুকে হালকা রোদে ১০ মিনিট রাখতে হবে যা হালকা জন্ডিস নিরাময়ে সাহা্য্য করবে। তবে সবসময় খেয়াল রাখতে হবে শিশুকে কড়া রোদে বা সূর্যের আলোতে সরাসরি রাখা যাবেনা।
*যদি শিশুর রক্তের বিলিরুবিনের মাত্রা বেশিই বেড়ে যায় তখন শিশুকে বিশেষ এক ধরণের আলোতে রাখা হয় এটাকে বলা হয় ফটোথেরাপি।

সাধারন জন্ডিস এর মাত্রার উপর নির্ভর করে এর ভয়াবহতা। সহনীয় মাত্রার উপরে যাকে হাইপার বিলিরুবিনেমিয়া বলে- এটি নিউরোটক্সিক (অর্থাৎ স্নায়ুতে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে) যা নবজাতকের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। এই কারণে নবজাতকের জন্ডিস ঘন ঘন দেখা দিলে ডায়াগনোসিস করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। নবজাতকের প্রতি আমাদের সকলের খেয়াল রাখা জরুরি, কেননা আজকের শিশুটি আগামীর ভবিষ্যৎ।

 

 

লেখক-
আছিয়া মীম
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ।

 

সম্পাদনায়-
তামান্না তাহসিন আহমেদ,
শাহরুখ নাজ রহমান
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ।

 

3,866 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *