শিশু মোটা মানেই কি স্বাস্থ্যবান !!!

কিছুদিন আগে ফেসবুকের একটি পোস্ট দেখে অনেকেরই টনক নড়ে উঠলো।সেখানে এমন কিছু লিখাছিল যে এক ৭.৫ মাসবয়সী শিশু দেখতে বেশ ভালো স্বাস্থ্যবান।স্বাস্থ্যবান বলতে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ যা বুঝে তাহল ফোলা নাদুসনুদুস শরীর।

কিন্তু বাচ্চাটির ঘন ঘন অসুখ হচ্ছে, জ্বর,কাশি, স্কিন এর সমস্যা একটার পর একটা চলছেই।

এখন ভাবছেন কি সমস্যা বাচ্চাটির? আসলে দেখতে সুস্থ ও নাদুসনুদুস হলেও সে ভুগছিল প্রোটিনের অভাবে।

এখন ভাবছেন কি সমস্যা ছিল বাচ্চাটির? আসলে দেখতে সুস্থ ও নাদুসনুদুস হলেও সে ভুগছিল প্রোটিনের অভাবে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মা বাবা ভাবেন দেখতে মোটাসোটা হলেই বুঝি বাচ্চা সুস্থ, কিন্তু এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। তারা ৬ মাস বয়স থেকেই বাচ্চাদের সুজি, বার্লি, সেরেলাক খাইয়ে বড় করে তুলেন। এসব খাবার পুরোটাই হল শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট, এর মধ্যে আর অন্যান্য ধরনের পুষ্টি উপাদান নেই বললেই চলে। শুধু এ ধরণের খাবার গুলো নিয়মিত খেতে থাকলে শিশুর দেহে অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয়, বিশেষ করে প্রোটিন ও বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন। এসময় দেহে বিভিন্ন ধরণের সমস্যার সৃষ্টি হয় যা শিশুর জন্য অনেক ক্ষতিকর।

প্রোটিন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? প্রোটিন হল কার্বোহাইড্রেট এবং ফ্যাটের পাশাপাশি খাদ্যের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের মধ্যে একটি উপাদান যা আমাদের সকলের দেহ গঠনে প্রয়োজন। আমরা কিছু খাবার থেকে প্রোটিন পাই যা আমাদের দেহ অ্যামিনো এসিড নামক ছোট যৌগসমূহের রূপে হজম ও শোষিত হয়। অনেক ধরণের অ্যামিনো অ্যাসিড আছে কিন্তু আমাদের দেহ হাড়, পেশী, রক্ত, ত্বক, চুল এবং অঙ্গগুলি বিকাশ এবং সুস্থতা বজায় রাখার জন্য কেবল তাদের মধ্যে ২২ টি ব্যবহার করে। এদের মধ্যে ১৩ টি আমাদের দেহে তৈরী হয় আর বাকি ৯ টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন মাংস, ডিম, দুগ্ধজাত দ্রব্য এবং মটরশুঁটি ইত্যাদি থেকে আমরা পেয়ে থাকি। এসকল খাদ্যের ঘাটতি হলে দেহ প্রোটিনের অভাবে ভুগে যাকে আমরাকোয়শিওরকর রোগ বলেথাকি।

শিশুর দেহে প্রোটিন প্রয়োজনীয়তা বয়স অনুযায়ী আলাদা। জীবনের প্রথম বছরে, শিশুদের দৈহিকভাবে ৯ থেকে ১১ গ্রাম প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। ১ থেকে ৮  বছর বয়সে দৈনিক প্রোটিন প্রয়োজনীয়তা ১৩ থেকে ১৯ গ্রামের মধ্যে রয়েছে। বাল্যকাল ও বয়ঃসন্ধিকালের বয়সের প্রতি স্তরে প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের পরিমাণ আস্তে আস্তে বৃদ্ধি করতে হয়। শিশুর দেহে সাধারণত উপকারী প্রোটিন ঘাটতি এবং উচ্চ কার্বোহাইড্রেট গ্রহনের জন্যকোয়াশিওরকররোগ দেখা যায়। এর মূল কারণ হল সঠিক পুষ্টি সম্পর্কে মা বাবার অজ্ঞতা এবং দারিদ্র্যতা।

কিছু কিছু লক্ষণ দ্বারা বুঝতে পারবেন কোন শিশু প্রোটিনের অভাবে ভুগছে কিনা। যেমন –

১. শিশুর শরীরে ফোলা ভাব দেখা দেওয়া, তার শরীরে পানি জমতে শুরু করা।

২. শিশুর পেট ফুলে যায়। গাল, মুখ ফুলে যায়। মুখ চাঁদের মতো গোল হয়ে যায়।

৩. ত্বক, চুল, নখ শুস্ক ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। চুল অনেক পাতলা ও লাল বাদামী হয়ে যেতে থাকে, ত্বকের শুস্কতার কারণে ত্বক লালচে ভাব দেখা দেয় ও শুকনো চামড়া উঠে, নখ ভেংগে যায়।

৪.দেহের মাংস পেশীর পরিমাণ কমে যেতে থাকে।

.শিশুর দেহের হাড়ের গঠন ক্ষতিগ্রস্থ হয় যার কারণে হাড় ভেংগে যাওয়ার প্রবনতা বেড়ে যায়।

৬. শিশুর দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এতে করে শিশুর দেহে রোগজীবানু সহজে আক্রমণ করতে পারে, শিশু অনেক জলদি অসুস্থ হয়ে পড়ে। দেহের বিভিন্ন ক্ষত বা ইনফেকশন কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগে।

. শিশুর দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যহত হয় প্রোটিনের অভাবে, একারনে শিশু তার বয়সের তুলনায় স্বাভাবিক উচ্চতা লাভ করে না যার ফলে শিশু খাটো হয়ে থাকে।

৮. শিশু অনেক বেশি ক্ষুদার্ত বোধ করে, তার খাওয়ার চাহিদা অনেক বেশি বেড়ে যায়।

৯. শিশু স্বাভাবিক খেলাধুলা করতে চায় না।

১০. শিশুর দেহে ফ্যাটি লিভার রোগ দেখা দেয়। এতে করে লিভার ফুলে যায়, পেট ও ফুলে যায়।

১১.শিশুর মধ্যে রোষ প্রবণতা দেখতে পাওয়া যায়। কোনো কিছুতে খুব দ্রুত বিরক্ত হয়ে পড়ে।

১২.শিশু অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং বিষণ্ণতায় ভোগে সর্বোপরি খুব বেশি সক্রিয় থাকতে পারে না সচরাচর।

কোন শিশুর দেহে যখন প্রোটিনের অভাব জনিত সমস্যা গুলো দেখা দিবে তখনি তাকে সঠিক পরিমাণ প্রোটিন জাতীয় খাবার দিয়ে সুস্থ করে তুলতে হবে। তা না হলে এই প্রোটিনের অভাবে শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। শিশুর দেহে যাতে প্রোটিনের অভাব না সেজন্যে সলিড খাবার গ্রহণ করা শুরু করলে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের পাশাপাশি তাকে পরিমাণ মতো প্রোটিন জাতীয় খাবার নিয়মিত খাওয়ানো উচিত। প্রোটিনের অভাব হলেও কিছু প্রোটিন জাতীয় খাবার সঠিক পরিমাণে দিয়ে দিয়ে শিশুকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

 

কিছু প্রোটিন সমৃদ্ধ শিশুখাদ্য হল

১. মটরশুটি এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল দিয়ে তৈরি খাবার যেমন খিচুড়ি, ডাল ভুনা, মটরশুঁটির তরকারী যা ভেজিটেরিয়ান প্রোটিনের অন্যতম উৎস।

২. গরুরমাংস লোহা, দস্তা এবং উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ। তবে গরুর মাংস শিশুদের জন্য প্রোটিনহিসেবেখুববন্ধুসুলভ খাদ্যনয়। কারণ এটি শিশুদের পাকস্থলীতে সহজে হজম হয়না। তাই ধীরে ধীরে শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভালো করে রান্না করা গরুর মাংস দিয়ে অভ্যাস করাতে হবে।

৩. মুরগীর মাংস শিশুদের জন্য প্রোটিনের একটি ভালো উৎস। ছোট টুকরা করা মুরগীর মাংস ভালো করে সিদ্ধ করে রান্না করে বিভিন্ন সবজি ও আলু দিয়ে পরিবেশন করা যায় শিশুদের কাছে। এছাড়া স্যান্ডউইচ, চিকেন রোল ইত্যাদি তৈরি করে দেওয়া যায়।

৪.বাদাম এবং দই হতে পারে শিশুর জন্য অন্যতম প্রোটিনের উৎস।শিশুর জন্য যে সেমাই বা পায়েস রান্না করা হচ্ছে তাতে বাদাম গুড়ো করে দিয়ে শিশুকে বাদাম খাওয়ানো যায়।আবার দই রুটিও খাওয়ানো যায়।

৫. মাছওমেগা-3 ফ্যাটি এসিডের প্রধান উৎস গুলোর মধ্যে একটি। মাছ শিশুদের জন্য অবিশ্বাস্যভাবে স্বাস্থ্যকর কারণ এটি সহজে হজম হয় এবং ভালো পরিমাণ প্রোটিন পাওয়া যায় এটি থেকে। মাছ আঙুল দিয়ে নরম করে কাঁটা ছাড়িয়ে শিশুকে খেতে দেওয়া যায়। শিশুদেরজন্যশিংমাছবেশকার্যকরীহতেপারে।

৬. শিশুর ৬ মাসের পর থেকে ডিমের কুসুম সিদ্ধ করে খেতে দেওয়া যায়। এটি ওমেগা- 3 ফ্যাটি এসিড, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ। বিভিন্ন খাবারের সাথে ডিম যোগ করে খাদ্যের প্রোটিনের মান বাড়ানো যায়। তবে বেশি ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে ডিমের সাদা অংশ এড়ানো উচিত, কারণ এতে তাদের এলার্জির সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুকে বয়স বাড়ার সাথে সাথে আস্তে আস্তে ডিমের সাদা অংশ খাওয়ানোর অভ্যাস করতে হবে। কারণ এটিও প্রোটিনের আরেকটি ভালো উৎস।

৭. যেকোন ধরণের বাদামই প্রোটিন ও ভিটামিন ই এর ভাল উৎস। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে তাদের বাদামে এলার্জির সমস্যা এড়াতে সরাসরি বাদাম খেতে না দিয়ে বিভিন্ন বাদাম থেকে প্রস্তুত করা খাদ্য দ্রব্য দেওয়া যায়। যেমন পিনাট বাটার পাউরুটির সাথে খেতে দিলে শিশুর খাওয়ার রুচি বাড়বে এবং দেহে প্রোটিনের সরবরাহ বাড়বে।

৮. মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুকে ৬ মাস বয়সের পর থেকে দই, পায়েস, ছানা ইত্যাদি দুগ্ধজাত খাবার খেতে দেওয়া যায়। এসব খাবারে প্রোটিন বেশ ভালো পরিমাণে থাকে। দই শিশুর পরিপাক তন্ত্রের জন্য অনেক বেশি উপকারী। তবে শিশুর বয়স ৮ মাসের বেশি হলে পনির খেতে দেওয়া যেতে পারে।

 

শিশুর জন্মের পর থেকে ৬ মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে। ৬ মাসের পর থেকে ভাত, সুজি, রুটি, বার্লি, সেরেলাকের মতো শুধু কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার না দিয়ে সাথে উপরিউক্ত প্রোটিন জাতীয় খাবারও দিতে হবে। শিশুকে সারাদিনে অল্প অল্প করে বারবার খেতে দেওয়া উচিত। তাহলে শিশু প্রোটিনের অভাবে ভুগবে না। তবে কোন শিশু যদি প্রোটিনের অভাবে কোয়াশিওরকর রোগে ভুগে থাকে তাহলে তাকে নিয়ে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও ডায়েটিশিয়ানের শরণাপন্ন হতে হবে। মা বাবার সচেতনতাই পারে শিশুকে প্রোটিনের অভাব বা কোয়াশিওরকর রোগ থেকে রক্ষা করতে।

 

লেখক
আনিকা জাহিন ত্রনি
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ

সম্পাদক –
আয়েশা সিদ্দিকা মারিয়া
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ

 

 

4,227 total views, 4 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *