ডিম সন্দেশ!

ডিম সন্দেশ  অর্থাৎ ডিম নিয়ে জানা অজানা যত তথ্য। তার আগে বলুন তো প্রাচীন সেই ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর “ডিম আগে না মুরগি আগে?” তবে পুষ্টিগত দিক থেকে ডিমই এগিয়ে। ডিম অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি খাদ্য, ডিমের পুষ্টি উপাদান সম্পুর্ন ভাবে শরীরে শোষিত হয়। তাই ডিমকে একটি আদর্শ খাদ্য।

ডিম অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি খাদ্য। ডিম চিনে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কিন্তু প্রতিটি যুগেই কিছু “দুষ্টু বাচ্চা” রয়েছে যারা ডিম খেতে চায় না। তাদেরকে বলছি অন্তত একটিবার হলেও ডিম, টমেটো, ধনেপাতা,  কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ, লবণ দিয়ে অমলেট করে খেয়েই দেখুন নাহ!ডিমকে ভালোবেসে ফেলতেও পারেন আপনি। 

পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই ডিমকে বিভিন্নভাবে প্রস্তুত করে গ্রহণ করা হয়।যেমন:ডিম সেদ্ধ,পোচ,অমলেট,সুফলে,এগ-বেক,ডিম চপ,ডিমের কোরমা,ডিমের হালুয়া,পুডিং, কেক ইত্যাদি।এছাড়াও বিভিন্ন খাদ্যে ডিম দিয়ে তা সুস্বাদু করা হয়। যেমন : স্যুপ, নুডুলস, ফ্রাইড রাইস, চটপটি-ফুসকা ইত্যাদি।

★ডিম কেন খাব

ডিম আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও উৎকৃষ্ট উদাহরণ। প্রতিদিন একটি করে ডিম আমাদের দেহের শক্তি, চোখের দৃষ্টি ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে এবং মজবুত হাড় ও সুস্থ হৃদপিন্ড গড়ে তুলতে সাহায্য করে।ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতেও ডিম সহায়তা করে।

একটি সম্পূর্ণ ডিমে যে পরিমাণ পুষ্টি বিদ্যমান তা মুরগির ভ্রূণের একটিমাত্র কোষকে একটি মুরগির বাচ্চায় রূপান্তরের জন্য যথেষ্ট। একটি ডিমে থাকে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। তার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে ভিটামিন -এ, ভিটামিন -বি২,ভিটামিন-বি৫, ভিটামিন -বি৬, ভিটামিন- বি৯, ভিটামিন-বি১২, ভিটমিন-ডি, ভিটামিন -ই, ভিটামিন-কে, ফলেট, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, জিংক, সেলেনিয়াম, কোলিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ইত্যাদি। এছাড়াও ডিম বেশকিছু প্রয়োজনীয় অত্যাবশকীয় উপাদান বহন করে যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী এবং অন্য খাদ্যে দুর্লভ। চলুন জেনে নেওয়া যাক –
# প্রোটিন => ডিম প্রাণিজ প্রোটিন হিসেবে উন্নত। আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সকল আম্যাইনো অ্যাসিড ডিমে রয়েছে।

#ভিটামিন -এ => চোখের দৃষ্টি বাড়াতে সাহায্য করে।

# ভিটামিন -বি৯ => ভিটামিন -বি৯ তথা ফলিক অ্যাসিড গর্ভবতী মায়েদের জন্য খুবই প্রয়োজন। যা বাচ্চার ব্রেন গঠনে অপরিসীম ভূমিকা রাখে।

#ভিটামিন-ডি => হাড় ও দাঁত মজবুত করে।

# ভিটামিন-সি => ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ায়।

#ক্যালসিয়াম => হাড় গঠনে ভূমিকা রাখে।

#ফসফরাস => হাড় গঠনে ও মজবুত করণে ভূমিকা রাখে।

#সেলেনিয়াম => রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

#কোলিন => ব্রেন গঠনের সাহায্য করে এবং ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। কোলিন অন্য খাদ্যে দুষ্প্রাপ্য।

একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ দিনে সর্বোচ্চ দুইটি করে ডিম খেতে পারেন। তবে যারা অতিরিক্ত ওজন, ডায়বেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন তাদের উচিত প্রতিদিন একটির বেশি ডিম না খাওয়া,যেখানে সাদা অংশ সপ্তাহে সাত(৭) দিন খেতে পারলেও ডিমের কুসুম সপ্তাহে দুই (২) দিনের বেশি নয়। তবে একেবারেই বাদ দেয়া যাবেনা ডিম। কারণ ডিমে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড যা দেহের ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

★কাঁচা ডিম না সিদ্ধ ডিম

তথ্যমতে, প্রায় একশ বছর আগে থেকে শুরু হয় কাঁচা ডিম খাওয়া। বিশেষত যারা ফিটনেস ট্রেনিং করে শরীরের মাংসপেশী বাড়ানোর জন্য তারা “প্রোটিন শেক” হিসেবে কাঁচা ডিম খায়। কিন্তু তৎকালীন যুগে তা শুরু হয়েছিল ফিটনেস সেন্টার গুলোতে ডিম সিদ্ধ করার সরঞ্জামাদি এবং সময়ের অভাবে যা বর্তমানে ট্রেন্ড হিসেবে চলে আসছে। ছোটবেলায় আমার এক সহপাঠীর চাচা সকালের নাশতায় কাঁচা ডিম গুলিয়ে খেত। এক্ষেত্রে মেয়েটি ধরেই নিয়েছিল ডিম বুঝি এভাবেই খেতে হয় এবং এভাবে তার ডিম খাওয়া সম্ভব না!

আপনি জেনে অবাক হবেন যে,ডিমে বিদ্যমান প্রোটিন আমাদের দেহে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগানোর জন্য তা রান্না হওয়া জরুরী। এক গবেষণায় দেখা যায়, আমাদের শরীর কাঁচা ডিম থেকে মাত্র ৫০ শতাংশ প্রোটিন গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু ঐ একই ডিম সিদ্ধ করলে আমাদের দেহ ৯১ শতাংশ প্রোটিন পায় যা কিনা প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়াও কাঁচা ডিমে থাকে এক ধরনের সালমোনেলা (salmonella) নামের ব্যাকটেরিয়া যা পেটের ক্ষতিকর রোগের জন্য দায়ী।ডিমকে ১৬০ ডিগ্রি তাপে অর্থাৎ ডিমের কুসুম সম্পূর্ণরূপে সিদ্ধ হলে, ডিমের মধ্যে বিদ্যমান এই সালমোনেলা (salmonella) ব্যাকটেরিয়া মারা যায় এবং খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি কমায়।

★ডায়েটে ডিমের কুসুম

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ডিমের কুসুম-ই হলো ওজন কমানোর অন্যতম শত্রু।
ডিম উচ্চ কোলেস্টেরল সম্পন্ন খাদ্য। যার ৯৮% থাকে ডিমের কুসুমে আর বাকি ২% থাকে সাদা অংশে.।একটি ডিম ২১২ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল বহন করে ;যা কিনা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক কোলেস্টেরেল গ্রহণসীমার (২৫০ মিলিগ্রাম) কাছাকাছি।

কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, শত্রু নয় বরং বন্ধু হলো ডিমের কুসুম। কুসুমে বিদ্যমান কোলেস্টেরল আমাদের দেহের জন্য উপকারী। কারণ এটি দেহকে অতিরিক্ত ক্ষতিকর কোলেস্টেরল উৎপাদনে বাধা দেয়।

ডিমে বিদ্যমান যে কোলেস্টেরল আমরা গ্রহণ করি তা আসলে দেহের রক্তে কোলেস্টেরল এর বৃদ্ধি ঘটায় না।  যকৃৎ প্রতিদিন আমাদের দেহে বিশাল পরিমাণে কোলেস্টেরল উৎপাদন করে থাকে।যখন আমরা প্রতিদিন ডিম খাই তখন যকৃত কোলেস্টেরল এর উৎপাদন কমিয়ে দেয়। গবেষণায় পাওয়া যায়, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এর ক্ষেত্রে ডিম কোলেস্টেরল বৃদ্ধিতে কোনো ভূমিকা রাখে না। বাকি ৩০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে ডিম কোলেস্টেরল বৃদ্ধিতে অল্প ভূমিকা রাখে। ডিম আমাদের দেহে উপকারী কোলেস্টেরল(HDL) বাড়ায়। যেসব মানুষের উপকারী কোলেস্টেরল (HDL)বেশী তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি কম।
সকালের নাস্তায় একটি সম্পূর্ণ ডিম আমাদের দেয় (৭০-৮০)ক্যালরী এবং সারা দিনে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ ক্যালরি কম গ্রহণে ভূমিকা রাখে । এতে করে প্রায় দ্বিগুণ ওজন কমানো সম্ভব।

কোলেস্টেরলের পাশাপাশি ডিমে বিদ্যমান ক্যালসিয়াম ও আয়রনের   ৯০% থাকে এই কুসুমে। ডিমের অর্ধেক প্রোটিনও কুসুমে থেকে যায়। ডিমের কুসুম দেহের প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের উৎকৃষ্ট উৎস। এছাড়াও ডিমের কুসুম ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে। ডিমের কুসুমের বিদ্যমান কোলিন(choline) ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি ২৪ শতাংশ কমায় ।ডিম ব্যাতীত অন্য খাদ্যে কোলিন প্রায় দুষ্প্রাপ্য।

★তারুণ্য ধরে রাখতে ডিম

সবাই চায় নিজের তারুণ্য ধরে রাখতে। কে না চায় সুন্দর ত্বক, চুল, নখ। এক্ষেত্রে ডিম উপকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। ডিমে সালফারযুক্ত অ্যামাইনো এসিড এবং অসংখ্য ভিটামিন ও খনিজ লবণ থাকে যা সুস্থ ত্বক ও চুলের জন্য প্রয়োজন।
ডিমে রয়েছে ভিটামিন -ই এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা আমাদের ত্বকের জন্য উপকারী।
ত্বকের কোলাজেন তৈরিতেও ডিম সাহায্য করে।তাই নিয়মিত ডিম গ্রহণ কমিয়ে আনতে পারে আমাদের চেহারা থেকে বয়সের ছাপ,চোখের নিচের ভাঁজ, ত্বকের বলিরেখা প্রভৃতি।প্রতিদিন একটি করে ডিম আমাদের ত্বককে করে তোলে টানটান, মসৃণ এবং উজ্জ্বল। সেই সাথে চুলকে করে তোলে মসৃণ ও মজবুত।

★ডিম সিদ্ধ ও সংরক্ষণের সঠিক উপায়

সিদ্ধ ডিম কেউ কেউ পুরোপুরি সিদ্ধ খেতে পছন্দ করেন। কেউ আবার একটু নরম ডিম খেতে পছন্দ করেন। বিদেশে অনেকেই সকালের নাস্তায় “সফট বয়েলড” ডিম খান টোস্ট এর সাথে যা বরাবরই ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রামিত  হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। পুরোপুরি সিদ্ধ ডিম পেতে হলে ডিমকে ফুটন্ত পানিতে দশ মিনিট ফুটিয়ে নেয়াই যথেষ্ট। অনেকে ডিম অধিক সিদ্ধ করে থাকেন। এতে করে ডিমের কুসুমের চারপাশে একটা সবুজাভ আভা পড়ে, সাথে ডিমের সাদা অংশও রাবারের মতো হয়ে যায় যা স্বাস্থ্যকর নয়।

ডিম সংরক্ষণের জন্য অনেকেই ডিম ফ্রিজের দরজায় রেখে থাকেন। আবার অনেকে ডিম ধুয়ে বাইরেই সংরক্ষণ করেন। ডিম ধুলে ডিমের খোসার উপর থাকা একটা “প্রোটেক্টিভ লেয়ার” ধুয়ে চলে যায়। ফলে ডিমের ভেতর সহজেই অনুজীব প্রবেশ করতে পারে। এক্ষেত্রে ডিম অবশ্যই ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হবে। ফ্রিজে রাখার ক্ষেত্রে ডিমকে বক্সে ভরে ফ্রিজের ভেতরের দিকে রাখতে হবে যাতে তাপমাত্রার পরিবর্তন না ঘটে। একদম টাটকা ডিম ঘরের স্বাভাবিক  তাপমাত্রায় একমাস পর্যন্ত ভালো থাকে। এরপর একে ফ্রিজে আরও এক মাস সংরক্ষণ করা যায়। তবে টাটকা ডিম খাওয়াই ভাল এবং তা সুস্বাদু।

1996 সাল থেকে প্রতিবছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার বিশ্ব ডিম দিবস পালন করা হয়ে থাকে। প্রতিবছর সারা বিশ্বে “বিশ্ব ডিম দিবস” পালন করা হয়ে থাকে ডিম বিষয়ে সচেতনতা ও মানবদেহের জন্য ডিমের গুরুত্ব সাধারণ মানুষের নিকট তুলে ধরার জন্য।

ডিম মূলত, ছোট বাচ্চা, বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর- কিশোরী,গর্ভবতী মা এবং বয়স্কদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি খাদ্য। যদি প্রতিদিন একটি করে ডিম মাথাপিছু নিশ্চিত করা যায় তবে তা একটি সুস্থ সমাজ গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

লেখক
উম্মে সালমা রাখী
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ

সম্পাদনায়
শাহ্রুখ নাজ রহমান
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ

3,305 total views, 4 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *