মেনোপজ

অল্প ঠান্ডাতেই কাঁপতে থাকা মা মধ্যবয়সের শেষে এসে ক’মাস ধরে হালকা ঠান্ডায় ও ফ্যান ছাড়তে
চান। আবার হঠাৎ রাতে ঘামিয়ে জামা ভিজে চুপচুপে হয়ে যায়। চিন্তিত বোধ করছেন? ভয়ের কারন নেই।
এগুলো সবই মেনোপজের লক্ষণ।

মেয়েদের জীবনে মাসিক একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়া । এই প্রজনন প্রক্রিয়ার
কার্যক্রম শুরু হয় বয়ঃসন্ধিকালে সাধারণত : ১০-১৯ বছরের মাঝামাঝি বয়সে।এ সময়ের মধ‍্যে
সাধারণত মেয়েদের প্রথম মাসিক হয়ে থাকে,আর যখন মেনোপজ হয় তখন নারীদের এই মাসিক
স্বাভাবিক ভাবেই বন্ধ হয়ে যায়। মেনোপজ সাধারনত ৪০-৫৮ বছর বয়সের মধ্যে হয়ে থাকে। এটি
ইস্ট্রোজেন নামক হরমোনের উৎপাদন কমার কারনে হয়। মূলত মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়াকেই মনোপজ
বলা হয়।

মেনোপজের প্রক্রিয়া ৩ ধাপে সম্পন্ন হয়।
১. পেরিমেনোপজ- শেষ মাসিকের পর ১২ মাস পর্যন্ত চলে (কম বা বেশি ও হতে পারে)। এ সময় অগ্রীম
কিছু লক্ষণ দেখা দেয় যেমন অনিয়মিত মাসিক, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদি।
২. মেনোপজ- ১২ মাস শেষ হওয়ার পর মেনোপজ হয়ে থাকে। এসময় সব লক্ষণ স্পষ্ট ভাবে দেখা দেয়।
৩. পোস্টমেনোপজ- এর সময় অনিশ্চিত।

যেসব লক্ষণ মেনোপজের জানান দেয় তা হলো-
১. অনিয়মিত মাসিক
২. হঠাৎ প্রচুর ঘামানো, বিশেষ করে রাতে যা কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত থাকে।
৩. ক্লান্তি
৪. পেশী ব্যথা
৫. বুক ধড়ফড় করা
৬. মাথা ব্যথা
৭. মাথা ঘোরানো
৮. স্তনে ব্যথা
৯. চুল শুষ্ক হওয়া ও ঝরে পড়া

১০. যোনীপথ শুষ্ক হয়ে আসা
১১. মেজাজ খিটখিটে হওয়া
১২. ঘুমে ব্যাঘাত

মেনোপজের কারনে নানান শারীরিক ও মানসিক জটিলতা দেখা দেয়। যা সময় মত খেয়াল না করলে বড়
সমস্যা তৈরি করতে পারে।
শারীরিক জটিলতা:
১. বিবাহিত জীবনের প্রতি উদাসীনতা
২. যোনীপথে ও এর আশেপাশে চুলকানি
৩. মূত্রনালির ইনফেকশন
৪. প্রস্রাবে অনিয়ম
৫. এছাড়া অস্টিওপোরোসিস, ব্রেস্ট ক্যান্সার, হার্টের বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। মানসিক জটিলতা
১. মুড সুইয়িং
২. সন্তান ধারনের ক্ষমতা না থাকায় দুশ্চিন্তা
৩. উদাসীনতা
৪. একাকীত্ববোধ
৫. মনোযোগ কমে আসা
৬. স্মৃতি ধরে রাখতে না পারা, ভুলে যাওয়া

এসব জটিলতা পুরোপুরি দমন সম্ভব না হলেও নিয়ন্ত্রণ করা যায় যত্ন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান
গ্রহণের মাধ্যমে।
যে খাদ্য প্রয়োজনীয় :
১. দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারে থাকে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ভিটামিন ডি ও
কে, যা হাড়ের সুরক্ষার জন্য আবশ্যক। এছাড়াও ইনসোমনিয়া কাটাতে সাহায্য করে।
২. ভিটামিন ডি ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডযুক্ত মাছ খেতে হবে যেমন – ম্যাকেরেল, স্যালমন ইত্যাদি যা
হট ফ্ল্যাশ (হঠাৎ গরম বোধ হওয়া), রাতে ঘামানো ইত্যাদি কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।

৩. শস্যদানায় থাকে ভিটামিন বি (থায়ামিন, নায়াসিন, রিবোফ্লাভিন, প্যান্টোথেনিক এসিড)। সাথে
ফাইবার ও আছে।যেমন: লাল চালের ভাত, গমের রুটি ইত্যাদি শস্য জাতীয় খাদ্য যা হার্টের রোগ,
ডায়াবেটিস, ক্যান্সারের রিস্ক কমাতে সাহায্য করে।
৪. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে, হঠাৎ গরম লাগা রোধে, পর্যাপ্ত ঘুম হওয়া, ডিপ্রেশনে ভোগার হার কমানো
ইত্যাদিতে ফল ও শাক-সবজির ভূমিকা অতুলনীয়। বেশি করে সয়াবিন, ছোলা, বাদাম, আঙ্গুর, বরই, জাম,
ব্রকলি ইত্যাদি গ্রহণ করা উচিত।
৫. উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাদ্য- ডিম, মাংস, মাছ ইত্যাদি খাওয়া উচিত। ক্ষয়প্রাপ্ত পেশীর পুনঃগঠনের
জন্য জরুরি।

যে খাবার বর্জনীয় :
১. অতিরিক্ত চিনি
২. প্রক্রিয়াজাত খাবার
৩. অ্যালকোহল, ধূমপান
৪. চা, কফি ইত্যাদি ক্যাফেইনেটেড বেভারেজ
৫. অতিরিক্ত ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার
৬. অতিরিক্ত লবণ

মেনোপজ কোনো রোগ নয়, জীবনেরই আরেকটি অধ্যায়। এই সময় নারীরা সাধারণত দুশ্চিন্তা,
হীনমন্যতায় ভোগেন। তাই এ সময়ে পরিবারের সবার উচিত সহযোগীতা করা, পাশে থাকা, সময় দেয়া। এই
অধ্যায়কে মেনে নিয়ে জীবনযাপনের ধরন ও খাদ্যাভাস পরিবর্তন করলে জীবন হবে সুন্দর, সুস্থ ও
স্বাভাবিক।

লেখক-
আবেদা আক্তার
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান
সম্পাদনায়-
জান্নাতুল তাজরিয়া
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান

332 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *