হলুদের গুণকথন

Health benefits of turmeric | Nuffield Health

“হলুদ” আমরা যদিও সবাই চিনি রান্নায় ব্যবহৃত মসলা হিসেবে।তবে এটি শুধুমাত্র নিত্য খাবার
ব্যঞ্জনের রং করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় না বরং অন্যান্য কাজেও আমরা ব্যবহার করে থাকি। যেমনঃ
রূপচর্চায়,রোগ প্রতিরোধক বা প্রতিকারক হিসেবে ইত্যাদি।

হলুদ এর বৈজ্ঞানিক নাম Curcuma longa।এটি আদা পরিবারের (Zingiberaceae) অন্তর্গত একটি
গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ।হলুদ গাছের শিকড় হতে প্রাপ্ত।এটির মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন,
ম্যাগনেসিয়াম, কপার, পটাশিয়াম ,ভিটামিন বি-6 ,ফাইবার প্রভৃতি। হলুদের রং সোনালী।হলুদের
মনমোহনী একটা ঘ্রাণও আছে।আমাদের দেশ এবং পার্শ্ববর্তী ভারতে কাঁচা হলুদের থেকে শুরু করে
গুঁড়ো হলুদের ব্যবহার ব্যাপক।রান্নার পাশাপাশি রোগ নিরাময় থেকে শুরু করে রূপচর্চার ক্ষেত্রে
হলুদের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।

হলুদে থাকে শক্তিশালী উপাদান – কারকুমিন (Curcumin) যা আমাদের স্বাস্থ্যের প্রায় প্রতিটি
কার্যকলাপকে তরান্বিত করে।কারকুমিন আমাদের স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখে এবং এর মধ্যে প্রচুর
মাত্রায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট,এন্টিভাইরাল এবং কিছু ব্যাকটেরিয়াল উপাদান রয়েছে যা যকৃত এর রোগ
এবং অ্যালজাইমার এর মতো গুরুত্বপূর্ণ রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।

ইউনাইটেড স্টেট ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচার ( ইউএসডিএ) ন্যাশনাল নিউট্রিয়েন্ট ডাটাবেজ
অনুযায়ী এক টেবিল চা চামচ গুড়া হলুদে বিদ্যমান উপাদানসমূহ হলো-
 ক্যালরি. =29 গ্রাম
 আমিষ = 0.9 গ্রাম
 শর্করা৷ = 6.31 গ্রাম
 ফাইবার = 2.1 গ্রাম
 সুগার =0.3 গ্রাম

এছাড়া রয়েছে অন্যান্য খনিজ এবং ভিটামিন (দৈনিক)-
 26% ম্যাগনেসিয়াম
 16% আয়রন
 5% পটাশিয়াম
 3% ভিটামিন-সি

 আসুন দেখে নেই স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাঁচা হলুদের ভূমিকা-

1. বার্ধক্যজনিত অ্যালজাইমার প্রতিরোধেঃ
হলুদে থাকা কারকুমিন,অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট গুণ,স্মৃতিকে রক্ষা করার ক্ষমতা অ্যালজাইমারের চিকিৎসায় কাজে লাগে।দেখা গেছে নিয়ম করে কাঁচা হলুদ খেলে তা এই রোগের সম্ভাবনাকে অনেকটাই কমায়।
2. আর্থাইটিস থেকে মুক্তি লাভঃ
হলুদে থাকা কারকুমিন আরথ্রাইটিসের হাত থেকে আমাদের বাঁচায়।কাঁচা হলুদ অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি
এজেন্ট হিসেবে কাজ করে ও তা হাড়ের কোষকে রক্ষা করে।ফলে যারা আরথ্রাইটিসে ভোগেন , নিয়ম
করে কাঁচা হলুদ খেলে ব্যথা কমায় ও হাড়ের জয়েন্টের মুভমেন্টে অনেক সাহায্য করে।
3.সুস্থ ও কর্মক্ষম যকৃতের জন্যঃ
হলুদের মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানগুলো যেকোনো ধরনের লিভার রোগের চিকিৎসা
করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন কর। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হলুদের মধ্যে থাকা উপাদানগুলো
লিভারের জমে থাকা বর্জ্য পদার্থকে বের করে দিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে,যার ফলে লিভারের ক্ষতি
হবার আশঙ্কা বহুলাংশে কমে যায়।

4.ক্যান্সার প্রতিরোধে:
কাঁচা হলুদে থাকা কারকুমিন ক্যান্সার দূর করতে সহায়তা করে।কারকুমিন ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি বন্ধ
করে তাদের মৃত্যু ঘটায়।ফলে ক্যান্সারের সম্ভাবনা হ্রাস পায়।

5. শরীরেরবাড়তি ওজন কমাতে:
কাঁচা হলুদের অ্যান্টি-ওবেসিটি প্রপারটি শরীরের মেদ জমতে বাধা দেয় ও মেটাবলিজমের হার
বাড়ায়।ফলে শরীরের ওজন হ্রাস পায়।
6. মেনোপজ সময় কাঁচা হলুদ:
কাঁচা হলুদের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ডিপ্রেশন কাটানোর ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ফলে
মেনোপজের সময় কাচাঁ হলুদ নানাভাবে সাহায্য করে।

7. রক্তকে পরিশুদ্ধ করতে:
বহু প্রাচীনকাল থেকেই কাঁচা হলুদ বিভিন্ন আয়ুর্বেদিক ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
কারণ কাঁচা হলুদ রক্তকে পরিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে।
8. সর্দি কাশি নিরাময়:
কাঁচা হলুদে থাকে কারকুমিন,ভিটামিন-সি যা রোগ প্রতিরোধ বাড়ায় এবং সর্দি কাশি কমাতে সাহায্য
করে।

 এবার দেখে নিন রূপচর্চায় হলুদের ভূমিকা-
1. মুখের রং গায়ের রং উজ্জল করতেঃ
ত্বকের বিভিন্ন দাগ,রিঙ্কল ও  সান ট্যান থেকে ত্বক কে রক্ষা করার জন্য কাঁচা হলুদের পেস্ট ঘরেই তৈরি
করে ত্বকে লাগানো যেতে পারে। কাচাঁ হলুদের মধ্যে থাকা অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়া এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি
উপাদানগুলো ত্বককে বয়সের ছাপ থেকে বাঁচায় ও মুখের এবং গায়ের রং উজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করে।
2. ব্রণমুক্ত ত্বকঃ
কাঁচা হলুদের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণ মুখে ব্রণকে কমায়।নিয়মিত ব্যবহারে
ভালো ফল পাওয়া যায়।
3.ফাটা গোড়ালির চিকিৎসায় হলুদের ব্যবহারঃ

হলুদের মধ্যে থাকা কারকুমিনের অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি উপাদানগুলি ফাটাঁ গড়ালিসহ শরীরের যেকোন
ক্ষত দূর করে।
4. বলিরেখা দূরীকরণে হলুদের ব্যবহারঃ
হলুদের মধ্যে থাকা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি উপাদান গুলো
বার্ধক্য প্রতিরোধে অর্থাৎ বলিরেখা কমাতে সহায়তা করে।কারন হলুদের মধ্যে থাকা কারকুমিন এ
অ্যান্টি মুটেজেনিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন উপাদান রয়েছে, যা ত্বককে ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে রক্ষা করে এবং
বার্ধক্যজনিত লক্ষণগুলোকে কমাতে সহায়তা করে।
5.কাঁচা হলুদ চুলের জন্যঃ
কাঁচা হলুদ খুশকির সমস্যা, চুল পড়ার সমস্যা, ইত্যাদির থেকেও আমাদের মুক্তি দেয়।

এছাড়াও আর অনেক ক্ষেত্রে হলুদের ভুমিকা রয়েছে।তবে অতিরিক্ত হলুদ ব্যবহারে রয়েছে বিভিন্ন
স্বাস্থ্যগত ঝুকি। সুতরাং সঠিক পরিমানে দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় হলুদ অন্তর্ভুক্ত করে গ্রহণ করতে
হবে।

লেখাঃ
সুমাইয়া তাবাসসুম
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ

সম্পাদনাঃ
আছিয়া
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ

262 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *