প্রসব পরবর্তী বিষন্নতায় পুষ্টির ভূমিকা

একটি শিশুর জন্ম মায়ের মনে গভীর কিছু অনুভূতির জন্ম দেয়; উচ্ছ্বাস, আনন্দ থেকে শুরু করে ভয় এবং শঙ্কা। এর পাশাপাশি কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত অনুভূতি ও অনেক সময় মনে স্থান করে নেয়, যেমন – বিষন্নতা। ধারণা করা হয় প্রতি ৫ জন মায়ের ১ জন প্রসব পরবর্তী মানসিক দুশ্চিন্তায় ভোগেন।
কিছু মায়েদের ক্ষেত্রে এই দুশ্চিন্তা মারাত্মক আকার ধারণ করে। এই অবস্থাকে প্রসব পরবর্তী বিষন্নতা বা Postpartum depression (PPD) বলে।

লক্ষণঃ
PPD এর লক্ষণ খুব সামান্য থেকে খুব মারাত্মক হতে পারে। সাধারণ লক্ষণ গুলো হলোঃ
১.অত্যধিক মুড সুইং
২. অত্যধিক কান্না করা
৩.সন্তানের প্রতি মমতা না জন্মানো
৪. অরুচি কিংবা অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করা
৫. নিদ্রাহীনতা কিংবা অতিরিক্ত ঘুমানো
৬. প্রচন্ড অবসাদ বা ক্লান্তি
৭. মা হিসেবে নিজেকে ব্যর্থ মনে করা
৮. অসহায়ত্ব অনুভব করা
৯. নিজেকে অপরাধী, ছোটো বা অযোগ্য মনে করা
১০. অস্থিরতা
১১. প্রচন্ড শঙ্কা এবং প্যানিক অ্যাটাক
১২. নিজের অথবা সন্তানের ক্ষতি করার চিন্তা করা
১৩. বারবার মৃত্যু কিংবা আত্মহত্যার কথা চিন্তা করা
সাধারণ ক্ষেত্রে ১-২ সপ্তাহের মধ্যে লক্ষণ হ্রাস পায়, যা “বেবি ব্লুজ” (Baby Blues) নামে পরিচিত। PPD এর ক্ষেত্রে লক্ষণ সমূহ Baby Blues অপেক্ষা মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বাচ্চার যত্ন এমনকি দৈনন্দিন জীবনযাপনে ও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
কারণঃ

PPD এর সঠিক কারণ এখনো সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়, তবে কিছু গবেষণায় এর কারণসমূহ কে সাইকোনিউরোইমিউনোলজিকাল বলা হয়েছে। অর্থ্যাৎ, গর্ভ ও প্রসবকালীন শারীরিক, মানসিক পরিবর্তন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা যেকোনো কিছুই প্রসব পরবর্তী বিষন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

প্রসব পরবর্তী বিষন্নতায় পুষ্টির ভূমিকাঃ
প্রসব পরবর্তী বিষন্নতায় পুষ্টির ভূমিকাকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না। অথচ নতুন নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে প্রসব পরবর্তী ১ বছর সময়কাল পর্যন্ত PPD এর ওপর খাদ্যাভ্যাস প্রভাব বিস্তার করতে পারে। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে প্রায় সকল পুষ্টি উপাদানের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। যার মধ্যে কিছু উপাদান মস্তিষ্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল ভূমিকা পালন করে এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে আবশ্যক। শর্করা, আমিষ, ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড(EPA/DHA), বি বর্গীয় ভিটামিন(বিশেষত বি-৬, বি-১২, ফোলেট) এবং কিছু লেশ মৌল(সেলেনিয়াম, জিংক, আয়রন) আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক সক্রিয়তায় আবশ্যক। গর্ভাবস্থায় এই উপাদান গুলোর অভাব PPD এর ঝুঁকি বাড়ায়। এবং দেখা গেছে গর্ভকালীন সময়ে এই উপাদান গুলোই অতিমাত্রায় ক্ষয় হয়।
প্রসূতি মায়েদের প্রসবকালীন ক্ষত নিরাময়, সেরে ওঠা এবং স্তন্যদানের শক্তির যোগানের জন্য পুষ্টি চাহিদা গর্ভাবস্থা অপেক্ষা আরও বেশি থাকে। পাশাপাশি গর্ভাবস্থা ও সন্তান প্রসবজনিত পুষ্টি ঘাটতি ও এই সময়ই পূরণ করতে হয়। সঙ্গত কারণেই গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের পুষ্টির ওপর জোর দেয়া হয়।
PPD পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন সময়ে যথাযথ খাদ্য ব্যবস্থাপনা এর ঝুঁকি হ্রাস করতে সাহায্য করে।

PPD প্রতিরোধে ব্যবস্থাপনাঃ
ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড, ফোলেট/ ফলিক এসিড, আয়রণ, জিংক, ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স – এ পুষ্টি উপাদানগুলো মাতৃত্বকালীন সময়ে সাপ্লিমেন্ট আকারে দেয়া হয়। এ উপাদানগুলো আমাদের শরীরে শোষনের জন্য পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতা করে। তাই আদর্শ উপায় হলো এ উপাদানগুলো আলাদা আলাদা গ্রহণ করা। তবে কেউ যদি একাধিক আলাদা ঔষধ খেতে না চায়, তবে মাতৃত্বকালীন বিশেষ মাল্টিভিটামিন সাপ্লিমেন্ট নিতে হবে।
আলাদা আলাদা ভাবে সাপ্লিমেন্ট নিলে শরীরে এর সর্বোচ্চ শোষণের জন্য নিম্নলিখিত উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে-
১. আয়রন এবং ফোলেট/ফলিক এসিড খাবার গ্রহণের অল্প সময় পরে গ্রহণ করা
২. ভিটামিন-ডি, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড (Eicosapentaenoic acid or EPA/Docosahexaenoic acid or DHA) এবং ক্যালসিয়াম ৫ -১০ গ্রাম ফ্যাট যুক্ত খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করা। এই ফ্যাট EPA এবং ভিটামিন-ডি এর শোষণ বৃদ্ধি করে।
৩. জিংক খাবারের ১ ঘন্টা পূর্বে অথবা ২ ঘন্টা পর খালি পেটে গ্রহণ করা।
৪.বিষন্নতা আক্রান্ত রোগী যদি এন্টিডিপ্রেসেন্ট ঔষধে সাড়া না দেয়, সেক্ষেত্রে ফোলেট, জিংক কিংবা EPA সাপ্লিমেন্ট থেকে উপকৃত হতে পারেন। এর পাশাপাশি সন্তান ধারণক্ষম বয়সী নারীদের PPD প্রতিরোধে
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

 

লেখক
হুমায়ারা নাজনীন তামান্না
গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ
সম্পাদনা
জান্নাতুল তাবাসসুম
গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ।

528 total views, 4 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *