জাদুকরী উদ্ভিদ ঘৃতকুমারী

ঘৃতকুমারী বা অ্যালোভেরা বহুল পরিচিত পুষ্টিগুণ সম্বৃদ্ধ একটি রসালো উদ্ভিদ । পৃথিবীতে প্রায়
২৫০ প্রজাতির ও বেশী অ্যালোভেরা রয়েছে ।   আজ থেকে ৬০০০ বছর পূর্বেই মিশরে অ্যালোভেরা
উৎপত্তি লাভ করে। তবে বর্তমানে উত্তর আফ্রিকাতে সবচেয়ে বেশি অ্যালোভেরা চাষ করা হয় ।

Natural Hair Care With Aloe Vera - YusraBlog.com

অ্যালোভেরার ৩ টি অংশঃ
(১) অ্যালোভেরা জেল, যার ৯৬ % পানি
(২) ল্যা্টেক্স যা রেচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং
(৩) অ্যালোভেরার ত্বক বা বহিঃআবরণ।

অ্যালোভেরা একদিকে যেমন সৌন্দর্য বর্ধনকারী, অন্যদিকে ঔষধি গুণাগুণের জন্য এই উদ্ভিদ
প্রসিদ্ধ। ভারত,চীন,জাপান, মিশর,গ্রিস এবং মেক্সিকোতে অ্যালোভেরার ঔষধি ব্যাবহার হাজার
বছর ধরে হয়ে আসছে। মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা ও নেফারতিতির সৌন্দর্য চর্চায় অ্যালোভেরা
ছিলো একটি আবশ্যক উপাদান। আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট, এবং ক্রিস্টোফার কলম্বাস তাদের
সৈনিকদের ক্ষত সারাতে অ্যালোভেরা ব্যাবহার করতেন।

অ্যালোভেরাতে ভিটামিন, মিনারেল, শর্করা(মনো ও পলিস্যাকারাইড), অ্যামাইনো এসিড, ফ্যাটি
এসিড,এনথ্রাকুইনোন,এনজাইম, লিগলিন,স্যাপোনিন, স্যালিসাইলিক এসিড সহ প্রায় ৭৫ ধরনের
সক্রিয় উপাদান রয়েছে বলে প্রমান পাওয়া যায় । মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় ২২ টি এমাইনো
অ্যাসিডের ২০ টি, এবং অত্যাবশ্যকীয় ৮ টি এমাইনো এসিডের ৭ টি এতে বিদ্যমান। ভিটামিন বি -১২
সম্মৃদ্ধ অল্প সংখ্যক উদ্ভিদের মধ্যে অ্যালোভেরা একটি । ‘অ্যালোভেরায় রয়েছে অ্যান্টি-
অক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও এন্টিসেপটিক গুণ।

Aloe vera neye iyi geliyor? Aloa veranın faydaları nelerdir? - Güncel yaşam  haberleri

অ্যালোভেরার ঔষধি গুনাগুনঃ
১)অ্যালোভেরা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়তা করে । অ্যালোভেরার নির্যাসে বার্বএলোইন নামক
এনথ্রাকুইনোন থাকে, যা অ্যালোভেরার তেতো স্বাদ ও রেচক গুন সৃষ্টি করে । বার্বএলোইন মল থেকে
অন্ত্রে পানি শোষনের মাত্রা কমিয়ে দেয়, ফলে মল নরম হয় ও মলত্যাগ সহজ হয়।
২) অ্যালোভেরা জেল এ ৫ ধরনের ফাইটোস্টেরল রয়েছে যেগুলো কর্যকরীভাবে রক্তে শর্করার
পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। ভারতবর্ষে ৫০০০ মানুষের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে
নিয়মিত ১০০ গ্রাম অ্যালোভেরা জেল ও ২০ গ্রাম ইসবগুলের ভুসির মিশ্রণ রক্তে শর্করা ও চর্বি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।ডায়াবেটিসের প্রথম দিকে নিয়মিত অ্যালোভেরার জুস খাওয়া
গেলে টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
৩) অ্যালোভেরা জেল বা অ্যালোভেরা শরবত পেপটিক আলসার নিরাময়ে সহায়ক।
৪) ঘৃতকুমারী ক্ষতস্থান খুব দ্রুত সারাতে সাহায্য করে। অ্যালোভেরায় উপস্থিত গ্লুকোম্যানান
নামক পলিস্যাকারাইড ও জিবেরেলিন নামক গ্রোথ হরমোন ক্ষতস্থানে কেলাজেন সংশ্লেষ বৃদ্ধি করে
যা ক্ষত নিরাময় প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
৫) অ্যালোভেরায় বিদ্যমান ভিটামিন এ (বিটা ক্যারোটিন), সি এবং ই অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে
কাজ করে ফ্রি- র‍্যাডিকেল কে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
৬) এ উদ্ভিদের জেল ত্বকের কোলাজেন বৃদ্ধি করে ত্বকের লাবণ্যতা ধরে রাখে, বলিরেখা দূর করে ও
ত্বকের উজ্জলতা বৃদ্ধি করে ।
৭) এর মিউকোপলিস্যাকারাইড ত্বকের  আর্দ্রতা ধরে রাখে, অ্যামাইনো এসিড ত্বককে কোমল
রাখে। এতে বিদ্যমান জিংক ব্রণ কমাতে সাহায্য করে
৮) ঘৃতকুমারীর রসে উপস্থিত ব্রাডিকাইনেজ এনজাইম, জিবেরেলিন হরমেন, স্যালিসাইলিক এসিড
ইত্যাদি ত্বকের প্রদাহ প্রশমন করে।
৯)  অ্যালোভেরা জেল এ ৩% স্যাপোনিন থাকে। স্যাপোনিন একটি এন্ট্রিসেপটিক উপাদান, এটি
ত্বককে জীবাণুমুক্ত রাখতে সহায়তা করে। এছাড়া অ্যালোভেরায় বিদ্যমান লুপিওল, স্যালিসাইলিক
এসিড, ইউরিয়া, ফেনল, সালফার ইত্যাদি এন্টিসেপটিক উপাদান ত্বককে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও
ফাংগাস এর সংক্রমণ হতে সুরক্ষা দেয়।
১০) অ্যালোভেরাতে থাকা এলোইন ও এমোডিন রেচনে সহায়তার পাশাপাশি এন্টিব্যাকটিরিয়াল ও
এন্টিভাইরাল।
১১) এলার্জি প্রশমনে অ্যালোভেরা জেল খুবই কার্যকর।
১২) অ্যালোভেরা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

সতর্কতাঃ

প্রাকৃতিক উপায়ে অ্যালোভেরা জেল বের করার সময় এর সঙ্গে ভুলবশত ‘অ্যালো লেটেক্স’ বের হতে
পারে। ‘অ্যালো লেটেক্স হলুদ বর্ণের পিচ্ছিল পদার্থ যা অ্যালোভেরার পাতাতেই থাকে । আর এই
ল্যাটেক্স যদি বেশি পরিমানে খাওয়া হয় তবে এটি শরীরে বিভিন্ন দীর্ঘ মেয়াদী রোগের কারন হতে পারে।

 অ্যালো ল্যাটেক্স এর দীর্ঘমেয়াদী গ্রহণে শরীরে পানিশূন্যতা সৃষ্টি ও ইলেক্ট্রোলাইট এর
ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।ফলস্বরুপ শরীরে পটাশিয়ামের অভাব দেখা দিতে পারে।
 শিশু, গর্ভবতী ও প্রসূতী ময়েদেরদের অ্যালোভেরা খেতে দেয়া যাবে না ।
 কোনো প্রকার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া (এলার্জি/চুলকানি) দেখা দিলে অ্যালোভেরা ব্যবহার করা
উচিত নয়।
*উল্লেখ্য, অ্যালোভেরার বেশিরভাগ পার্শ্বপতিক্রিয়া মূলত এতে উপস্থিত ল্যাটেক্স এর
কারণে হয়, তাই প্রাকৃতিক অ্যালোভেরা গ্রহণ কিংবা প্রয়োগের পূর্বে অ্যালোভেরা পাতাটিকে
২০ মিনিট খাড়া ভাবে রেখে দিলে এর অধিকাংশ ল্যাটেক্স বেরিয়ে যায় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত
পার্শ্বপতিক্রিয়ার ঝুঁকি হ্রাস পায়।
 লিগলিনের উপস্থিতির কারনে অ্যালোভেরা ত্বকে স্টেরয়েড জাতীয় ক্রিম এর শোষণ বৃদ্ধি
করতে পারে, এতে বিরূপ পার্শ্বপতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাই স্টেরয়েড ক্রিম ব্যবহার
করলে কোনোভাবেই অ্যালোভেরা ব্যাবহার করা উচিৎ নয়।
 অ্যালোভেরা খাওয়ার আগে কী পরিমাণ খাবেন, , কত দিন খাবেন, তার জন্য অবশ্যই একজন
অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন ।
 পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে রাস্তার পাশের অস্বাস্থ্যকর অ্যালোভেরার শরবত খাবেন না।

লেখক
সাদিয়া ইসলাম কাঞ্চি
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ

সম্পাদক
হুমায়ারা নাজনীন তামান্না
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ

706 total views, 2 views today

Any opinion ..?

Posted by pushtibarta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *